ডাক্তার ধীপ্রার মৃত্যু নিয়ে যা জানা গেল

ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা। ছবিঃ সংগৃহীত
২১ জুন, ২০২৬

গত ৪ জুন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনার পর ধীপ্রার বন্ধু ও সহপাঠীরা এই মৃত্যুকে ‘অস্বাভাবিক’ উল্লেখ করে এর পেছনে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে দায়ী করে বিচার দাবিতে সরব হন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

সহপাঠীরা ছাড়াও নানা পেশায় যুক্ত মানুষজন এ ঘটনার বিচার দাবিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

সাংবাদিক জুলকারনাইন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘‘আমি সরকারের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে এই ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছি। কোনো নারীই অনাহারে মৃত্যুবরণ করার বা এমন নির্মম নির্যাতন সহ্য করার যোগ্য নন। এই পরিবারের সদস্যরা দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।’’

ডা.ধীপ্রার বান্ধবী ফাবিহা তানজিম লিখেছেন, ‘‘সেদিন কী ঘটেছিল, আমি জানি না। আমার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর নেই। আমি শুধু জানি, সে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং একজন মেয়ে ও একজন মা হিসেবে যে ন্যূনতম সহায়তা পাওয়ার কথা, সেটিও সে পায়নি।’’

গত ১২ জুন ধীপ্রার মৃত্যুর সঠিক তদন্ত ও বিচার চেয়ে ইবরাহিম কার্ডিয়াকের সামনে মানবন্ধন করেন সহপাঠী ও সহকার্মীরা। যদিও ডা. ধীপ্রার পরিবার ঘটনা নিয়ে নীরব রয়েছে। তবে এরই মধ্যে মৃতের স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়িসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন মো. মশিউর রহমান নামের এক আইনজীবী।

দ্য ডিসেন্ট ডা. ধীপ্রার বন্ধু-সহপাঠী এবং তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তার মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে জানার চেষ্টা করেছে। 

মৃত্যু ঘিরে যত অভিযোগ

ডা. ধীপ্রার মৃত্যুর পর ফেসবুকে তার সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের করা পোস্ট থেকে কয়েকটি অভিযোগ চিহ্নিত করেছে দ্য ডিসেন্ট। সেগুলোর মধ্যে ছিল শ্বশুর বাড়ির লোকজন কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শাশুড়ি কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি, চিকিৎসায় অবহেলা এবং পড়াশোনায় সহযোগিতা না করা। সর্বশেষ অসুস্থ হয়ে পড়লে অনাহারে বন্দি করে রাখা, মৃত্যুর দিন অসুস্থ হওয়ার পর বাসার কাছে একাধিক হাসপাতাল থাকার পরও দূরের হাসপাতালে (যেখানে তার শশুর দায়িত্বশীল পদে কর্মরত) নেওয়া ও মৃত্যুর পর তার ফেসবুক পোস্ট ডিলিট করার অভিযোগও করেন তার সহপাঠীরা।

অভিযোগমূলক এসব পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই ডা. ধীপ্রাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ডা. ধীপ্রা ও তার এক বন্ধুর মধ্যকার কথোপকথনের স্ক্রিনশটে আঘাতের কারণে তার মুখে ও হাতে জখমের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। ওই কথোপকথনে ধীপ্রা তার বন্ধুকে বলছিলেন তার স্বামী ও শাশুড়ির আঘাতেই এমন জখম হয়েছিল। 

ছড়িয়ে পড়া কথোপকথনের এসব স্ক্রিনশটে শাশুড়ি এবং ননদদের খবরদারির জন্য তিনি শশুরের বাসায় তার এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেননি বলেও বন্ধু-সহপাঠীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। 

এছাড়া একাধিক ফেসবুক পোস্টে মৃত্যুর পূর্বে ৩দিন তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখার অভিযোগ করে বলা হয়, সে সময় তাকে খাবার খেতেও দেওয়া হয়নি। তাছাড়া মৃত্যুর দিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কাছের হাসপাতালে না নিয়ে দূরের বারডেম হাসপাতালে কেন নেওয়া হয়েছিল সে প্রশ্নও তোলেন সহপাঠীরা।

একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ধীপ্রার মৃত্যুর পরপরই তার ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয় এবং তড়িঘড়ি করে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। 

সহপাঠীরা যা বলছেন

দ্য ডিসেন্ট ডা. ধীপ্রার মৃত্যুর পর তার কলেজ ও মেডিকেলের একাধিক সহপাঠীর সাথে কথা বলেছে, যাদের সাথে তিনি বিভিন্ন সময় শশুরবাড়ির ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলতেন ধীপ্রা। 

