স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘গাফিলতিতে’ মিডিয়ায় ভুল তথ্য

১ এপ্রিল, ২০২৬

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। এই ছোঁয়াচে রোগের সংক্রমণে একের পর এক শিশুর প্রাণহানি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সুনির্দিষ্টভাবে মৃত্যুর মোট সংখ্যা জানা না গেলেও এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ থেকে ১০০ শিশুর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। 

চলমান প্রাদুর্ভাব আতংকের মধ্যেই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য। দেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে থাকা সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ মাস বয়সী শিশুদের হামসহ নানা টিকাদানের তথ্য দেওয়া হয়েছিল।

সে তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হাম ও রুবেলার এমআর-১ টিকার কাভারেজ ছিল প্রায় ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এমআর-২ টিকার কাভারেজ ছিল ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

এই তথ্য দিয়ে প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজ২৪, কালবেলা এবং খবরের কাগজসহ দেশের অনেক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

তবে এটি আপডেট ও সঠিক তথ্য নয় বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘এ তথ্যটা সঠিক নয়। ওটা আপডেট করা হয় নাই দেখে ওরকম হয়ে আছে।’’

বিভ্রান্তির শুরু মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে

গত ২৯ মার্চ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। এরপর কোনো সরকারই ভ্যাকসিন দেয়নি। আমরা ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে কার্যক্রম শুরু করা হবে।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরই মূলত টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করে। 

এরপর সামাজিক মাধ্যমে সরকারি ওয়েবসাইটের (dghs.gov.bd) একটি স্ক্রিনশট ভাইরাল হয় যেখানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে হাম ও রুবেলার এমআর-১ টিকার কাভারেজ ছিল প্রায় ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এমআর-২ টিকার কাভারেজ ছিল ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

এরকম কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। 

মন্ত্রীর বক্ত্যব্যের প্রেক্ষিতে গত ২৯ মার্চ ইউনিসেফের ইপিআই স্পেশালিস্ট সরওয়ার আলম সাংকু তার ফেসবুক প্রোফাইলে একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করে জানান, ‘‘গত ৮ বছরে হামের টিকা দেয়া হয় নাই কথাটা মোটেও ঠিক নয়। এটা বাংলাদেশের ইপিআই প্রোগ্রামের মত একটা বিশ্বনন্দিত সফল প্রোগ্রামের সাথে তামাশা। গত ৯ বছরের ডাটা দিলাম। ৯ বছরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটির কাছাকাছি শিশুদের টিকা দেয়া হয়েছে যেটা সরকারি এডমিনিস্ট্রেটিভ রিপোর্ট।  প্রায় বছরই কাভারেজ ৯৫% এর কাছাকাছি। মাঝে ২০২০-২০২১ এ সাড়ে ৩ কোটি বাচ্চাকে ১ ডোজ টিকা দেয়া হয় হাম রুবেলা ক্যাম্পেইন এ। সেখানেও শতভাগের কাছাকাছি কাভারেজ ছিল।’’ 

চিকিৎসক ও গবেষক ডা. মো: মারুফুর রহমান গত ৩১ মার্চ একই তথ্য দিয়ে তার ফেসবুকে আইডিতে লিখেছেন, ‘‘আমি নিজেও লিখেছি, ইপিআই ড্যাশবোর্ড থেকে তথ্য দিয়েছি যে গত বছর ভ্যাকসিনেশন কভারেজ ৬০% এর কম ছিলো কিন্তু এটি ইনকমপ্লিট ডাটা। এই ইনকমপ্লিটনেস এর দায় সরকারের। ড্যাশবোর্ডের কোথাও লেখা নেই ডাটা ইনকমপ্লিট। সরকারি দপ্তরে এইসব ডাটা সমস্যা থাকেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার সেন্ট্রাল ডাটাবেজ এর তথ্য মতে গতবছর হামের টিকার কভারেজ ছিলো ১ম ডোজের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৩% এবং ২য় ডোজের ক্ষেত্রে প্রায় ৯১% যা আগের বছরের তুলনায় ৬% কম।’’

ইউনিসেফের ইপিআই স্পেশালিস্ট সরওয়ার আলম সাংকু এবং ডা. মো: মারুফুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে তাদের দেয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ। 

তিনি বলেন, ‘‘৯২ পার্সেন্ট হচ্ছে এমআর ওয়ান এবং ৯০ পার্সেন্ট হচ্ছে এমআর টু। এটা পাবলিক ডাটা নয়। ওটার এক্সেস সবার নাই। আমরা নিজেরা দেখতে পারি। আমাদের এমআইএসে যাদের একসেস আছে শুধুই তারাই তারা দেখতে পারে।’’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ অফিসের সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন বিভাগে কর্মরত এক কর্মকর্তাও এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘‘ডাটা ঠিক আছে। তবে এগুলো ন্যাশনাল প্রটেক্টেড ডাটা পাবলিকলি ইউজের জন্য না।’’ 

হামের ক্ষেত্রে পূর্বের তথ্য কেন সঠিক নয়

নিয়ম অনুযায়ী, শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ প্রদান করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে থাকা সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য শুধুমাত্র ১২ মাসের দেওয়া। সে হিসেবে এ তথ্যের সাথে হাম ও রুবেলার দ্বিতীয় ডোজ অর্থাৎ এমআর-২ এর তথ্য এখানে আসার কথা না। কারণ যে টিকা শিশুর ১৫ মাস পুর্ণ হলেই দেওয়া হয় সে টিকার তথ্য ১২ মাসের টিকার তথ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। 

সরিয়ে দেয়া হয়েছে সরকারি ওয়েবসাইটের পূর্বের তথ্য

দ্য ডিসেন্ট থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদের সাথে তথ্যের ব্যাপারে যোগাযোগ করার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে থাকা পূর্বের তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে তার সাথে আবার যোগাযোগ করলে এটি আপডেট না থাকায় সরানো হয়েছে বলে জানান। 

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘‘আপনি বিষয়টা জানতে চাওয়ার পর এমএইএসকে বলে হাইড রাখতে বলেছি। এবং তথ্য আপডেট করার পর দৃশ্যমান করতে বলেছি।’’

এই আপডেট না করার পেছনে ‘গাফিলতি’ ছিল বলে উল্লেখ করেন এ কর্মকর্তা। 

‘‘অবশ্য দায়িত্বটা আমাদের না। এটা হচ্ছে এমআইএস-এর। আমরা টিকা দেই, সেই টেকনিক্যাল ডিজিটাল ডিসপ্লেটা করার দায়িত্ব আমাদের এমআইএস-এর’’, বলেন ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ।