তেলাওয়াত-রত মেয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের ভিডিও আপলোড করে লেখা হয়েছে “কনটা পছন্দ হয়”?

১৭ জুলাই, ২০২৬

দুই ছেলের ছবি নিজের ছবির দুই পাশে রেখে এক শিক্ষক লিখেছেন, ‘দুই পাশে দুই সন্দরী’।

শিশু বয়সী কয়েকজন ছাত্রী কালো বোরকা ও নিকাব পরাবাস্থায় একটি ঘরের মেঝেতে বসে পবিত্র কোরআন তেলওয়াত করছে। বয়স তাদের আনুমানিক ১০ বছরের কমবেশি হবে। কণ্ঠে সুরেলা তেলাওয়াত। সামনে রেয়ালের ওপর রাখা কোরআন শরীফের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ। এই দৃশ্য ধারণ করে তাদেরই শিক্ষক এইচ এম নাইম হাসান পোস্ট করেছেন নিজের টিকটক একাউন্টে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওর স্ক্রিনে বড় অক্ষরে লিখে দিয়েছেন, “কনটা পছন্দ হয়”। সাথে যোগ করেছেন ‘ভালোবাসা’র লাল/হলুদ ইমোজি। ভিডিওটির ক্যাপশনে আবার লিখেছেন, “পছন্দ হলে বলবেন”। ভিডিওটি আপলোড করা হয়েছে ২০২৫ সালের ২৪ জুন তারিখে।

এইচ এম নাইম হাসানের টিকটক আইডির নাম ♣️☆NAIM NUR☆♣️। ৪ হাজারের কিছু বেশি ফলোয়ারযুক্ত আইডিটিতে সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। গত এক বছর ধরে মাদ্রাসার শিশু বয়সী ছেলে বাচ্চাদের পড়াশোনা, খাওয়া দাওয়া, খেলাধুলা ইত্যাদির ভিডিও আপলোড করছেন।

২০২৫-এ তার একাউন্টে মেয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের আরও বেশ কয়েকটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। অন্তত ১০টি ভিডিও দেখেছে দ্য ডিসেন্ট। 

এরকম একটি ভিডিওতে তিনজন ছাত্রীকে দেখা যাচ্ছে যেটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “চারটা বিয়া করা সুন্নত, এখানে তিনটা আছে।” 

অন্য আরেক ভিডিওতে একজন ছাত্রীকে তেলাওয়ারত দেখা যায়। সেটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “কিউট আছে কিন্তু।” 

এক ভিডিওতে নিকাব পরা এক শিশুর দৃশ্য আপলোড করে লেখা হয়েছে, “ইশ, কী লজ্জা পেলো”। একজন টিকটক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন এরা কারা। উত্তরে নাইম হাসান লিখেছেন, ““কী ভাইয়া, পছন্দ হয়?”

অন্তত ৫টি ভিডিওতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীদের কোরআন পড়ার ভিডিও আপলোড করে ক্যাপশন লেখা হয়েছে, “কোনটা পছন্দ হয়?”

এছাড়া কয়েকজন ছেলে শিশু ক্লাসে পড়াশোনা করছে– এমন একটা ভিডিওর ক্যাপশনে লিখা হয়েছে, “হ্যাঁ এটা একটা ইসলামিক ভিডিও, কেউ এরিয়ে যাবেননা।”

বাচ্চাদের নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন, মন্তব্য

একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অল্প বয়সী সুদর্শন একটি ছেলে একটি বড় ঘরের মেঝেতে শিক্ষকের সামনে বসে তেলাওয়াত শোনাচ্ছে। তার পেছনে আরও অনেক ছেলে তেলাওয়ারত। ছেলেটির সামনে বসা শিক্ষক ডান পা লম্বা করে এমনভাবে রেখেছেন যেন সেটি তেলাওয়াত শোনাতে আসা ছাত্রটির গায়ে লেগে আছে। এই ভিডিওর স্ক্রিনে লেখা রয়েছে, “মাদ্রাসার সব কিউট সুন্দরী ছাত্র আমার গ্রুপে পড়ে।” একই ভিডিওর ক্যাপশন, “সব গুলাই কিউট মাশাল্লাহ”।

এই ভিডিওর নিচে ৭জন ব্যক্তি কমেন্ট করেছে। তার মধ্যে দুটি কমেন্ট হলো, “মাদ্রাসা লাইফ টা অনেক মিস করি। প্রতিদিন খেলা করতাম ওর থেকেও সুন্দর ছাত্র ছিলো।” আরেকটি কমেন্টে লেখা হয়েছে, “মন চাই খেয়ে দিতে।”

