আ.লীগ ও ভারতের হয়ে ডিসইনফরমেশন ছড়ানো প্রতিষ্ঠান 'মানবাধিকার সংগঠন' হয়ে ফিরলো দেশি মিডিয়ায়

১৩ মার্চ, ২০২৬

গতকাল ১২ মার্চ বাংলাদেশি বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে যেখানে দাবি করা হয়েছে, বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি চেয়ে ৫টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন বিবৃতি দিয়েছেকয়েকটি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম এখানে দেয়া হল:

বাংলা ট্রিবিউন: “শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি চেয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের আহ্বান”

ঢাকা ট্রিবিউন: “Int’l human rights groups urge Bangladesh to release Shahriar Kabir”

প্রথম আলো: “শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবি ৫ আন্তর্জাতিক সংগঠনের”

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা: “শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি চেয়ে বৈশ্বিক নাগরিক সমাজের আহ্বান”

দ্য ডেইলি স্টার ইংরেজি: “Release Shahriar Kabir immediately: Global civil society orgs appeal to PM”

সমকাল: “শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বৈশ্বিক নাগরিক সমাজের আহ্বান”

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: “Global civil society groups urge PM Tarique to release Shahriar Kabir”

বাংলাদেশ পোস্ট: “Free gravely ill human rights defender Shahriar Kabir Global Civil Society urges Bangladesh PM”

ভিউজ বাংলাদেশ: “লেখক শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি দাবি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর”

সংবাদমাধ্যমগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, লেখক এক্টিভিস্ট শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি চাওয়া সংগঠন ৫টি হল: বেলজিয়ামের সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম (এসএডিএফ), ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম (ইইউ ও যুক্তরাজ্য), জার্মানির ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ, আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক এবং গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স।

দেশি মিডিয়া আউটলেটগুলোর শিরোনামে এবং খবরের ভেতরে ৫টি সংগঠনকে কোথাও ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন’, কোথাও ‘বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ’, কোথাও ‘Int’l human rights groups’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করা হয়েছে।

দ্য ডিসেন্ট এই প্রতিবেদনে দেখার চেষ্টা করেছে আলোচ্য ৫টি সংগঠন কারা?

সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম (এসএডিএফ) ও পাওলো কাসাকা

শাহরিয়ার কবিরকে নিয়ে যুক্ত বিবৃতি দেয়া প্রথম সংগঠনটির নাম বেলজিয়াম ভিত্তিক ‘সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম’ বা (এসএডিএফ)। এই প্রতিষ্ঠানটি কোন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে পরিচিত নয়। বরং এই প্রতিষ্ঠান ও এটির প্রতিষ্ঠাতা পাওলো কাসাকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের সরকারের হয়ে সংঘবদ্ধ ডিসইনফরমেশন ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভাড়া খাটার অভিযোগ রয়েছে।

ইউরোপ ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ইউ ডিসিনফো ল্যাব’ এর ২০২০ সালে প্রকাশিত অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রতিবেদন– যার নাম ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস– এর তথ্য অনুযায়ী, এসএডিএফ ভারতের ব্যবসায়ী শ্রীবাস্তবা গ্রুপের অর্থায়নে পরিচালিত, যা পরবর্তীতে এটির প্রতিষ্ঠাতা পাওলো কাসাকা স্বীকার করেছিলেন।

ইউ ডিসিনফো ল্যাবের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত সরকারের পক্ষে শ্রীবাস্তবা গ্রুপের অর্থায়নে পাকিস্তান এবং চীনের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে একটি সমন্বিত প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল এই এসএডিএফ।

একই সাথে এসএডিএফ এবং এটির প্রতিষ্ঠাতা পাওলো কাসাকা বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট আছে।

২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ভুয়া নির্বাচন পর্যবেক্ষক নিয়ে আসা, ওই নির্বাচনকে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলে বিবৃতি দেয়া, সেই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে  নিয়ে ব্রাসেলস ভিত্তিক বিভিন্ন অখ্যাত ওয়েবসাইটে নিবন্ধ লেখা ইত্যাদি কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন পাওলো কাসাকা এবং তার এসএডিএফ। আওয়ামী লীগের হয়ে কীভাবে ওই সময় পাওলো কাসাকা কাজ করেছেন তার ওপর নেত্র নিউজ ২০২০ সালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যেটির শিরোনাম ছিল, “How a pro-India "disinformation" group helped the Awami League government”.

