তারেক রহমান নিজে কবিকে ক্রেডিট দেন, কিন্তু ব্যানারে/পোস্টারে দেয়া হলো না!

১৫ আগস্ট, ২০২৬

গত ৮ আগস্ট রাজধানীর  ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আইইবি ঢাকা কেন্দ্রের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আলোচনা সভা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী এবং স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। বিশেষ অতিথি ছিলেন, সড়ক পরিবহন ও রেলপথ  প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ অনেকেই। 

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী অনুষ্ঠানে জুলাই সংগঠক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম রব্বানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম আবিদকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। 

অনুষ্ঠানের প্রচারণামূলক ফেস্টুন এবং মূল ব্যানারের এলইডি স্ক্রিনে ৪ লাইনের একটি কবিতা যুক্ত করা হয়েছে। যেটির ক্রেডিট লাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম লেখা হয়েছে। অর্থাৎ লেখাটা পড়লে মনে হবে এই উক্তি বা কাব্যাংশটি তারেক রহমান বলেছেন বা লিখেছেন। 

কবিতাটি হলো—

‘‘যদি তুমি ভয় পাও 

তবে তুমি শেষ 

যদি তুমি রুখে দাঁড়াও 

তবে তুমিই বাংলাদেশ’’

কিন্তু এ কবিতার লেখক কবি রকিব লিখন। যে কবিতাটি ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছিল। সে সময় শিক্ষার্থীদের মিছিলের ফেস্টুনে ফেস্টুনে স্লোগান আকারে ছড়িয়ে পড়ে কবিতাটি।  

কবিতাটি কবি রকিব লিখনের ‘তুমিই বাংলাদেশ’ নামক কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। যা ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিউড়ি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। যেখানে প্রথম ‘তুমিই বাংলাদেশ’ শিরোনামে এ কবিতাটি সংকলিত হয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থে মোট ৫৫টি কবিতা মলাটবদ্ধ হয়েছিল।

এ ব্যাপারে কবি রকিব লিখনের সাথে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। 

তিনি বলেন, ‘‘এই লেখাটা আমি ২০১৬ সালে লিখেছিলাম। ২০১৭ সালে এটা উত্তরা হাউজবিল্ডিংয়ের মুক্তমঞ্চের দেয়ালে লিখেছিল একজন। ওখান থেকেই মূলত ছাত্রদের মুখে মুখে ছড়িয়ে যায় ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে।’’

এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ হেলাল উদ্দিন তালুকদার দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘এটা তো তারেক রহমানের কথা না। নিশ্চয়ই কোনো কবি লিখেছেন। এসবের জন্য আমাদের একটি কমিটি ছিল। আমি দেখছি কীভাবে এমনটি হলো।’’  

কবির নামসহ তারেক রহমানের মুখে অসংখ্যবার উচ্চারিত হয়েছে কবিতাটি 

কবি রকিব লিখনের এ কবিতাটি অসংখ্যবার উচ্চারিত হয়েছে ২০১৮ সালের পর। বিএনপির দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে তিনি কবি রকিব লিখনের নামসহ কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন। 

২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর লন্ডনের দ্য রয়েল রিজেন্সিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে বক্তব্যের শেষে তারেক রহমান বলেন, ‘‘তোমাদের সকলকে উদ্দেশ্য করে সেই স্লোগানটি আবার দিয়ে শেষ করতে চাই— যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ।’’

২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি লন্ডনের দ্য রয়েল রিজেন্সিতে শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর ৮৩তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যও এই কবিতার লাইনের মাধ্যমে শেষ করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘‘শহীদ প্রেসিডেন্ট বলে গিয়েছেন রাজনীতির ভাষায়, কবি রকিব বলেছেন কবিতার ভাষায়। কী সেই কথাটি— যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ।’’

২০২৪ সালের ১ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে তারেক রহমান এক ভিডিওবার্তায়ও উচ্চারণ করেছিলেন এই কবিতার লাইন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘‘খুনি হাসিনার বিরুদ্ধে তারুণ্যের এই চলমান আন্দোলনে কবি রকিব লিখনের একটি সাহসী পঙক্তিমালা দিয়ে আমি শেষ করতে চাই, যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ।’’