উপরে উল্লিখিত তিন ছাত্রীর একটি ভিডিওর কমেন্টে এক মন্তব্যকারী লিখেছেন, “আমার তিনটাকেই লাগবে”।

নাইমের একাউন্টের ১০০ এর বেশি ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ২২টি ভিডিওতে মেয়ে অথবা ছেলে শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় ক্যাপশন দেয়া হয়েছে। এসব ভিডিওর কমেন্টে কয়েকশ ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন এবং সেসব মন্তব্যে নানান ধরনের যৌন ইঙ্গিত ছিল। অনেকে ভিডিওতে দৃশ্যমান মেয়েদেরকে নিজেদের জন্য বেছে নেন। যেমন একজনের মন্তব্য, “এটাকে আমার লাগবে”। 

দ্য ডিসেন্ট এমন কয়েক ডজন আইডি খুঁজে পেয়েছে যারা কাওমি বা কোরআন শিক্ষা মাদ্রাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ভিডিও প্রচার করেন। এসব একাউন্টে দেখতে আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত শিশু ছাত্রদের “সুন্দরী” নামে ডাকা হয়েছে। স্বাস্থ্য ভালো এমন শিশুদের সম্বোধন করা হয়েছে “তুলতুলে বালিশ”, “হাওয়ার মিঠাই” ও “রসগোল্লা”র মতো নামে।


কে এই নাইম হাসান?

তার প্রকাশ করা ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দ্য ডিসেন্ট তার সম্ভাব্য ঠিকানা হিসেবে প্রথমে দুটি জায়গা চিহ্নিত করে। এর একটি ফরিদপুর জেলা সদর এবং অন্যটি ঝালকাঠি জেলা সদর।

এরপর ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশনে নাইমের বর্তমান অবস্থান ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা সদরের রাজাপুর বাজারের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত একটি মাদ্রাসাকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। মাদ্রাসাটির নাম মারকাজুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা।

আজ শুক্রবার দ্য ডিসেন্ট এর সাথে কথা হয়েছে মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ আল মামুন খানের সাথে। টিকটক প্রোফাইলের ছবি দেখানোর পর তিনি নিশ্চিত করে এইচ এম নাইম হাসান তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং তিনি বর্তমানে মাদ্রাসায় অবস্থান করছেন।

নাইমের টিকটক একাউন্টের কিছু কন্টেন্ট পাঠানোর পর ফোন করে আল মামুন খান বলেন, “আমি তো এসব জানতাম না। এসব তো মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ। বাচ্চাদের ভিডিও এভাবে প্রকাশ করবে কেন? আমি আরও বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেব।”

এরপর আবার মামুন খানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “নাইম হাসানের সাথে কথা হয়েছে এবং সে বলেছে এগুলো আগে করতো এখন আর করবে না।”

যে দুই ছাত্রের ছবি পোস্ট করে নাইম ‘দুই পাশে দুই সুন্দরী’ লিখেছেন সেই দুজন আপনার মাদ্রাসায় পড়ে কিনা, জানতে চাইলে মামুন খান জানান তারা তারই মাদ্রাসার ছাত্র।

এ বিষয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে শনিবার মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে বলে শুক্রবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন জনাব মামুন।

টিকটকার নাইম মাদ্রাসায় পড়ানোর পাশাপাশি অনলাইনে হাতে তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র যেমন টিস্যু বক্স, কলমদানি ইত্যাদি বিক্রি করেন। কিছু ভিডিওতে তিনি তার যোগাযোগের নম্বর দিয়ে রেখেছেন। সেই নম্বরে প্রথমে ক্রেতা সেজে নাইমের বাড়ি ও মাদ্রাসার ঠিকানা এবং অন্যান্য বিষয়ে জানার চেষ্টা করলে তিনি জানাতে দিতে রাজি হননি।

তবে মাদ্রাসার পরিচালকের ঠিকানা সংগ্রহের পর তার মাধ্যমে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হন নাইম। তিনি জানান, তার বাড়ি ফরিদপুর সদরের ঝিলটুলি এলাকায়। বাবার নাম বলতে রাজি হননি। বর্তমানে ঝালকাঠির ওই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন।

তার প্রকাশ করা ভিডিও কনেন্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে বলেছেন, তিনি ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং গতকাল ফেসবুকে তার কিছু কন্টেন্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল হওয়ার পর থেকে আজ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ১২৭টি ভিডিও একাউন্ট থেকে ডিলিট করেছেন।