একইভাবে ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনেও পাওলো কাসাকা ও এসএডিএফ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে এসে মাত্র চারটি আসন পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচনকে স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বলে বিবৃতি দেয়। 

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে SADF-এর নির্বাহী পরিচালক Paulo Casaca আওয়ামী লীগ আয়োজিত শেখ হাসিনার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন বলে জানিয়েছে নেত্র নিউজ।

ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম (ইবিএফ) ও ক্রিস ব্লাকবার্ন

ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম নামক যে সংগঠনের নাম বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে সেটিও দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট। এই প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় দেয়া ক্রিস ব্লাকবার্নের নামও বিবৃতিদাতা হিসেবে রয়েছে। গত প্রায় এক দশক ধরে ক্রিস ব্লাকবার্ন সোশাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে ক্যাম্পেইন করছেন।

ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম সম্পর্কে জানতে অনলাইনে সার্চ করে দেখা যায়, এটির ফেসবুক পেইজ ২০২৩ সালের পর কোনো আপডেট দেয়নি। ফেসবুক পেইজে উল্লেখিত ওয়েবসাইটটি সক্রিয় নয়।

বিডিনিউজ ২৪ এর খবর অনুযায়ী, ২০১৮ সালে জঙ্গিবাদ নির্মুলে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে একটি পোগ্রাম আয়োজন করে ইবিএফ। সেখানে ইবিএফ প্রেসিডেন্ট আহসান আহমেদ উল্লাহ'র পাশাপাশি বক্তৃতা দেন এসএডিফের গবেষণা প্রধান সিগফ্রেড ও উলফ। সেখানে ছবিতে বক্তৃতা দিতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদকে। 

ক্রিস ব্লাকবার্নকে ৫ আগস্টের আগে ও পরে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট একাধিক পোগ্রামে দেখা গেছে। এছাড়া, ২০২৩ সালে "Success in Combating Terrorism in Bangladesh and its Implications for Security in the Region and Beyond" শিরোনামে এক ওয়েবিনারে নিজেকে ইউকে বেজড পলিটিকাল এনালিস্ট পরিচয় দেয়া ক্রিস ব্লাকবার্ন জঙ্গি দমনে শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বিএনপি-জামায়াতকে জঙ্গিবাদ এবং পাকিস্তানিকরণের জন্যে দায়ী করেছিলেন।

এই ওয়েবিনারে তাকে উদ্ধৃত করে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “Blackburn also mentioned that Jamaat-BNP-led monopolized misinformation online has a real effect on the economy of Bangladesh, so both the European and American partners should come forward to fight the disinformation campaign against Bangladesh. 

He further said: “Tarique Zia is a well-known symbol of violence. UK government is also keeping Bangladesh war criminals besides Tarique Zia. UK needs to have a solution to this problem other than kicking the problem down the road. Misinformation in social media is hurting Bangladesh both socio-economically and BNP knows it very well. However, BNP is continuing its campaigns of arson and disinformation.” 

ক্রিস তার এক্স একাউন্টে নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে এক্টিভিজম করেন এবং আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলসহ আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন একাউন্টের পোস্ট নিয়মিত ভিত্তিতে রিপোস্ট করেন। 

ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস এল্যায়ান্স ও এবিএম নাসির

এই নাম সার্চ করলে অনলাইনে একটি ফেসবুক পেইজ পাওয়া যায় যা খোলা হয়েছে গত বছরের জুলাই মাসে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়া এই ফেসবুক পেইজে লেখক শাহরিয়ার কবির, শেখ মুজিবুর রহমান এবং জুলাই -আগস্ট নিয়ে একাধিক আলোচনার ভিডিওর বাইরে আর কিছু পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির কোন ওয়েবসাইটের সন্ধান মেলেনি।

হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে এই পেইজের পোস্ট শেয়ার করতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ ও আওয়ামী লীগের ইউটিউব চ্যানেল থেকেও এই প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অনুষ্ঠানের ভিডিও আপলোড করা হয়েছে।

