ভুয়া ছবি দিয়ে ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে ‘হালালা সেন্টার’ নামে ক্যাম্পেইন

৮ জুন, ২০২৬

Sanzida Akter নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি ব্যবহার করে হালালা বিয়ের জন্য হালালা সেন্টার নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। উক্ত আইডি থেকে হালালা বিয়ে করতে আগ্রহী পাত্র-পাত্রীদের সিভি পাঠাতেও বলা হচ্ছে।

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে তিন তালাক (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) দেওয়ার পর তারা যদি আবার নিজেদের মধ্যে বিয়ে করতে চান তবে তার পূর্বে ওই স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে স্বাভাবিক নিয়মে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয় এবং সেই স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ বা তার মৃত্যু ঘটতে হয়। পুনরায় প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী বৈধ হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়াকে হালালা বিয়ে বলা হয়।

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ফেসবুক আইডিটি ভুয়া। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিদের আইডি থেকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করে তথাকথিত হালালা সেন্টারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

Sanzida Akter নামে যে আইডি থেকে হালালা সেন্টারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে সে আইডিটি পর্যবেক্ষেণ করলে দেখা যায়, আইডিটি খোলা হয় ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর “Sanzida Akter” নামে। পরবর্তীতে একই দিনে এর নাম পরিবর্তন করে “মুফতি জিয়া বিন কাসেম” রাখা হয়। এরপর ১০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে নাম পরিবর্তন করে “স্বপ্নের ব্যাখ্যা - Dream Explanation” করা হয়। পরে ১০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে আইডিটির নাম “Muhaddisa Apu” রাখা হয়। সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আবার নাম পরিবর্তন করে “Sanzida Akter” রাখা হয়। আইডিটির পেছনে কে বা কারা রয়েছে তার কোন তথ্য আইডি থেকে পাওয়া যায় না।

এছাড়াও আইডিটিতে প্রোফাইল ছবি হিসেবে যে ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি রিভার্স ইমেজ সার্চ দিয়ে দেখা যায়, ছবিটি Joy’s queen নামে একটি টিকটক আইডি থেকে নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কাভার ফটোতে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে দেখা যায়, সেটিও Dola Mallik নামে একটি টিকটক আইডি থেকে নেওয়া।

আইডিটি থেকে গত ৭ জুন একটি রেস্টুরেন্টে বসা কয়েকজন নারী ও পুরুষের কিছু ছবি পোস্ট করে বলা হয়, “গতকাল হালালা সেন্টার ও আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশের আলেম সমাজের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বীনের পথে আমাদের এই অগ্ৰযাত্রাকে আল্লাহ কবুল করুন। আমীন।”

কিন্তু ছবিগুলো রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখা যায়, সেগুলো Hafez Yousuf Abtahi নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে করা একটি পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। ওই পোস্টের ক্যাপশন অনুযায়ী, ছবিগুলো মূলত একটি পরিবারিক ডিনারের ছবি।

ছবিগুলোর ব্যপারে Hafez Yousuf Abtahi নামে ওই ব্যক্তি একটি পোস্টে লিখেছেন, “সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আমাদের পারিবারিক ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এই পোস্টের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি এবং ইতোমধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। যারা উক্ত পোস্ট দেখে আমাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করছেন, তাদের কাছে অনুরোধ—অনুগ্রহ করে সত্যতা যাচাই করুন। ছবিগুলো শুধুমাত্র পারিবারিকভাবে রেস্টুরেন্টে সময় কাটানোর মুহূর্তের ছবি, অন্য কোনো উদ্দেশ্যের নয়। মিথ্যা তথ্য প্রচার, ব্যক্তিগত ছবি অপব্যবহার এবং মানহানিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”

এছাড়াও গত ৬ জুন হালালা সেন্টারের প্রচারণামূলক একটি পোস্টে মুফতি কেফায়ায়াতুল্লাহ কাশফি নামে একজন ব্যক্তিকে উক্ত হালালা সেন্টারের মুহাল্লিল পরিচয় দিয়ে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। 

হালালা বিয়ের ক্ষেত্রে ‘মুহাল্লিল’ হলেন সেই তৃতীয় ব্যক্তি বা অন্তর্বর্তীকালীন স্বামী, যিনি কোনো নারীর পূর্ববর্তী স্বামীর তিন তালাকের পর তাকে আবার প্রথম স্বামীর জন্য ‘হালাল’ বা বৈধ করার উদ্দেশ্যে চুক্তি বা শর্তসাপেক্ষে বিয়ে করেন।  

কিন্তু পোস্টটির কমেন্ট বক্সে মুফতি কেফায়ায়াতুল্লাহ কাশফি নিজেই কমেন্ট করেন, “আমার ছবি এড করার কারণ কি??? দ্রুত রিমুভ করুন অন্যথায় আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।”

পরবর্তীতে মুফতি কেফায়ায়াতুল্লাহ কাশফির সাথে যোগাযোগ করে তিনি আসলেই হালালা সেন্টারের মুহাল্লিল কিনা জানতে চাইলে তিনি দ্য ডিসেন্টকে জানান, তিনি ওই আইডিতে মজার ছলে একটি কমেন্ট করেছিলেন। পরে তিনি দেখতে পারেন তার প্রোফাইল থেকে ছবি নিয়ে উক্ত পোস্টটি করা হয়েছে।

তিনি বলেন,  “আমি একটা কমেন্ট করেছিলাম যার ফলে সে এমন করেছে। সবাই যেরকম মজা করছিলো আমিও মজার ছলেই বলেছিলাম যে, লোক লাগলে দিমুনি।” 

ভুয়া ছবি ও পোস্টের ভিত্তিতে নিউজ

ভুয়া ফেসবুক আইডিটির পোস্ট এবং ছবি কোনো যাচাই বাছাই ছাড়াই সংবাদ আকারে প্রকাশ করেছে কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল। 

গত ৬ জুন দ্য ঢাকা ডায়েরি নামে একটি অনলাইন পোর্টালে ওই ভুয়া আইডির ছবি ও পোস্টের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। “তালাকপ্রাপ্ত নারীদের বিয়েতে সহযোগিতায় ‘হালালা সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা আলেমা সানজিদার” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “শরিয়তসম্মতভাবে তিন তালাকপ্রাপ্ত নারীদের নতুুন বিয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতায় হালালা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন আলেমা সানজিদা আক্তার জান্নাত। শুক্রবার (৫ জুন) নিজের ফেসবুক একাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পৃথক একটি পোস্টে এমন উদ্যোগের ঘোষণা দেন সানজিদা আক্তার। সেদিন ওই পোস্টে তিনি গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শ চান।”

এছাড়াও গত ৭ জুন ইরশাদ২৪ নামে একটি পোর্টালেও আইডিটির ভুয়া ছবি ও পোস্টের ভিত্তিতে “'হালালা সেন্টার', প্রতিষ্ঠাতা আলেমা সানজিদার” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।