‘মুসলিমদের জন্য কিছুই করব না’: পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বিধায়ক
পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি প্রথমবার সরকার গঠনের কয়েক দিন পর দলটির বিধায়ক রিতেশ তিওয়ারির একটি বক্তব্য অনলাইনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ভাইরাল ভিডিওতে তিওয়ারিকে বলতে শোনা যায়, “পশ্চিমবঙ্গে ৭৪ বছরের নির্বাচনী ইতিহাসে সম্ভবত আমিই এই কেন্দ্রের প্রথম বিধায়ক, যিনি একজন মুসলিমের কাছ থেকেও ভোট পাইনি। তাই যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, শুধু তাদেরই আমার ওপর অধিকার আছে। যারা আমাদের ভোট দেয়নি, তাদের কাছে আমরা ভোট চাইতেও যাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “আজ বাবা ভোলেনাথের সামনে আমি শপথ করছি, আগামী পাঁচ বছরে তাদের—মুসলিমদের—জন্য আমি একটি কাজও করব না। তাদের জন্য কোনো সার্টিফিকেটও দেব না। আমি লাইভে এ কথা বলছি। কে কী বলল বা ভাবল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। মোদিজি বলেন, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। আমি তাঁর সঙ্গে একমত; তিনি আমার নেতা। কিন্তু এই নির্বাচনের সময় তিনি এর সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ করেছেন—‘সবকা হিসাব’। এমনটাই হওয়া উচিত, তাই না?”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্লোগান “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ” উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “কিন্তু এই নির্বাচনের সময় তিনি এর সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ করেছেন—‘সবকা হিসাব’।”
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে কাশীপুর-বেলগাছিয়া আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা অতীন ঘোষকে ১,৬৫১ ভোটে হারিয়ে জয়ী হন তিওয়ারি। ২০১৬ ও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন—দুইবারই তৃণমূল কংগ্রেস এই আসনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল।
‘তৃণমূল ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল’
রিতেশ তিওয়ারির বক্তব্যের পূর্ণ লাইভ ভিডিওটি তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পাওয়া গেছে। ভিডিওটি ১১ মে পোস্ট করা হয়েছিল। তিওয়ারির নির্বাচনী এলাকায় অনুষ্ঠিত ওই ২০ মিনিটের অনুষ্ঠানের ভিডিওতে শুরুতে সমর্থকদের তাঁকে মালা পরাতে দেখা যায়। এরপর তিনি মঞ্চে ওঠেন। ৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড থেকে তিনি বক্তব্য শুরু করেন।
ভাইরাল হওয়া অংশটি শুরু হয় ১৫ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড থেকে। তিওয়ারি যখন বলেন, তিনি মুসলিমদের জন্য কাজ করবেন না, তখন ভিড়ের মধ্যে জোরে করতালি দিতে শোনা যায়।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিওয়ারি ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রসঙ্গ তোলেন এবং বলেন, নারীদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যাতে তারা মুসলিম পরিবারের ঘরে না যায়। তিনি আরও দাবি করেন, যারা তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা বহন করছিল, তারা পশ্চিমবঙ্গে “ইসলামি শাসন” প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