“প্রয়োজনে আমি একাউন্টই ডিলিট করে দেব। আমি আসলে না বুঝে এসব ভিডিও প্রকাশ করেছিলাম। এখন মানুষজন বলায় বুঝতে পেরেছে আমার ভুল হয়েছে। আপনারা এই ছোটখাটো বিষয়টা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়েছেন কেন”, প্রশ্ন করেন নাইম।


‘মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভিডিওগুলো বাসায় তোলা’

এই টিকটকার শিক্ষক জানিয়েছেন বর্তমানে যেখানে পড়াচ্ছেন সেই মাদ্রাসায় কোন মেয়ে নেই। এখানে শুধু ছেলেরা পড়ে। দুই বছর আগে তিনি মেয়েদের ভিডিওগুলো ধারণ করেছিলেন বলে জানান। যদিও টিকটকে সেগুলো এক বছর আগে (২০২৫) আপলোড করা হয়েছে। পরিচালক আল মামুন খানও বলেছেন তার মাদ্রাসাটিতে শুধু ছেলেদের ভর্তি করানো হয়।

মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভিডিওগুলো কোন মাদ্রাসায় ধারণ করা জানতে চাইলে নাইম বলেন, “এগুলো আসলে মাদ্রাসায় তোলা না। রাজাপুর সদরেই আমি আমার ওয়াইফকে নিয়ে একটা বাসায় থাকতাম। সেখানে সে কয়েকজন মেয়েকে পড়াতো। ওদের কিছু ভিডিও সে তার একাউন্টে আপলোড করেছিল। আমিও কয়েকটা আমার একাউন্টে আপ করি।”

ওই সময় তিনি রাজাপুরের আরেকটি মাদ্রাসায় (নাম দারুল ইসলাম মডেল মাদ্রাসা) পড়াতেন বলে জানান। ওই মাদ্রাসার পরিচালকের নাম ও যোগাযোগ নম্বর চাইলে তার কাছে নেই বলে জানান। 

“দুই পাশে দুই সুন্দরী” লিখে দুই ছেলে শিক্ষার্থীর ছবি আপলোড করেছেন কেন– প্রশ্ন করলে নাইম বলেন, “আসলে এটা এমনিই করেছি।”

অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের আগে তাদের অভিভাবকদের অনুমতি নেওয়া হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না। কোনো অভিভাবকের অনুমতি নেইনি। মাঝে মাঝে ভিডিওর কমেন্টে দেখতাম অনেকেই ছাত্রদের নাম ধরে বলতো তার ভিডিও দেন। আমিও রিপ্লাই দিতাম। ভিডিও দিতাম। ভাবতাম হয়তো পরিচয় আছে কিনা।”

যাদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন তারা জানতো কিনা- এর জবাবে বলেছেন, “হ্যাঁ ছাত্ররা জানতো যে, আমি ভিডিও করে আপলোড দিতাম। তবে সব ছাত্র না। ৪০% এর মতো মতো ছাত্র জানতো।”

এসব ভিডিওর মাধ্যমে তিনি কোনো অর্থ উপার্জন করেন না বলেও জানান।

“কিছু কিছু ভিডিওতে আমি ভিন্ন রকম (ইঙ্গিতপূর্ণ) ক্যাপশন দিয়েছিলাম, এটা আমার ভুল ছিলো। আমি ঐ রকম ভিডিও কেটে (ডিলেট) দিয়েছি। আর ঐ সকল ভিডিও হবেনা ইনশা আল্লাহ”, বলেন নাইম হাসান।

তিনি বলেছেন, “আমি ভিডিও করা বাদ দিবো। তবে মাঝেমধ্যে ক্লাসে কোনো কিছু সুন্দর লাগলে সেটা হয়তো ভিডিও করে পাবলিশ করবো।”


৪ বছরের কান্নারত বাচ্চার মুখে লাঠি দিয়ে খোঁচা

অনুসন্ধানে মাদ্রাসায় পড়ুয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ভিডিও প্রচার করা এ ধরণের আরো কিছু টিকটক একাউন্ট খুঁজে পাওয়া গেছে।

“ঘ্যারত্যাড়া শাহজাদা” নামের আরেকটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে ছোট শিশুদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেও শিশুদের উপস্থাপন এবং ক্যাপশনের ধরনে মিল পাওয়া গেছে।

“ঘ্যারত্যাড়া শাহজাদা” একাউন্টে দেখা যায়, একজন ৩/৪ বছরের মেয়ে বাচ্চা আরবি পড়ছে। তখন শিক্ষক একটি লাঠি দিয়ে ঐ ছাত্রীর ঠোটে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। ছাত্রীটি কান্না করছে এবং কান্না করতে গিয়ে শিশুটির মুখ খুললে ঐ শিক্ষক তার হাতে থাকা লাঠি শিশুটির মুখে ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি ও খোচা দিয়েছেন।