Freedom and Justice Alliance নামক ফেসবুক পেইজটির বিভিন্ন ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে পোগ্রাম উপস্থাপনা করতে দেখা যাচ্ছে যার নাম এবিএম নাসির। শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি চাওয়ার বিবৃতির খবরেও একই এবিএম নাসিরের নাম পাওয়া যাচ্ছে। 

অনলাইনে সার্চ করে দেখা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। ৫ আগস্টের আগে ও পরে আওয়ামী লীগ সমর্থনে একাধিক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করার খবর অনলাইনে পাওয়া গেছে।

যেমন,২০২৩ সালের জুন মাসে ৬ জন মার্কিন কংগ্রেসম্যান তৎকালীন মার্কিন প্রেসিদেন্ট জো বাইডেনকে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির দ্রুত অবনমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চিঠি দেন। এরপরই ১৯২ জন আমেরিকায় কর্মরত বাংলাদেশি আওয়ামী লীগের পক্ষে এই চিঠির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, এবিএম নাসির ছিলেন তাদেরই একজন।

অর্থাৎ, বর্তমানে শাহরিয়ার কবিরের মানবাধিকারের পক্ষে বিবৃতি দিলেও শেখ হাসিনার শাসনকালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির কালে যেসব মার্কিন কংগ্রেসম্যান বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবিএম নাসির।

একই বছর মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা এবং হয়রানির প্রতিবাদে শেখ হাসিনা বরাবর নোবেলজয়ীদের চিঠি পাঠানোর প্রতিবাদ জানিয়ে আওয়ামীপন্থী ১৯৬ জন বাংলাদেশি-আমেরিকানদের সাথে এবিএম নাসির সেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন।

ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি: ক্লাউস স্ট্রেম্পেল ও সরাফ আহমেদ

‘ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি’ নামে যে সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেটিও বাংলদেশি বংশোদ্ভুত আওয়ামীপন্থী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত।

এটি মূলত জার্মানির লোয়ার স্যাক্সন প্রদেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি সংগঠন, যেখানে স্থানীয় জার্মান কমিউনিটির কিছু ব্যক্তিও যুক্ত রয়েছেন। স্থানীয় ভাষায় সংগঠনটির নাম Arbeitskreis Bangladesch in Niedersachsen (AKBiN).

সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর জাদুঘর ভেঙে ফেলা, বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধাদের কারাগারে পাঠানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে চিঠি পাঠায়।

সে সময়ও আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট বিডিডাইজেস্ট “ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ইউরোপীয় সংগঠনগুলোর চিঠি: ইউনূস-সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার আহ্বান” শিরোনামে চিঠিটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।

এই সংগঠনে স্থানীয় জার্মান কমিউনিউটির এক ব্যক্তি সক্রিয় রয়েছেন যার নাম ক্লাউস স্ট্রেম্পেল। এই সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন বাংলাদেশি ব্যক্তি সরাফ আহমেদ, তিনি আবার দৈনিক প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি লিখেছেন সরাফ আহমেদ

শাহরিয়ার কবির ইস্যুতে প্রকাশিত বিবৃতির খবরটি প্রথম আলোতে “সরাফ আহমেদ (জার্মানি থেকে)” বাইলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।

জার্মানির ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রমের সঙ্গে Sharaf Ahmed এর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উপরেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৯ সালে The Daily Star-এ প্রকাশিত A Better Image of Bangladesh শিরোনামের একটি সাক্ষাৎকারে Sharaf Ahmed-কে ইউরোপে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত একজন সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই সাক্ষাৎকারেও ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন লোয়ার স্যাক্সনের সাথে সরাফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে। ২০১১ সালে সরাফ আহমেদের বাইলাইনে ডেইলি স্টারে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

Sharaf Ahmed বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়েও কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যার ১৯৭৫ সালের প্রবাসজীবন নিয়ে তিনি “প্রবাসে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার দুঃসহ জীবন” শিরোনামে একটি বই লিখেছেন।

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জার্মানিতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সেই সময়কার অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই তিনি বইটি লিখেছেন।

