‘শাতিম’ হত্যায় উস্কানি: কী বলছেন আলেমরা

Calls to Kill ‘Blasphemers’: Islamic Scholars Respond
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় হিন্দু ধর্মালম্বী গার্মেন্টস কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। দেশের বাইরের মিডিয়াতেও এই ঘটনা স্থান পেয়েছে।

দেশের সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে, দীপুকে ‘শাতিমে রাসুল’ (নবী অবমাননাকারী) আখ্যা দিয়ে উত্তেজনা তৈরি করে হত্যা করা হয়। যদিও আইনশঙ্খলা বাহিনী তাদের তদন্তে দীপুর বিরুদ্ধে নবীর প্রতি অবমাননাকর কোন আচরণের প্রমাণ পায়নি।

ঘটনার পর পাঁচজন স্থানীয় সংবাদকর্মীর সাথে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি দীপুর বিরুদ্ধে নবীকে নিয়ে অবমাননাকর কথা বলার অভিযোগ তুললেও তাদের কেউই কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।

তবে হত্যার ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পরপরই সেটিকে ‘শাতিম হত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত অনেককেই আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে দ্য ডিসেন্ট প্রতিবেদন দেখুন এখানে

নবীকে অবমাননার প্রমাণ নেই, তবু ‘শাতিম’ আখ্যা দিয়ে হামলা

শাতিম বা নবীর অবমাননার অভিযোগে বাংলাদেশে কাউকে হত্যার বা হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত দেড় বছরে শাতিম আখ্যা দিয়ে অন্তত ডজন খানেক ব্যক্তির ওপর হামলা করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ আহত আর কেউ নিহত হয়েছেন।

এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা এমন পাওয়া যায় যেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনাকে ‘শাতিম’ হিসেবে চিত্রায়িত করে আক্রমণ করা হয়েছে। যেমন গত ১১ জুলাই চাঁদপুরে জুমার নামাজের পর খতিব আনম নূর রহমানকে মসজিদের ভিতর চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। 

বিল্লাল হোসেনের অভিযোগ, খতিব নূর হোসেন এক বয়ানে বলেছেন ‘অফিসারের কাছে দরখাস্ত না করে পিয়নের কাছে দরখাস্ত করলে কি দরখাস্ত কবুল হবে নাকি! এখানে আল্লাহ অফিসার, আর পিয়ন হলেন নবী।’

বিল্লাল হোসেনের দাবি নবীকে পিয়ন বলায় নবীর অপমান হয়েছে। 

তবে ঘটনার পর প্রথিতযশা আলেমরা বলেছেন, তারা মনে করেন এই উপমা দিয়ে খতিব কোন দোষ করেননি। বরং নবীর কাছে কোন কিছু না চেয়ে আল্লাহর কাছে চাওয়ার উপদেশ খতিব সঠিক কাজটিই করেছেন। কারণ তাদের মতে, নবীর কাছে কোন কিছু চাইলে সেটি শিরকে পারিণত হয়।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহে তালাবদ্ধ ঘর থেকে তোয়াজ উদ্দিন শেখ নামে এক ব্যবসায়ীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। যে ঘর থেকে তোয়াজ উদ্দিনের লাশ উদ্ধার করা হয় সে ঘরের দেয়ালে লেখা ছিল, ‘শাতিম হওয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে’।

এ ঘটনার ২০ দিন পর তানভির হাসান নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে তোয়াজ উদ্দিনের সাথে তানভির হাসানের কয়েক বছরের সমকামিতার সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যেকার টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে তানভির তোয়াজ উদ্দিনের মাথায় শীলপাটা দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে। তোয়াজ উদ্দিনের মৃত্যুর খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর ফেসবুকে অনেক আইডি থেকে ‘শাতিম হত্যা করা হয়েছে’ বলে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামের এক গার্মেন্টস কর্মীকে নবীকে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যা করার পর বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে লাশে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে র‌্যাব জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করেছে এমন কোন প্রমাণ তারা পায়নি।

ময়মনসিংহ র‌্যাব-১৪ কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, “নিহত ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করে ফেসবুকে কিছু লিখেছেন, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় লোকজন ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেও এমন কিছু পাওয়া যায়নি। সবাই এখন বলছেন, তারা তাকে (নিহত শ্রমিক) এমন কিছু বলতে নিজেরা শোনেননি। কেউ নিজে শুনেছেন বা দেখেছেন (ধর্ম অবমাননার বিষয়ে) এমন কাউকে পাওয়া যায়নি।” 

দৈনিক আমার দেশ এক প্রতিবেদনে জানায় দীপু দাসকে পরিকল্পিতভাবে নবী অবমাননার দায়ে ফাঁসানো হয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, দিপু চন্দ্র দাস দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। উৎপাদন বাড়ানো, ওভারটাইম, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতেন। এতে মালিকপক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ কারণেই তাকে দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। একপর্যায়ে কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়।’

দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার পরও শাতিম হত্যা করা হয়েছে বলে ফেসবুকে উল্লাস করতে দেখা যায় অনেককে। জুবায়ের আহমদে তাশরীফ ও হোসাইন আহমদ আল-হাবিবী নামের দু’জন ইসলামী বক্তা ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করে হত্যাকারীদের সাধুবাদ জানান এবং দেশের অন্যত্র কেউ নবী অবমাননা করলে দীপু চন্দ্র দাসের মত পিটিয়ে হত্যার করার আহ্বান জানান।

‘শাতিম হত্যা’ ক্যাম্পেইন করেন যারা

কাউকে ‘শাতিম’ আখ্যা দিয়ে হত্যা চেষ্টার ব্যাপারটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে একদল ব্যক্তি অনলাইনে এবং ওয়াজ মাহফিলে কাউকে ‘শাতিম’ মনে হলে তাকে খুন করার প্রকাশ্য উস্কানি দিচ্ছেন। এমনকি ফেসবুকে পেইজ খুলে ‘শাতিম’দের হত্যা করার আহ্বান জানিয়ে ক্যাম্পেইন করছেন। ‘শাতিম’ হত্যার আহ্বান জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আলেমও রয়েছেন। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া বিভিন্ন আইডি বা পেইজ থেকেও একই ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।

আলেমদের মধ্যে মুফতি মাহমুদুল হাসান গুনবীকে তার বেশ কিছু বক্তব্যে শাতিমে রাসুলকে (নবী অবমাননাকারী) নিজ উদ্যোগে হত্যা করার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। ফেসবুক ও ইউটিউবে তার এমন বক্তব্যের কয়েকটি ক্লিপ পাওয়া যায়; যেগুলো বিগত কয়েক বছরে তিনি বলেছেন।

যেমন এক বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, “শাতেমে রাসুলের ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলবে না। তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড শিরচ্ছেদের মাধ্যমে।”

আরেকটি ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, “শাতেমে রাসুলকে হত্যা করতে হবে। হত্যাকারীর ফাঁসি হবে না জেল হবে সেটা দেখার বিষয় না। শাতেমুর রাসুলের একমাত্র বিধান ওয়াজিবুল ক্বতল। একমাত্র বিধান গর্দান থেকে কল্লা আলাদা করে দিতে হবে। এটা শরিয়তের বিধান। কারো কাছে ভালো না লাগলে তার ইমান নাই। বড় হুজুর বললেও ইমান নাই, ছোট হুজুর বললেও ইমান নাই। বড় হুজুর যদি বলে ‘হত্যা করলে সে সন্ত্রাসী’ তাহলে বড় হুজুরেরও ইমান নাই। আল্লাহর রাসুলকে গালি দিলে এক মিনিটও দুনিয়াতে জীবিত থাকার অনুমতি নাই।”

