পাকিস্তানে আরেক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুর খবর, পাড়ি দিয়েছিলেন ভারত হয়ে

রতন ঢালী
৫ নভেম্বর, ২০২৫

পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে আরেক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। যুবকের নাম রতন ঢালী (২৪), তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর উপজেলার হরিরচর গ্রামে। মৃতের পরিবারকে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)।

এসবি’র কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার রওশন সাদিয়া আফরোজ দ্য ডিসেন্টকে জানান, রতন ঢালীর মৃত্যুর খবরটি আরও ১৫-২০ দিন আগেই জানা গিয়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেই তথ্যটি জানানো হয় এসবিকে।

তিনি বলেন, “তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। ঠিক কবে কোথায় মারা গিয়েছে সে ব্যাপারে আমরা তথ্য পাইনি। তবে মাদারীপুরের ফয়সাল মারা যাওয়ার আগে রতন ঢালি নিহত হয়েছেন।”

গত ২৮ সেপ্টেম্বর দ্য ডিসেন্ট’র এক প্রতিবেদনে ফয়সালের নিহত হওয়ার বিষয়টি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে প্রকাশ্যে আসে। ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলায় পাকিস্তানী নিরাপত্তা বাহিনীর এক অভিযানে নিহত হয় ফয়সাল।

টিটিপির হয়ে যুদ্ধরত বাংলাদেশি যুবক ইমরান হায়দারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনিও রতনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।

ইমরান জানান, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে রতন মূলত গ্রেফতার ছিল। সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা টিটিপির সূত্র তাদেরকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে কবে কিভাবে রতন নিহত হয় সে ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানান ইমরান।

ভারত হয়ে পাকিস্তান যান রতন

এসবি’র পুলিশ সুপার রওশান সাদিয়া জানান, রতন ঢালি ও মাদারীপুররের ফয়সাল একই সাথে ভারতের কলকাতা হয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। তাদের দু’জনের ভারতে প্রবেশের ডকুমেন্টও তারা পেয়েছেন বলে জানান। তবে তিনি জানান, তারা পাকিস্তানে বৈধভাবে প্রবেশ করেনি।

রতনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে তিনি বাংলাদেশে থাকার সময় ঢাকায় একটি হিজামা সেন্টারে কাজ করতেন। পরে দুবাই যাওয়ার কথা বলে ২০২৩ সালের রমজান মাসে দেশ ছাড়েন।

রতন ঢালির বাবা আনোয়ার ঢালি দ্য ডিসেন্ট-কে জানিয়েছেন, বুধবার পুলিশের কাছে তার ছেলের মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছেন।

তিনি জানান, ২ মাস আগে স্থানীয় পুলিশ তাদের জানিয়েছিল তার ছেলে পাকিস্তানে জঙ্গি সংগঠনের হয়ে যুদ্ধ করছে। এর আগে পরিবার জানতো তার ছেলে দুবাই আছেন।

আনোয়ার ঢালি বলেন, “গত রমজানের আগের রমজানের ঈদের ৩-৪ দিন আগে সে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসে। তখন আমাদের বলেছিল সে দুবাই যাবে। তারপর বাড়ি থেকে গেলোগা। ঈদের দিন ফোন দিয়ে জানালো সে নয়াদিল্লি আছে। খাওয়া-দাওয়া করতেছে ভিডিও কলে দেখাইলো। সাথে আরও ২/৩ জন ছিল। ওরাও নাকি দুবাই যাবে।”

রতনের বাবা আরও জানান, তার ছেলে বলে গিয়েছিল দুবাই গিয়ে সে হিজামা সেন্টারে কাজ করবে। আর ওই হিজামা সেন্টারের মালিকই তাকে ভিসা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মাদারীপুরের ফয়সাল নিহত হওয়ার পর তার বড় ভাই আরমানও দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছিল ফয়সাল দুবাইতে হিজামা সেন্টারে কাজ করার কথা বলে দেশ ছাড়েন।

আনোয়ার ঢালি বলেন, “এই কথা শুনে তো অনেক খুশি হইছিলাম যে ছেলেটার একটা পথ হইলো। কিন্তু এরকম যে হবে তা তো কল্পনাও করতে পারিনাই”। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন আনোয়ার ঢালি।

কান্না জড়িত কন্ঠেই তিনি বলেন, “আমার ছেলের মৃত্যুর ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমি চাই তার লাশটা যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে সরকার। এর জন্য আমার সম্পত্তি বিক্রি করা লাগলেও আমি বিক্রি করবো।”

রতনের মা সেলিনা বেগমকে বুধবার রাত পর্যন্ত ছেলের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি বলে জানান ঢালি।

