নিয়মিত চলচ্চিত্র বদলের ঘটনাকে ‘বিএনপির মৌলবাদী রূপ’ ট্যাগ দিয়ে প্রচার আওয়ামী লীগের পেইজে

৪ অক্টোবর, ২০২৬

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজের একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ও কালজয়ী দুটি চলচ্চিত্র—তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘লালসালু’ এবং ‘চিত্রা নদীর পারে’ প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও উক্ত পোস্টে এটিকে ‘বিএনপির মৌলবাদী রূপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘সংস্কৃতিচর্চার টুটি চেপে ধরার চক্রান্ত’ বলে দাবি করা হয়।

এর আগে ফেসবুকে ‘Tanvir Mokammel's Films’ নামে একটি পেইজ থেকে দাবি করা হয়, তানভীর মোকাম্মেলের নির্মিত চলচ্চিত্র “লালসালু” ও “চিত্রা নদীর পারে” বাংলাদেশ বিমানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছে, “সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান তানভীর মোকাম্মেলের “লালসালু” ও “চিত্রা নদীর পারে” চলচ্চিত্র দু’টো কী এক অজ্ঞাত কারণে প্রদর্শন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।”

সিনিয়র সাংবাদিক আমিন আল রশিদও এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “বিমানে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পাড়ে নিষিদ্ধ’। অসুবিধা নাই। বিমানে খুব বেশি লোক চড়ে না। বরং এই সুযোগে ইউটিউবে গিয়ে সবাই আবার সিনেমা দুটি দেখে ফেলুন।”

এর আগে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ‘Independent BD’ নামের আরেকটি পেজ থেকেও দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশ বিমানে তানভীর মোকাম্মেলের ‘লালন’ ও প্রামাণ্যচিত্র ‘অচিন পাখী’ দেখানো বন্ধ করা হয়েছে।

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিমানে তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করার দাবিটি বিভ্রান্তিকর।

বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগ দ্য ডিসেন্টকে জানায়, ত্রৈমাসিক সাইকেল অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পরপর নতুন কিছু সিনেমা যুক্ত হয় এবং পুরোনো সিনেমা তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এই নিয়মিত পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’র সঙ্গে আরও কিছু সিনেমা বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে না।

বিমানের একটি সূত্র দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির প্রতি অনুগত নির্মাতাদের অনেকের সিনেমা বিভিন্ন তদবিরের কারণে ওই ত্রৈমাসিক সাইকেলের নিয়ম উপেক্ষা করে দীর্ঘ দিন ধরে বিমানে প্রদর্শিত হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সব সিনেমার ক্ষেত্রেই ত্রৈমাসিক পরিবর্তনের সাইকেলটি পূনরায় চালু করা হয়েছে।

ত্রৈমাসিক নিয়ম উপেক্ষা করে তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত ‘লালসালু’ চলচ্চিত্রটি ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এবং ‘চিত্রা নদীর পারে’ ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা বিমানে প্রদর্শিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

তবে বর্তমানে ত্রৈমাসিক পরিবর্তনের নিয়মের অংশ হিসেবেই তানভীর মোকাম্মেলের উল্লিখিত দুটি সিনেমা প্রদর্শন তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যদিও একই পরিচালকের ‘লালন’ চলচ্চিত্রটি বিমানের ফ্লাইটে যাত্রীদের জন্য রাখা সিনেমার তালিকায় প্রদর্শিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

দ্য ডিসেন্টকে দেয়া এক লিখিত বক্তব্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, কনটেন্ট স্টোরেজের সীমাবদ্ধতা এবং দর্শকের চাহিদার পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়মিত কনটেন্ট পরিবর্তন করা হয়। ফলে দীর্ঘকাল কোনো নির্দিষ্ট সিনেমা প্রদর্শন করা সম্ভব হয় না।

এ বিষয়ে তানভীর মোকাম্মেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগে দ্য ডিসেন্টকে জানায়, “ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট (আইএফই) বা বিমানের অভ্যন্তরীণ বিনোদন ব্যবস্থা নিয়মিত পরিবর্তন বা আবর্তন করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার সিনেমা, টিভি শো এবং অডিওর তালিকা সাধারণত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিবর্তন করে থাকে। ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট (আইএফই) মূলত লাইসেন্স চুক্তি, স্টোরেজের সীমাবদ্ধতা এবং যাত্রীদের সন্তুষ্টির কারণে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিবর্তন বা আবর্তন করতে হয়।”

বিমান আরও জানায়, “বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার প্রদর্শিত সিনেমা বা শোগুলোর মালিক নয় এবং মিডিয়া ব্রোকারদের কাছ থেকে কনটেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (সিএসপি) মাধ্যমে সাময়িক প্রদর্শনের অধিকার কিনে প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। এই লাইসেন্সিং চুক্তিগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের (কনটেন্ট সাইকেল) জন্য স্ট্রিমিংয়ের অধিকার দেয়। প্রতি কনটেন্ট সাইকেল পরিবর্তনের সময় এয়ারলাইনস আইনত সেই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে বাধ্য।”

বিমানের ভেতরের সার্ভারের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে তারা জানায়, “একটি উড়োজাহাজের ভেতরের ফিজিক্যাল সার্ভার স্টোরেজ সীমিত থাকে। বিমানের হার্ড ড্রাইভগুলোতে সীমাহীন মিডিয়া লাইব্রেরি রাখা সম্ভব নয় বলে নতুন কনটেন্ট যুক্ত করার জায়গা তৈরি করতে পুরনো কনটেন্টগুলো মুছে ফেলতে হয়।”

যাত্রীদের সন্তুষ্টির বিষয়টি উল্লেখ করে বিমান কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, “যাত্রীদের সন্তুষ্টি ধরে রাখার জন্যেও সিনেমা, টিভি শো এবং অডিওর তালিকা নিয়মিত পরিবর্তন বা আবর্তন করা হয়। এয়ারলাইনসগুলো মূলত বিজনেস ট্রাভেলার এবং নিয়মিত যাত্রীদের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেন। যদি আইএফই মেনু অপরিবর্তিত থাকে, তবে এই গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীরা দ্রুতই দেখার মতো নতুন কিছু পাবেন না এবং অসন্তুষ্ট হবেন। নিয়মিত কনটেন্ট পরিবর্তন করার মাধ্যমে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতাকে সবসময় আকর্ষণীয় রাখা হয়।”

কনটেন্ট প্রস্তুত ও বিমানে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিমান জানায়, “প্রচলিত কনটেন্ট চেইনটি কনটেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (সিএসপি) ওপর নির্ভর করে, যারা নির্দিষ্ট বিমানের হার্ডওয়্যারের জন্য ফাইলগুলো ম্যানুয়ালি প্রসেস, এডিট (শালীনতা/নিরাপত্তার জন্য) এবং ট্রান্সকোড করে থাকে। বিমানটি যখন মাটিতে থাকে, তখন ফিজিক্যাল ডেটা লোডিং বা স্থানীয় এয়ারপোর্ট ওয়াই-ফাই সিঙ্কের মাধ্যমে এই মিডিয়া আপলোড করতে হয়। এই জটিল প্রক্রিয়ার কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স একটি নির্দিষ্ট মাসিক চক্রে এই আপডেটগুলোর সময়সূচী নির্ধারণ করে।”