আরেক আলেম মাওলানা এনায়েতু্ল্লাহ আব্বাসীকে দেখা গেছে শাতিম হত্যার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিতে। তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে অনেকে শেয়ার করেন।

বক্তব্যে তিনি বলেছেন, “রসুলুল্লাহর শান-মান মর্যাদার বিরুদ্ধে এক চুল বেয়াদবি যদি কেউ করে সেই মুরতাদকে কাফের ঘোষণা করে তার গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। আইন না থাকলে মুসলমান আইন হাতে তুলে নেয়। রাসূলুল্লাহর শানে বেয়াদবি করা হবে বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা। তাহলে তার যারা ধরে নাস্তিকদেরকে কোরবানি দেয় এটা তাদের হাতের স্বাধীনতা। তাদের ফাঁসির রায় দেবার আগে নাস্তিক যদি বেয়াদবি করে রাসূলুল্লাহর শানে তার মৃত্যুদণ্ডের আইন করতে হবে। আমার এই বক্তব্যে রাজনীতির গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করবা না।  বজ্রশক্তিকে কেড়ে আপাদমস্তক শক্তি মুখে সঞ্চয় করে ঘোষণা দেন স্বাধীন বাংলায় আল্লাহর হাবিবের শানে যদি কেউ বেয়াদবি করে সে বুদ্ধিজীবী হোক, নাস্তিক হোক, ব্লগার হোক, তার গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে।”

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান হিসেবে পরিচিত মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানির এক বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, “নবীকে গালিগালাজ করা হচ্ছে। সেই নবীকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। সেই নবীকে নিয়ে অবমাননা করা হচ্ছে, তার জন্য আইন নেই। আমি তখন বলেছিলাম ও আমার যুবকেরা, ওদেরকে যেখানে পাও সেখানে ওদের পাওনা চুকিয়ে দাও। যখন বাংলাদেশের বুকে নাস্তিক মোরতাদরা আমার নবীকে গালিগালাজ করছিল, আমার নবীকে কটূক্তি করছিল, আমি তখন আমার ইমানী দায়িত্বে বলেছিলাম, যারা আল্লাহর নবীকে গালি দেয়, আল্লাহকে গালি দেয়, বাংলার জমিনে তাদের থাকার স্থান নেই।”

রফিকুল ইসলাম মাদানী নামের একজন বক্তাকে এক বক্তব্যে বলতে শোনা যায়, “আগামী দিনেও যদি আমার রসুলের ইজ্জতের নিরাপত্তা না থাকে, আমার রসুলকে যদি গালি দেয়, রাজিব অভিজিতের মত আপনারা যদি তাদের নিরাপত্তা দেন, আমার ‍রসুলের ইজ্জতের নিরাপত্তা না দিয়ে যদি শাতিমে রসুলদের পক্ষে যান, শাস্তি না দিয়া পক্ষ অবলম্বন করেন, তাহলে অভিজিৎ রায়ের মত আরেকটা কুলাঙ্গারকে রফিকুল ইসলাম জবেহ করবে। আপনারা যদি মনে হুজুররা মাইক পাইলে, মানুষ পাইলে যা তা কয়, আরে যা তা বলিনা, এটা মনে কইরেন না। আমরা রাত্রে যা কই, দিনেও তা কই, তাই কল্পনা করি, তাই চিন্তা করি, তাই বলি।”

মুফতি আতাউর রহমান বিক্রমপুরী নামের একজন ব্যক্তি চলতি বছরের শুরুর দিকে ফেসবুকে শাতিমদের হত্যা করার আহ্বান জানিয়ে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। এজন্য তিনি Anti Shatim Movement নামে একটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেন।

একই নামের একটি ফেসবুক পেইজের একাধিক পোস্টে সরাসরি শাতিমদের হত্যা করার প্ররোচণা দিয়ে পোস্ট করতে দেখা গেছে। এমনকি একটি পোস্টে শাতিমদের কেউ হত্যা করলে হুকুমের আসামি হিসেবে নিজে দায় নেয়ার কথাও ঘোষণা করেন তিনি।

আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর পরিচালিত ওই পেইজের পোস্টে লেখা হয়েছে, “Anti-Shatim Movement-ASM শুধুমাত্র ঐ সকল মরদে মুজাহিদ ও সিংহ পুরুষদেরকে শাতিম হত্যা করার জন্য উৎসাহিত করে যারা কখনো প্রশাসন কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে গেলে বর্তমান যুগের ইলমুদ্দীন শহীদের মত অটল অবিচল থাকবে এবং কোন ধরনের হীনমন্যতায় ভুগবে না। এমনকি #ASM এর দায়িত্বশীলগণকে কিংবা যে সকল আলেমরা শাতিমদেরকে হত্যার ফতোয়া জারি করে তাদেরকে হুকুমের আসামি করবে না। কারণ আলেমরা যা বলেন নিজে থেকে বলেন না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে বার্তা পৌঁছে দেন মাত্র। সুতরাং যারা শা তিম হত্যা করবে আল্লাহর গোলাম এবং নবীর উম্মত হিসেবে নিজ দায়িত্বে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে করবে। সংগঠনের সদস্য হিসেবে নয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকে হুকুমের আসামী করলে আমার কোন আপত্তি নাই। তবে সেটা ব্যক্তিগতভাবেই আমার উপরই বর্তাবে। সংগঠনের দায়িত্বশীল হিসেবে নয়।”

এছাড়া যারা হত্যা করতে প্রস্তুত তাদের জন্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও খোলেন বিক্রমপুরী। যদিও পরবর্তীতে গ্রুপটি ডিলিট করে দেন।

নবী অবমাননাকারীদের নিজ উদ্যোগে হত্যা করার এসব আহ্বান ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যা ও অন্যদের আক্রমণ করার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখছে কিনা– জানতে দ্য ডিসেন্টে উপরিউক্ত কয়েকজন বক্তার সাথে যোগাযোগ করা চেষ্টা করে।

মাওলানা মাহমুদুল হাসান গুনবীকে কল করে জানতে চাইলে তিনি বলেন তার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে অথবা নিকটস্থ কোন মাদ্রাসা বা দারুল ইফতাতে গিয়ে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে। তিনি সফরে আছেন বলে কল কেটে দেন। পরবর্তীতে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। 

মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীর নম্বরে কল করা হলে তার একজন সহকারী কল ধরে বলেন রাহমানী ফোনটি বাসায় রেখে সিলেটে গিয়েছেন। তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য একটি নম্বর দেয়ার কথা বললেও পরে আর তিনি সেটা দেননি।

মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর সাথে কথা বলার জন্য তার একজন সহকারীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি প্রশ্ন সম্পর্কে জানতে চান। শাতিম আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন জনের উপর আক্রমণের ক্ষেত্রে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে কিনা– এমন প্রশ্ন করাই ঠিক হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ময়মনসিংহের হত্যাকাণ্ড আব্বাসী সমর্থন করেন কিনা সেটি তার কাছে জেনে জানাবেন বলে জানান এই সহকারী। তবে পরবর্তীতে তিনি আর কিছু জানাননি।

কী বলছেন আলেমরা?