২০২৪ সালে প্রথম আলোতে প্রকাশিত “যেভাবে গণভবনে: ‘কামিং কামিং, রাইটার জার্মানি” শিরোনামে প্রকাশিত মতামত কলামে তিনি উল্লেখ করেন, গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় ৩৫ মিনিট কথা বলেন এবং তাঁর লেখা বই “১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড: প্রবাসে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার দুঃসহ দিন” প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।

শেখ হাসিনার আমলে মানবাধিকার হরণের পক্ষে অবস্থান

২০২৩ সালের জুনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ছয় সদস্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান জোসেপ বোরেল এর কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ছয় সদস্য তাদের চিঠিতে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, নির্বাচনগুলো কারচুপি ও অনিয়মে প্রশ্নবিদ্ধ, বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দমননীতি চলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করেছে এবং সংখ্যালঘুরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন এ অবস্থায় তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপের আহ্বান জানান।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের ওই সমালোচনার বিরুদ্ধে পরে ইউরোপে বসবাসরত কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি পাল্টা চিঠি দেন।

Bangladesh Civil Society in Europe এর উদ্যোগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান জোসেপ বোরেলকে একটি প্রতিক্রিয়াপত্র পাঠানো হয়। সেখানে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের অভিযোগ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে।

চিঠিতে ইউরোপীয় সংসদের কয়েকজন সদস্যের বাংলাদেশ বিষয়ক সমালোচনাকে ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে বলে দাবি করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়।

ওই চিঠিতে ইউরোপে বসবাসরত বিজ্ঞানী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ তিন শতাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক সরাফ আহমেদের নামও উল্লেখ করা হয়।

আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্কের (গ্লোবাল নেটওয়ার্ক) ও তারিক গুনেরসেল

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি হলো Earth Civilization Network। সংগঠনটির উদ্যোগী হিসেবে পরিচিত তুরস্কের কবি ও নাট্যকার তারিক গুনেরসেল (Tarık Günersel)।

সংগঠনটির ওয়েবসাইটে লেখা, Earth Civilization Network মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, যা মানবাধিকার, শান্তি, পরিবেশ এবং বৈশ্বিক সংহতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

নেটওয়ার্কটির ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি কোনো প্রচলিত আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়; বরং বিভিন্ন দেশের লেখক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের একটি synergy platform বা সহযোগিতামূলক নেটওয়ার্ক।

Earth Civilization Network ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের তালিকায় বিভিন্ন দেশের লেখক, কবি, মানবাধিকারকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নাম রয়েছে। সেই তালিকায় বাংলাদেশের লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবির–এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

যে নেটওয়ার্ক থেকে শাহরিয়ার কবিরের মুক্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, সেই নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় শাহরিয়ার কবির নিজেও অংশগ্রহণকারী হিসেবে ওয়বসাইটে উল্লেখ করা আছে।

ফলে Earth Civilization Network–কে সরাসরি একটি প্রাতিষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে না দেখে বরং একটি স্বেচ্ছাসেবী বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম বলা যায়।

এছাড়াও সংগঠনটির উদ্যেক্তা তারিক গুনেরসেলর সাথে Shahriar Kabir from Bangladesh on Secular Humanism - Tarık Günerse সাথে চার বছর আগে ইউটিউবে একটি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর জাদুঘর ভেঙে ফেলা, বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধাদের কারাগারে পাঠানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে চিঠি পাঠানোর তালিকায় নাম ছিল এই সংগঠটিরও।

জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক একাধিক মানবাধিক সংগঠন কর্তৃক শাহরিয়ারের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে

আলোচ্য ৫টি সংগঠন মূলত কোন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন না হলেও এবং এসব সংগঠনের সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও এর আগে জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক বহু সংগঠন লেখক শাহরিয়ার কবিরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়ে একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছে।

গত বছরের  নভেম্বরে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন লেখক শাহরিয়ার কবিরের দ্রুত মুক্তির দাবি করেছিল। একইভাবে গত বছরে রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডার্সের আলাদা এক বিবৃতিতেও শাহরিয়ার কবিরের গ্রেফতারের বিষয়টি উঠে আসে। এর বাইরে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের ২৫ সালের আগস্টের এক বিবৃতিতেও শাহরিয়ার কবিরের বয়সের বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত মুক্তির আহবান জানানো হয় ততকালীন অন্তর্বতীকালীন সরকারের কাছে।