এরমধ্যে তার ঢাকা সিটি কলেজের একজন নারী সহপাঠী (নাম প্রকাশ করতে চাননি) দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘ধীপ্রা আমাকে নানা সময়ে খণ্ড খণ্ড করে ওর শাশুড়িকে নিয়ে বলছে, শাশুড়ি ওকে কথা শোনাচ্ছে, শাশুড়ি ওকে মেন্টাল টর্চার করছে, ওর ননাসরা ওকে মেন্টাল টর্চার করছে। ও মারা যাবার পরে আমার অনেকক্ষণ সময় লাগছে এটা বিশ্বাস করতে যে ও মারা গেছে। কারণ ও খুব স্ট্রং ও অনেক ভোকাল একটা মেয়ে ছিল। ও যেকোনো কিছু নিয়ে সবসময় নিজে ও স্ট্যান্ড নিতো। তো এভাবে যে ও মারা যাবে, জিনিসটা হজম করতে অনেক সময় লাগছিল আমাদের সবার।’’

ধীপ্রার বাংলাদেশ মেডিকেলের আরেক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘ধীপ্রা আমার সাথে তার সমস্যার কথা ২০২৪ সাল থেকেই শেয়ার করতো। বলতো যে, শাশুড়ি হেল্প করে না, শাশুড়ি কথা শোনায়। অনেক ঝামেলা হয় বাসায়। আমি বলতাম স্বামীসহ আলাদা বাসা নেওয়া যায় কিনা। ওর সাথে সর্বশেষ কনভার্সেশন আমার আলাদা বাসা নেওয়া নিয়েই হইছিল। ও নানা সময় বলতো যে ওর বাবা-মা বা ভাইও এ ক্ষেত্রে ওকে সহযোগিতা করছে না। হয়তো ওর শশুরবাড়ির লোকজন অনেক প্রভাবশালী বলে তারা কিছু বলার সাহস করতো না। কিন্তু ব্যাপারটা যে এতোদূর গড়াবে আমরা কল্পনাও করিনি’’

‘‘ঘটনার দিন আমি শুনেই বারডেমে গেছি। পরে দেখলাম সবাই খুব তাড়াহুড়ো করে সব গুছাচ্ছে। যেন কোনো রকম জানাজা করে দাফন করে দিলেই বাঁচে’’ বলেন, ধীপ্রার ওই সহপাঠী। 

আদালতে মামলা

এদিকে ডা. মৃত্যুর ঘটনায় স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়িসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আদালতে। 

অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মো. মশিউর রহমান শাহ নামক এক আইনজীবী এ মামলার আবেদন করেন। আদালত সিআইডিকে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

ডা. ধীপ্রার স্বামী ডা. রহমত রশীদ, শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ, শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা এবং ডা. আব্দুর রশীদের জামাতা স্যাটায়ার পেইজ ইয়ার্কির সম্পাদক শিমু নাসেরসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে এ মামলার আসামি করা হয়েছে। 

অবহেলাজনিত মৃত্যু, নির্যাতন এবং সুপরিকল্পিতভাবে পোস্টমর্টেম ছাড়াই লাশ দাফন ও আলামত গোপনের অভিযোগে মামলা দায়েরের আবেদন করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে আইনজীবী মো. মশিউর রহমান শাহের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘‘ডা. ধীপ্রার পরিবারের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যোগাযোগও নেই। আমি ন্যায়বিচারের জন্য মামলা করেছি। আদালত সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এখন তদন্তে অভিযুক্তরা দোষী হলে শাস্তি হবে নচেৎ নয়।’’

মামলার অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘‘এখনও এ বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই। ১৬ তারিখ কোর্ট অর্ডার দিছে। ফর্মালি পুরো নোটিশটা আমাদের এখানে পাঠাবে, সময় লাগবে। আমরা আগামী সপ্তাহে হয়তো পেয়ে যাবো৷’’

যা বলছেন ধীপ্রার শশুরবাড়ির লোকজন

২০২০ সালে ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা এবং ডা. রহমত রশিদ সিয়াম বিয়ে করেন। সিয়াম নামে তাদের এক ছেলে সন্তানও রয়েছে। ধীপ্রার শ্বশুড় ডা. এম এ রশিদ শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক। এক ননদ সাবহানাজ রশীদ দিয়া এক সময় ফেসবুকের বাংলাদেশ বিষয়ক পাবলিক পলিসি ম্যানেজার হিসাবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। সাবহানাজ রশীদের স্বামী শিমু নাসের পলিটিক্যাল স্যাটায়ারিস্ট ও eআরকি এর সম্পাদক। আইনজীবী মশিউর রহমানের দায়ের করা মামলায় শিমু নাসেরকেও আসামি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে ধীপ্রার স্বামী ডা. রহমত রশিদ সিয়ামের সাথে ফোনে এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শ্বশুর ডা. এম এ রশিদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন ‘‘এটা এখন সিআইডি তদন্ত করছে। এখন আমার কথা বলা ঠিক হবে না।’’