এই ভিডিওটি “পিচ্ছি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে” ক্যাপশনে টিকটকে আপলোড করা হয়।  এছাড়াও একই পোস্টে লেখা হয়, “কি মায়া করে কান্না করে গো।” 

১৬ জুলাই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর একাউন্টটি ডিলেট করে দেওয়া হয়েছে। 

কয়েকটি ভিডিও বিশ্লেষণে দ্য ডিসেন্ট এই একাউন্টের মালিকের অবস্থান লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরে বলে প্রমাণ পেয়েছে। রায়পুরের হায়দরগঞ্জ দারুল কোরআন ইসলামিক একাডেমি নামের একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভিডিও এটিতে প্রকাশিত হতো। মুখে লাঠি দিয়ে খোচা দেয়া শিশুটির গলায় যে আইডিকার্ড ঝুলছে সেটিতেও একই প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা।

এ বিষয়ে হায়দরগঞ্জ দারুল কোরআন ইসলামিক একাডেমির সভাপতি জনাব মোঃ মঞ্জুর আহমেদ দ্য ডিসেন্টকে বলেছে, “আমরা এই বিষয়ে অবগত হয়েছি। ভিডিওগুলো দেখেছি। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।”

তবে তিনি জড়িত ‘শাহজাদার’ নামের ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় বা তার বিরুদ্ধে কী ‘ব্যবস্থা’ নেয়া হবে জিজ্ঞেস করলে ব্যস্ততার কথা বলে কল কেটে দেন মঞ্জুর আহমেদ।

“ঘ্যারত্যাড়া শাহজাদা” নামক একাউন্টে সরাসরি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অনেক কন্টেন্ট পাওয়া গেছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার একটি ভিডিও আপলোড করে সেটির স্ক্রিনে তিনি লিখেছেন, “রাত বারোটা বাজলে ঘড়ির কাটাও একটা আরেকটার উপর ‍উঠে যায়! আর আমরা তো মানুষ।”

এছাড়াও বাচ্চা মেয়েদের মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে গাল টিপে দেয়ার একাধিক ভিডিও আছে এই একাউন্টে। একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ৬/৭ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ের গাল টিপে দিচ্ছেন আর ভিডিও স্ক্রিনে লেখা রয়েছে, “ভালোবাসা!”

এ ব্যাপারে রায়পুর থানার ওসির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

“সেক্সি হুজুর” ও “কিউট হুজুর”: আছে এমন কয়েক ডজন টিকটকার 

এক বা দুটি নয়, এমন আপত্তিকর, ইঙ্গিতপূর্ণ কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার করছেন। 

এ ছাড়াও টিকটকে, “হবিগঞ্জের কিউট হুজুর”, “কওমির হুজুর”, “সেক্সি হুজুর” ও “কিউট হুজুর” নাম ব্যবহার করা আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট সামনে এসেছে, যেখানে মাদ্রাসা পড়ুয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ভিডিও প্রচার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের একাউন্ট থেকে শুধু নিজের বিভিন্ন এঙ্গেলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে যৌন উত্তেজক কথাবার্তা, গান যুক্ত করে দেয়া হয়। একাধিক একাউন্টের মালিক নিয়মিত তাদের ভিডিও পোস্ট করলেও চেহারা ডেকে রাখেন। কিছু ক্ষেত্রে ইসলামি গজল যুক্ত করে খুবই সাধারণ বিভিন্ন ভিডিও আপলোড করা হয়।

এমন একটি টিকটক একাউন্ট “খুলনা জেলার ছেলে আমি (@.ss.......s...s)”

একাউন্টটিতে বিভিন্ন সময় ‘ইসলামিক’ কন্টেন্ট আপলোড করা হয়। যেখানে প্রকৃতি, মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রি ইত্যাদি ভিডিওর সাথে ইসলামিক গান জুড়ে দেওয়া হয়।

গত ১৪ জুলাই এই একাউন্টে আপলোড করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন হুজুর যিনি দাড়ি টুপি ও পাঞ্জাবী পরে আছেন। তিনি একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মাদ্রাসার ছাত্রের হাত ধরে নিজের দিকে টেনে আনছেন। ক্যামেরার সামনে আসতেই ছাত্রটি হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে। 

ভিডিওটির ক্যাপশন ছিলো, “আছকে একটা মায়াবতি নাই বলে…”