বিএনপির পেইজেও তারেক রহমানের নামে পোস্ট হয়েছে কবিতাটি

বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে অন্তত ৩ বার দ্য ডিসেন্ট কবিতাটি পোস্ট করতে দেখেছে। এর মধ্যে একবার কারো নাম ছাড়া পোস্ট করা হয়েছে। বাকি দুইবার তারেক রহমানের নামে পোস্ট হয়েছে কবিতাটি। 

২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর তারেক রহমানের এক মিনিটের এক মিনিটের এক বক্তব্যের সাথে এই কবিতাটি লেখা হয় ক্যাপশনে। যদিও মূল কবিতায় ‘রুখে দাঁড়াও’ এর স্থলে ‘এগিয়ে যাও’ লেখা হয়েছে। কবিতার পঙক্তি লিখে তারেক রহমানের নাম লেখা হয়েছে। 

কারো নাম উল্লেখ না করেই ২০২৪ সালের ১ আগস্ট কবিতাটি পোস্ট  করা হয় বিএনপির পেইজে। 

২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট ফের তারেক রহমানের নামে বিএনপির পেইজে কবিতাটি তারেক রহমানের বক্তব্যের সাথে ক্যাপশনে লেখা হয়। 

তারেক রহমান কবিতা পড়ায় ‘চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল’ 

কবি রকিব লিখন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘তারেক রহমান অনেকবার আমার নাম নিয়েছেন। এটা আমার ভালো লাগার বিষয় ছিল। উনি এক জায়গায় বলেছিলেন, ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কবি রকিব লিখছেন’ এরকম লাইন। আমি একটা এমপিওভুক্ত কলেজে চাকরি করি, আমার পোস্টটা ননএমপিও। বুঝতেই পারছেন যে একজন বিরোধী দলের নেতা ওই সময়ে যদি নাম উচ্চারণ করে এবং লেখাটা যদি আন্দোলনে ভাইরাল হয়, আমার উপরে কতটুকু চাপ আসছে।’’

‘‘তারেক রহমান এই কবিতা পড়ায় আমার চাকরিতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তারপরেও ওই যে কিছু কিছু লোক ভালোবাসতো, যার কারণে চাকরিটা যায়নি। সে সময় প্রিন্সিপাল বলছে যে, ওটা ওনার লেখা, মার্কেট পাইছে উনি এখন কী করবে’’, বলেন রকিব লিখন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় কবি রকিব লিখনের ওপর হামলা হয়েছিল

কবি রকিব লিখন বলেন, ‘‘আমি মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত আছি। আমারে কলেজে আমার ওপর হামলা হয়েছিল। আমি একমাত্র এই কলেজের জুলাই যোদ্ধা। যারা আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগের সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপির সময় বিএনপি, জামায়াতের সময় জামায়াত করে। তারা তখন কলেজের ক্ষমতায় ছিল, এখনো আছে।’’

‘‘জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তো কোনোখানে নাম লেখাতেও যাই নাই, দেশের জন্য নামছিলাম, এখন প্রচুর বিপদে আছি,’’ বলেন রকিব লিখন।

২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করায় উত্তরার নওয়াব হাবিবুল্লাহ স্কুল এ্যান্ড কলেজে কর্মরত অবস্থায় তার ওপর হামলা করা হয়। 

এ ঘটনায় তিনিও ৬ জনকে আসামী করে মামলাও করেছিলেন উত্তরা পূর্ব থানায়। তবে বিভিন্ন কারণে মামলা চালাতে পারেননি বলে জানান এই কবি। 

রকিব লিখেন বলেন, জুলাই পরবর্তী জীবনে কবির উপর হামলার পর থেকে তিনি লৌকিকতা ছেড়ে একাকী জীবন বেছে নিয়েছেন। জীবিকার প্রয়োজনে চাকরি করেন।‌ আর বাকি সময় তার পড়ার ঘর অন্ধকার করে তিনি একা একা সময় কাটান। ‘বেঁচে থাকার জন্যই যেন বেঁচে থাকা’ তার জীবনের সংজ্ঞা এখন এমন। 

প্রসঙ্গত, কবি রকিব লিখনের জন্ম জামালপুরের মাদারগঞ্জ থানার ভাংবাড়ি গ্রামে। এ পর্যন্ত তার ৩টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ৩০০ গান ও ৩টি নাটক লিখেছেন তিনি। কর্মসুত্রে ঢাকা উত্তরায় বসবাস করেন। উত্তরার নওয়াব হাবিবুল্লাহ স্কুল এ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।