সন্দেহজনক ওয়েবসাইটকে ‘মার্কিন গণমাধ্যম’ সাজিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে আ.লীগ
২০২৪ সালে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন নয়। পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই এ ধরনের অভিযোগ করেছেন, যদিও কোনো নির্ভরযোগ্য তদন্তে বা সূত্রে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা পেজ দৈনিক আজকের কণ্ঠ ও বিডিডাইজেস্ট ১২ এপ্রিল দাবি করে যে, হাসিনা সরকারকে সরাতে ৩২ কোটি ডলার খরচ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তথাকথিত ‘মার্কিন সংবাদমাধ্যম’ সিএসবি নিউজ ইউএসএ–কে তথ্যসূত্র হিসেবে দেখানো হয়।
একই খবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট অসংখ্য অ্যাকাউন্ট থেকেও শেয়ার করা হয়েছে।
দ্য ডিসেন্ট-এর যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রচারিত খবরে তথ্যসূত্র হিসেবে যে ‘মার্কিন গণমাধ্যম’ সিএসবি নিউজ ইউএসএ-এর কথা বলা হয়েছে, সেটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম নয়। বরং পেজটি আংশিকভাবে বাংলাদেশ থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও, হাসিনার সরকার পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ৩২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করার দাবিটিরও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
যাচাইয়ে “সিএসবি নিউজ ইউএসএ” (https://csbnews.us) নামের একটি ওয়েবসাইটে গত ১০ এপ্রিল প্রকাশিত “The Paper Trail: How Washington Spent Over $325 Million Dismantling Bangladesh's Elected Government” শিরোনামের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।
এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটন ৩২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। লেখাটিতে বিভিন্ন মার্কিন ও ব্রিটিশ অনুদান, প্রকল্প ও চুক্তিকে এই দাবির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে সরকারি ও প্রাথমিক উৎস যাচাই করে দেখা যায়, লেখাটিতে উল্লেখ করা বেশ কিছু অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তব হলেও সেগুলো থেকে সরাসরি “সরকার পতন ঘটানো হয়েছে”—এমন দাবি প্রমাণিত হয় না।
উদাহরণ হিসেবে Strengthening Political Landscape (SPL) নামের প্রকল্পটি USAID ও DFID-এর অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অফিসিয়াল বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, দল ও জনগণের মধ্যে সংযোগ উন্নত করা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো।
একই অর্থায়ন সংক্রান্ত দাবি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বরাতে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট পেজগুলো থেকে প্রচার করা হয়। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ২৯ মিলিয়ন ডলার খরচ করে সরকার বিরোধী আন্দোলন উসকে দিয়েছে ।
ডিসমিসল্যাব সে সময়ে দাবিটি যাচাই করেছিল। ২৯ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প একা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না, ছিল ব্রিটিশ সরকারও। এসপিএল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাদের প্রকল্প ও কর্মী আছে।
বাস্তবে এই অর্থ ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংস্থা ব্যয় করেছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের তরুণ নেতাদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
একইভাবে যুক্তরাজ্যের SPP2 কর্মসূচিও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সংলাপ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে।
এছাড়া Amar Vote Amar (AVA) প্রকল্প বা BRAC-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে পরিচালিত Bangladesh America Maitree Activity (BAMA)—এসব প্রকল্পের অর্থায়নের তথ্যও বিভিন্ন অফিসিয়াল রেকর্ডে পাওয়া যায়। তবে এসব প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ভোটার শিক্ষা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি—সরকার পরিবর্তন ঘটানো নয়।
অর্থাৎ, “সিএসবি নিউজ ইউএসএ”-এর প্রতিবেদনে এসব অংশীদারিত্বমূলক কর্মকাণ্ড বা অর্থায়নকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই হাসিনা সরকারের পতনের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যভাবে বললে, “অর্থায়ন হয়েছে” এই তথ্যকে ব্যবহার করে “তাই সরকার পতন ঘটানো হয়েছে” এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে, যার পক্ষে সরাসরি কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি।
এছাড়াও প্রতিবেদনে ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের সূত্র হিসেবে Jihan Jennifer Hassan নামের একজন ব্যক্তির একটি ‘গবেষণা’ উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে এমন কোনো বিশ্বস্ত গবেষণার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তা রয়েছে এবং তার একটি অংশ গণতন্ত্র, সুশাসন ও নাগরিক অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমে ব্যয় হয়। কিন্তু এই তথ্যগুলো থেকে সরাসরি “রেজিম চেঞ্জ” বা সরকার পতনের পরিকল্পিত অপারেশন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
‘সিএসবি নিউজ ইউএসএ’ চালাচ্ছে কারা?