ছেলের মৃত্যুর খবর না জানা অবস্থায়ই সেলিনা দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ও দুবাই যাওয়ার পর অনেক দিন পর পর কল দিত। বলতো ওর মোবাইল হারাই গেছে, অন্যের ফোন থেকে কল দিছে। একবার শুধু আমার অসুখের কথা শুনে ১০ হাজার টাকা পাঠাইছিল। বলতো ওর নাকি কাজ নাই।”

“এখন দেড়-দুই মাস আগে পুলিশ জানাইছে ও নাকি পাকিস্তান কী নাকি জঙ্গলি সংগঠনে কাজ করে। আমার একটা বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে। এখন যদি ওর ব্যাপারে পুলিশ সাংবাদিকরা আমাদের বাড়িতে আসে তাইলে আমার মেয়েটারে বিয়া দিমু কেমনে। এমনিতেই গেরামে একটা মেয়ের বিয়ার সময় কত দিক দিয়া দোষ উডায়”, যোগ করেন সেলিনা।

আনোয়ার ঢালি পেশায় একজন অটোচালক। এর আগে তিনি বাসের ড্রাইভার ও সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি বলেন, “ছেলেটাকে পড়ালেখা করানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছি। অনেক টাকা খরচ করছি। প্রথমে রাজউকের স্কুলে ভর্তি করছি, তারপর আনছি নদ্দা কালাচাঁদপুর স্কুলে। কিন্তু সে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ে আর পড়েনাই। বিগড়ায় গেলগা। যত চেষ্টা করছি আর পারিনাই।”

কয়েক বছর আগে পরিবারসহ ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যান আনোয়ার ঢালি। তিনি বলেন, “সবাই গ্রামে চলে গেলেও রতন ঢাকায় থেকে যায়। প্রথমে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করে, পরে হিজামা শিখে খিলগাঁওয়ে একটা হিাজামা সেন্টারে কাজ করা শুরু করে।” 

গত ১৫ মে সর্বপ্রথম দ্য ডিসেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে বাংলাদেশি যুবকদের যুদ্ধ করার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে এ বিষয়ে কাজ শুরু করে পুলিশের বিশেষ শাখা। এখন পর্যন্ত অন্তত ৫ বাংলাদেশি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া একজন বাংলাদেশি টিটিপি সদস্যের এক শিশু কন্যাও ড্রোন হামলায় মারা যায়।

পুলিশ জানায়, ফয়সাল ও রতন ঢালি সাইফুল্লাহ গুরাবা নামে পরিচিত এক টিটিপি সদস্যের মাধ্যমে পাকিস্তান পাড়ি জমান। ফয়সাল ও রতন বাংলাদেশে থাকার সময় সাইফুল্লাহ গুরাবার হিজামা সেন্টারেই কাজ করতেন।

সাইফুল্লাহ গুরাবার আসল নাম ইয়াসিন রাফি সিয়াম বলে অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে দ্য ডিসেন্ট। খিলগাঁও তিলপাপাড়া এলাকায় ১০ নং রোডে নিজ বাড়ির নিচ তলায় সাদী ভূঁইয়া নামের এক ব্যক্তির সাথে মিলে রফরফ হিজামা সেন্টার নামে একটি হিজামা সেন্টার পরিচালনা করতেন। ইয়াসিন রাফি সিয়াম ওরফে সাইফুল্লাহ গুরাবার গ্রামের বাড়ি ফরিদগঞ্জের কড়ৈতলি এলাকায় বলে জানা গেছে। তার ছোট ভাই সানাফ হাসানকে সন্ত্রাস বিরোধী এক মামলায় আসামি করেছে পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিট। গুরাবার বাবা ব্যবসায়ী শামসুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার ছেলের নাম ইয়াসিন রাফি সিয়াম বলে নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, তার ছেলে মরক্কো যাওয়ার কথা বলে স্ত্রীসহ দেশ ছাড়ে। পরে একবার সে জানায় সে গাড়ি এক্সিডেন্টে আহত হয়েছে এবং তার মেয়ে মারা গেছে।

তার বড় ছেলে সন্ত্রাসী সংগঠনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি ছেলের উদ্দেশ্যে গালি দিয়ে বলেন, “আমি জানলে ওই **’র বাচ্চাকে কি বাড়ি থেকে বের হতে দিতাম?”

একাধিকবার চেষ্টা করেও শামসুল আলমের সাথে দেখা করা সম্ভব হয়নি। দ্য ডিসেন্ট’র প্রতিবেদক তার বাড়ির নিচে গিয়ে সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। কথা বলতে দেননি তার ছোট ছেলে সানাফ হাসানের সাথেও। ছোট ছেলে টিটিপি’র দ্বারা প্রভাবিত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাচ্চা একটা ছেলে ও। কারো কথায় প্রভাবিত হইতেই পারে।”

ইয়াসিন রাফি সিয়াম ওরফে সাইফুল্লাহ গুরাবাকে তার পরিচয় সংক্রান্ত এসব তথ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি সব তথ্যই অস্বীকার করেন।