প্রয়াত ইসলামী চিন্তক অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর রাসুল সা: কে কটূক্তি করলে হত্যা করা যাবে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “রাসুল সা: কে কটূক্তি করলে হত্যার বিধান কোরআন ও সুন্নাহ’র কোথাও নেই। রাষ্ট্রীয় বিচারে মৃত্যুদন্ড হবে। বিচার ছাড়া মৃত্যুদন্ড হবে এমনটা নেই। আইন বিচার করবে, আপনি না। আইন বাস্তবায়ন করবে কোর্ট।১০টা ব্লগার মেরে ফেললে, ১০টা মাজার ভেঙে ফেললে কি সব ব্লগার মরে যাবে, সব মাজার উঠে যাবে? এটা কোন সমাধান না। ”

তাহলে যারা কটাক্ষ করে তাদের চিনলে আমরা কী করতে পারি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ কিছুই করতে পারি না।্ আমরা তাকে দাওয়াত দিতে পারি, এভয়েড করতে পারি, তার বিরুদ্ধে কেইস করতে পারি, আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারি। আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। এতে ইসলামের সমর্থন নাই, ইসলামের কোন কল্যাণও নাই।”

অধ্যাপক ড. আবু বকর জাকারিয়া এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “রাসুল সা: কে কেউ কটূক্তি করলে তাকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কেউ এই দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিতে পারে না।”

আলেম, লেখক ও গবেষক ইফতেখার জামিল দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “প্রথমত, আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। এখানে কোন যদি কিন্তু নাই। দ্বিতীয়ত, হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা মতে অমুসলিম ব্যক্তিরা ইসলাম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন না; ইসলাম অবমাননা মূলত শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইসলামবিদ্বেষ-সামাজিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অমুসলিমদের আলাদা আইনে শাস্তি হবে।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে বিষয়গুলো জঠিল হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “খুব দ্রুত ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে। অবস্থাটা এমন হয়েছে, আমি নিজের কথা বলছিনা, ইসলাম অনুযায়ী কোন কথা বলছি, সেটাও অনেক ক্ষেত্রে বলা যাচ্ছে না।”

এক্ষেত্রে সরকারের সঠিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেনএই গবেষক। “সরকারের উচিত নবী অবমাননার মত ঘৃণা ছড়ানোর বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা”, বলেন তিনি।

আল মানার ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মাওলানা উমর ফারুক বলেন, “যারা আইন হাতে তুলে নেয় এটাকে ইসলাম বরং ফাসাদ ফিল আরদ বলে, বরং তাদের পাল্টা শাস্তি দেয়ার কথা বলা আছে। নবী সা:কে মুসলিম বা অমুসলিম যেই গালিগালাজ করুক সেটা অপরাধ। যেমনটা কোন সম্মানিত ব্যক্তির মানহানি করা অপরাধ। মানহানির তো শাস্তি বর্তমান আইনী ব্যবস্থাতেও আছে। তবে কেউ যদি বিশৃঙ্খলা তৈরির উদ্দেশ্যে বারবার এটা করে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র অপরাধের ধরণ অনুসারে শাস্তির সিদ্ধান্ত নিবে। তীব্রতা অনুযায়ী শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হতে পারে। শাস্তি যাই হোক না কেন সেটা আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগে কারও বাস্তবায়নের সুযোগ নাাই।”

কটূক্তিকারীদের রাসুল সা: নিজেই হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন এমন দাবির ব্যাপারে তিনি বলেন, “রাসুল সা এর সময় যাদের হত্যা করা হয়েছে বলা হয় তাদের ব্যাপারটা ভিন্ন ছিল। সেটা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। মূলত তারা যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিল। যেমন কাব বিন আশরাফ  চুক্তি লংঘন করে মদিনায় বাস করে শত্রুদের মদিনা আক্রমণ করতে সহযোগিতা করেছিল। ইহুদিদের সাথে চুক্তি হয়েছিল তারা মদিনার নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে না। কিন্তু সে তা মানেনি। এছাড়া রাসুলকে কটু কথা বলার জন্য কখনো তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। মক্কা বিজয়ের পরও যাদের ক্ষমা করা হয়নি তাদের ক্ষমার অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ ছিল বলেই তাদের ক্ষমা করা হয়নি। এ বিষয়টিকেও ভুল ভাবে বলা হয় যে রাসুল সা: কে কটূক্তির অপরাধে তাদের ক্ষমা করা হয়নি।”