ভিডিওটির কমেন্টে অনেকে মন্তব্য করেছেন, “আপনার মায়াবতী অনেক সুন্দর।”

৬০ হাজার ফলোয়ার যুক্ত আরেকটি টিকটক একাউন্ট “হবিগঞ্জের কিউট হুজুর”। এই একাউন্টে একজন শিক্ষক তিনি তার শিক্ষার্থীদের কোরআন পড়ার ভিডিও, ছোট শিক্ষার্থীদের কান্নার ভিডিও, ইত্যাদি শেয়ার করে থাকেন।

টিকটক একাউন্টটির বায়োতে আবার একটি “হাফেজ আবদুল বাছির” নামে ফেসবুক একাউন্টের  লিংক দেওয়া আছে। ফেসবুক একাউন্টটির বায়োতে লেখা আছে, “💫🌿❤️মিষ্টি হুজুরনী🥀রমিষ্টি হুজুর🌿❤️সফল না হওয়ার আগে জীবন সঙ্গি করব না ইনশাআল্লাহ⭐!..★''জীবনে পাওয়া,,আল্লাহ দেওয়া সব থেকে বড় উপহার'টাই হলো,,দ্বীনদার জীবনসঙ্গী...!!🤎🫶”

সেখানেও বিভিন্ন শিশুদের কোরআন পড়ার ভিডিও, খাবার গ্রহণের ভিডিও, কান্নার ভিডিও শেয়ার দেওয়া হয়। যেমন একই রকম একাধিক ভিডিও শেয়ার দেওয়া হয়েছে যেখানে দেখা যায়, একজন শিশু কান্না করছে। এইরকম ভিডিও আপলোড করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “মায়ের কোলে থাকা সন্তান মাদ্রাসা আলু ভর্তা ডাল খায়”।

আরেকটি টিকটক একাউন্টের নাম Md Rayhan (@mdrayhanmia264)। এই একাউন্টটিতেও কয়েক ডজন ভিডিওতে মাদ্রাসার ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। যেখানে বেশীরভাগ ভিডিওতেই ছোট ছোট শিশুদের হাসির ভিডিও প্রচার করে ‘কিউট’, ‘সুন্দরী’ ইত্যাদি ক্যাপশনে প্রচার করা হয়েছে। 


আইন কী বলে

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। আইনটির ৮১ ধারায় বলা হয়েছে, শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী এমন প্রতিবেদন, ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, যার মাধ্যমে তাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়। ধারাটি মূলত বিচার বা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিশুর পরিচয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারপরও এটি শিশুদের শনাক্তকারী তথ্য প্রকাশে বাংলাদেশের আইনি দৃষ্টিভঙ্গি নির্দেশ করে। 

২০০৯ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনা নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত আইন হিসেবে কার্যকর থাকার কথা বলা হয়। ২০২৩ সালেও হাইকোর্ট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। 

২০২৬ সালের মে মাসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন মাদ্রাসায় শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিটি মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের দাবি জানায়।

এছাড়াও, টিকটকের নীতিমালায় শিশুদের যৌন শোষণ কিংবা যৌনভাবে উপস্থাপন করা কনটেন্ট নিষিদ্ধ। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এ ধরনের কনটেন্ট শনাক্ত হলে তারা ভিডিও সরিয়ে নিতে, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে।

তবে মাদ্রাসার শিশুদের এসব ভিডিওগুলোতে সরাসরি যৌন কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। যৌন ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে প্রধানত ক্যাপশন ও উপস্থাপনের মাধ্যমে।

শিশু কোরআন পড়ছে, শ্রেণিকক্ষে বসে আছে বা লজ্জায় মুখ নিচু করছে—এসব তার স্বাভাবিক শৈশব ও শিক্ষাজীবনের অংশ। সেই মুহূর্ত গোপনে ধারণ করে প্রাপ্তবয়স্কদের “পছন্দ”, “বিয়ে” বা আকর্ষণের ভাষায় প্রকাশ করলে শিশুর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আর থাকে না।

তখন সে আর শুধু মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থী থাকে না। ইন্টারনেটের অজানা দর্শকদের সামনে তাকে একটি পণ্য, বিনোদনের উপকরণ অথবা পছন্দ করার বস্তুতে পরিণত করা হয়।

-প্রতিবেদনে কন্ট্রিবিউট করেছেন দ্য ডিসেন্ট এর ফ্যাক্ট চেক ইন্টার্ন রাব্বী মিয়া।
-প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঝালকাঠির সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার পরিচালকের বক্তব্য আপডেট করা হয়েছে।