সিএসবি নিউজ ইউএসএ’র ফেসবুক পেজের Transparency সেকশন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, পেজটি ২০২২ সালের ১২ আগস্ট খোলা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর পেজটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় CSB News USA বাংলা। এরপর ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল আবারও পেজটির নাম পরিবর্তন করা হয়।

বর্তমানে পেজটি ১৮ জন অ্যাডমিন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। নামে ইউএসএ থাকলেও পেজটির ১৬ জন এডমিনের লোকেশন দেখাচ্ছে বাংলাদেশ এবং ২ জনের অস্ট্রেলিয়া। এছাড়াও পেজটির সাম্প্রতিক প্রায় সব পোস্টই বাংলা ভাষায়।
আলোচ্য প্রতিবেদনটির লেখক হিসেবে Abu Obidha Arin নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে:
“Abu Obaidha Arin is a Bangladeshi thinker and writer focused on politics, governance, and the societal impact of digital systems.”
ফেসবুকে সার্চ করে এই নামে একটি অ্যাকাউন্ট খুঁজে পাওয়া যায়। ওই অ্যাকাউন্টের বায়োতে লেখা আছে:
“A loyal torchbearer of Bangabandhu’s legacy and a committed Awami League activist. Soldier of Hasina.”
Abu Obidha Arin তার ফেসবুক পেজেও এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করেছেন।
এছাড়াও অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সেখানে আলোচিত প্রতিবেদনটি শেয়ারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট একাধিক পোস্ট রয়েছে। এসব পোস্টে তিনি নিজেকে একজন আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফেসবুকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং University of Delhi-তে পড়াশোনা করছেন।
সিএসবি নিউজ ইউএসএ ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাইটটিতে বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির প্রচারণা, এবং ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদপ্রার্থী শামিম হোসেনের প্রচারণা সম্পর্কিত খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
লেখক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
সিএসবি নিউজ ইউএসএ সাইটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক লেখাগুলোর লেখকদের বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে Erik Cipher নামের একজনকে সাইটটিতে সিএসবি নিউজ ইউএসএর আমেরিকা প্রতিনিধি এবং “দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক” বলা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে এই নামে কোনো সাংবাদিকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া Erik Cipher-এর পরিচিতিতে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও আসল নয়। আইস্টক থেকে সার্বিয়ার একজন নারীর ছবি ব্যবহার করে সেটিকে Erik Cipher নামে উপস্থাপন করা হয়েছে।
Abhishek Bhattacharya-কে ভারতভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়ান প্রতিনিধি বলা হলেও তার বিস্তারিত পরিচয় গুগল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া বাকি লেখকদের মধ্যে Saifur Rahman, Rayhan Ahmed Tamim, Ikhtiar Hossain, M Rayhan Kabir, Mizanur Rahman, Golam Moula, Salahin Kadir এবং Abu Obaidha Arin—সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।
দ্য ডিসেন্ট এদের মধ্যে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “তিনি জানেন না সিএসবি নিউজ ইউএসএ কারা চালায়।”
এছাড়া এটিএন নিউজের ইংরেজি সংবাদ উপস্থাপক Salahin Kadir ফেসবুকে নিজেকে সিএসবি নিউজ ইউএসএ’র বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ হিসেবে দাবি করেছেন।