শিমু নাসের বলেছেন, ‘‘এটা নিয়ে মামলা হয়েছে। আমি ঘটনার আগেও নাই পিছনেও নাই। আমি দেশের বাইরে ছিলাম। দুই তারিখ রাতে আমি নেপাল থেকে আসছি। এসে নিজের বাসায়ই ছিলাম। এর পরেরদিন সম্ভবত তাদের বাসায় গেছি। আমি মিষ্টি নিয়ে গেছিলাম একটা কাজে। মিষ্টি দিয়ে চলে আসছি। এর বাইরে তেমন কিছু জানি না।’’

তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার দিন আমার অফিসের ছেলেপেলেদের সঙ্গে আমি ‘রইদ’ সিনেমা দেখতে গেছিলাম। অফিসে এসে রাত আটটা বা সাড়ে আটটার সময় আমার ওয়াইফ ফোন করছে কানাডা থেকে যে, ধীপ্রা মারা গেছে। আমাদের জন্য এটা খুবই আনবিলিভেবল ঘটনা। পরে তাদের বাসায় গেছি। গিয়ে দেখি বাচ্চাটা আছে আর আমার শাশুড়ি আছে। পরে হসপিটালে গিয়ে দেখলাম যে, লাশ ফ্রিজারে ঢোকাচ্ছে। এই হলো আমার ইনভলভমেন্ট।’’

‘‘সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ আমার নামে বিভিন্ন কথাবার্তা ছড়াচ্ছে। তাদের কী উদ্দেশ্য কেন এসব ছড়াচ্ছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কেন আমার নাম, আমার ওয়াইফের নাম এটার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। নো আইডিয়া।’’, বলেন শিমু নাসের।

বক্তব্য বদলালেন ধীপ্রার বাবা

সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ডা. ধীপ্রার বাবা আলাউদ্দিনের সাথে। প্রথমে গত ১৪ জুন তিনি দ্য ডিসেন্টকে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এরকম বক্তব্য দিয়েছিলেন। 

তখন তিনি বলেন, ‘‘মেয়ে তো মারা গেছে। এখন এসব অভিযোগ বা আলোচনা করে লাভ নাই। মেয়েকে তো আর ফেরত পাবো না। তাই অনেক আত্মীয় স্বজন বললেও আমি কোনো পদক্ষেপে যাইনি।’’

ডা. ধীপ্রা আগে কখনও পরিবারকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ব্যাপারে জানিয়েছিলেন কিনা; এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘হ্যা, নির্যাতন করতো সত্য। সে বলতো। কিন্তু আমরা ওরকম বুঝিয়ে বলতাম তাকে। তখন এসব নিয়ে কিছু বলতে গেলে যদি বলতো আপনার মেয়েকে নিয়ে যান তাইলে তো কিছু করার থাকতো না। চাইতাম সংসারটা না ভাঙুক। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হবে ভাবিনি।’’

‘‘আমার একটা নাতি আছে। এখন জামাই যদি আরেকটা বিয়ে করে, তাইকে ওর কি হবে? তাকে তো বড় করতে হবে। এসব চিন্তা করে অভিযোগের দিকে যাইনি।’’, বলেন আলাউদ্দিন।

এরপর ১৮ জুন এই প্রতিবেদক ফোন করে সাক্ষাতে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি প্রথমে দেখা করতে রাজি হননি। তখন জনাব আলাউদ্দিন দ্য ডিসেন্টকে দেয়া তার আগের বক্তব্য থেকে সরে আসেন। 

এবার তিনি বলেন, “আমার সাথে নির্যাতন বিষয়ক কোন আলাপ হতো না। সে একটু চাপা স্বভাবের ছিল। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাও বলতো না।”

কথপোকথনের এক পর্যায়ে সাক্ষাতে কথা বলতে রাজি হয়ে পরদিন শুক্রবার সময় দিয়েছিলেন। তবে শুক্রবার সকাল থেকে একাধিকবার কল করলেও আলাউদ্দিন সাড়া দেননি।

ধীপ্রার মায়ের সাথে ফোনে কথা বললে তিনিও, নির্যাতন বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না বলে জানান।