৮ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে তিওয়ারি বলেন, “এটি শুধু আরেকটি নির্বাচন ছিল না। ১৯৫২ সাল থেকে এই রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে। আর আজকের তরুণেরা, যাদের বয়স ১৮ বা তার বেশি… তোমাদের শেখা শুরু করা উচিত, কীভাবে জনসংখ্যার বিন্যাস বদলাচ্ছে। ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন কী? এটি শুধু অর্থনৈতিক বা লিঙ্গ বৈষম্য নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য আগামী দিনে মোকাবিলা করা যেতে পারে। আর যে লিঙ্গবৈষম্য একসময় ছিল, সমাজ জেগে উঠে তা দূর করেছে; কন্যাভ্রূণ হত্যার সংখ্যা কমেছে। আমি দুই কন্যার বাবা এবং আমার ছেলে না থাকায় কোনো আক্ষেপ নেই… আমরা লিঙ্গবৈষম্য থেকে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু এখন সময় এসেছে আমাদের মনোযোগ ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের দিকে নেওয়ার—যেভাবে আমাদের মেয়ে ও বোনদের ভালোবাসার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্কে টানা হচ্ছে, প্রযুক্তির সাহায্যে যেভাবে এই জিহাদিরা হামলা করছে, এসব বিষয়ে নারীদের আরও সচেতন হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মূল বিষয়টি চিহ্নিত করতে হবে—কোনো নারী যেন কোনো মুসলিমের ঘরে না যায়। কিন্তু মানুষ ভয়ে এ কথা বলে না। আর আমরা যেহেতু এটি পুরোপুরি ঠেকাতে পারছি না, তাই এখন সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার, আত্মবিশ্বাস তৈরি করার এবং ছোটবেলা থেকেই তাদের এসব বিষয়ে সচেতন করার… নির্বাচনের আগে যখন আমি ওই মানুষগুলোকে তৃণমূলের পতাকা নিয়ে বসে থাকতে দেখতাম, তারা কোনো বিশেষ মানুষ ছিল না, তারা আনোয়ার খানের বংশধর ছিল না, কোনো রাজবংশেরও ছিল না; তারা আপনার-আমার মতোই মানুষ। আর তারা কার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল? তারা তাদের পতাকা ওড়াচ্ছিল, যারা পশ্চিমবঙ্গে ইসলামি শাসন আনতে চায়… গত পাঁচ বছরে যারা তৃণমূলের পতাকা ওড়াতে ওড়াতে আপনাদের নির্যাতন করেছে, এখন সময় এসেছে তাদের সবাইকে চিহ্নিত করার এবং সামাজিকভাবে বয়কট করার।”
তিওয়ারির মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের করণ থাপারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভারতের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি তিওয়ারির মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি এসব মন্তব্যকে অসাংবিধানিক এবং গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন।
আনসারি বলেন, “যদি বিজয়ী দলের প্রচলিত আদর্শ এমন হয়, তাহলে আমরা যে ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছি বলে দাবি করি, তার জন্য এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য… আমরা নিজেদের গণতন্ত্র বলে দাবি করি, সংবিধানের প্রতি শপথ নেওয়ার দাবি করি। আর সেই সংবিধানের প্রথম পাতায়, অর্থাৎ প্রস্তাবনায়, কিছু মৌলিক নীতি স্পষ্টভাবে বলা আছে। তাঁর এই বক্তব্য কি ওই নীতিগুলোর কোনো একটির সঙ্গেও মেলে?”
তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি সেই সংবিধানের প্রতি শপথ নেন, যার প্রতি আমরা শপথ নিই; আপনি যদি সেই প্রস্তাবনার প্রতি শপথ নেন, যার প্রতি আমরা শপথ নিই, তাহলে আপনি এক নাগরিকের সঙ্গে আরেক নাগরিকের পার্থক্য করতে পারেন না।”
আনসারি আরও বলেন, “আপনারা কি জনসংখ্যার ১৫ শতাংশকে উপেক্ষা করতে যাচ্ছেন? ভ্রাতৃত্ব বলতে কি এটাই বোঝায়? প্রস্তাবনার শেষ শব্দটি দিয়ে কি এটাই বোঝায়?… কোনো রাজনৈতিক দল কি সত্যিই বলতে পারে যে তারা জনসংখ্যার ১৫ শতাংশের বিষয়ে পরোয়া করে না? তারা তা করতে পারে না… মুসলিমরা দেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু। আর অন্যান্য সংখ্যালঘু—খ্রিস্টান, শিখ ও অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে তারা ভারতের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ। তাদের উপেক্ষা করার ভিত্তিতে আপনি গণতন্ত্র চালাতে পারেন না। অন্য কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থা চালাতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্র নয়।”