সমুদ্র সৈকতে নারী ও শিশুদের গোসলের দৃশ্য গোপনে ধারণ করে ফেসবুকে প্রচার
কক্সবাজারের একটি চক্র মাসের পর মাস ধরে সমুদ্রে স্নানরত নারী ও শিশুদের ভিডিও করে গোপনে সেগুলো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছে।
দ্য ডিসেন্ট-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবে অন্তত ১৩টি প্ল্যাটফর্ম চিহ্নিত করা হয়েছে, যেসব জায়গায় ওই ভিডিওগুলো কয়েক কোটি বার ভিউ হয়েছে।
কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা শাখার দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং সক্রিয় সাইবার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন নারীদের বিরুদ্ধে ঘটে চলা এ সহিংসতার ব্যাপকতা সম্পর্কে পুলিশ তেমন কিছুই জানে না বলে মনে হয়েছে।
কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে তারা তেমন গুরুত্ব দেননি, বরং এই প্রতিবেদককেই অপরাধীদের খুঁজে বের করে দিতে বলেছেন। এ পর্যন্ত এই ধরনের ভিডিও ধারণের পর টিকটকে ছড়ানোর অভিযোগে কক্সবাজার পর্যটন পুলিশ কেবল একজনকে গ্রেফতার করেছে।
“বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া আইডি থেকে এসব ভিডিও আপলোড করা হয়। ফলে আসল ব্যক্তিকে শনাক্ত করা কঠিন,” দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন কক্সবাজার পর্যটন পুলিশের পুলিশ সুপার মো: আপেল মাহমুদ।
“আপনারা যদি অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পারেন, আমাদের পক্ষে তাদের গ্রেফতার করা সহজ হবে,” তিনি যোগ করেন।
বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (TOAB)–এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেন।
নারীদের ভ্রমণ-উদ্যোগ পরিচালনাকারী চিকিৎসক সাকিয়া হক গোপনের ভিডিও ধারণের পর সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের এসব তথ্য জেনে আঁৎকে ওঠেন।
“আমার ভিডিও তো বের হয়ে যেতে পারে,” আতঙ্কিত কণ্ঠে দ্য ডিসেন্টকে বলেন সাকিয়া।
“এভাবে চলতে থাকলে পর্যটকরা আর ওখানে যাবে না। আমরা শিগগিরই নারীদের জন্য কক্সবাজারে একটি গ্রুপ ট্যুর আয়োজনের কথা ভাবছিলাম, কিন্তু এখন আমি সেটা নিয়ে চিন্তিত।”
অপরাধী কারা
দ্য ডিসেন্ট যে ১৩টি প্ল্যাটফর্ম চিহ্নিত করেছে সেগুলো মূলত নারীদের গোপনে ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে ব্যবসা করছে। চার বছরের শিশুদেরও তাদের থেকে রক্ষা পায়নি।
ভুক্তভোগীদের পরিচয় রক্ষার্থে দ্য ডিসেন্ট পেইজগুলোর নাম প্রকাশ করছে না, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হবে।
৪৭ হাজার ফলোয়ারের একটি ফেসবুক পেইজ থেকে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, সৈকতে নেমে একটি পরিবারের নারী সদস্যরা আনন্দঘন স্নান করছেন। ভিডিও শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যামেরা সরাসরি পরিবারের বড় মেয়েটির শরীরের ওপর জুম করা হয়। ভিডিওতে মেয়েটি দেখতে কিশোর বয়সের মনে হচ্ছিলেন।
২০২৫ সালের ১ জুলাই প্রকাশিত ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওটি সেপ্টেম্বর ১১ পর্যন্ত ১৫ লাখ ভিউ, ২১ হাজার রিঅ্যাকশন, ১৯৮ শেয়ার ও ১৪৮ কমেন্ট পেয়েছে।
একই পেইজটি জুলাই ৭ ও ১১ তারিখে ওই একই মেয়ের আরও দুটি ভিডিও পোস্ট করে, যেগুলোও তার শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গের ওপর ক্যামেরা ফোকাস করে তোলা। এর মধ্যে জুলাই ১১ এর ভিডিওটি সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ভিউ, ৩৪,৮০০ রিঅ্যাকশন, ৪২৪ শেয়ার ও ৬৪১ কমেন্ট পায়।
আগস্ট ৩১ তারিখে একটি ১৫ সেকেন্ডের রিল পোস্ট করা হয়, যেখানে চার বছরের এক শিশুকে মায়ের হাত ধরে হাঁটতে দেখা যায়। ক্যামেরা প্রথমে মায়ের সংবেদনশীল অংশে ফোকাস করে, পরে শিশুর শরীরে ওপর ক্যামেরা ঘুরে যায়।
১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই পেইজে মোট ২১৩টি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে; এর মধ্যে ১৯৬টি রিল ও ১৭টি সাধারণ ভিডিও। এসব ভিডিওর ১৮২টি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ধারণকৃত বলে ক্যাপশন অথবা হ্যাশট্যাগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় সব ভিডিওতেই নারীদের ব্যক্তিগত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ফোকাস করা হয়েছে, অনেকগুলোতে শিশুদেরও দেখা গেছে।
পেইজটির “About” সেকশনে থাকা ইমেইল ঠিকানায় দ্য ডিসেন্ট যোগাযোগ করলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। একই ইমেইল ব্যবহার করে ‘T’ দিয়ে শুরু হওয়া নামের এক নারীর নামে একটি ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট খোলা হয়। ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই একাউন্টের ৫২,৬০০ ফলোয়ার ছিল এবং অন্তত ২৬০টি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে।
অন্যদিকে ৪ লাখ ৫ হাজার সাবস্ক্রাইবার বিশিষ্ট একটি ইউটিউব চ্যানেলও সংশ্লিষ্ট ভিডিওগুলো প্রকাশ করেছে। ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই চ্যানেলের ভিউ ছিল ৫৮১,৫৯০,৩৪৭, এবং কনটেন্টগুলো মনিটাইজ করা।
এসব ভিডিওর নিচে অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ নারীদের হেয় করেছেন, কেউবা আবার এমন ভিডিও পোস্টকারীদের সমালোচনা করেছেন।
শফিকুর রহমান নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী এক কিশোরীকে “একেবারে রসালো জিলাপি” বলে মন্তব্য করেন।
অন্যজন, হাফিজুর রহমান লেখেন: “বোন টেংরি দেখে বুঝা যাচ্ছে পুকুর কত গভীর”।
হানিফ মিয়া লিখেছেন: “মুসলমান না হিন্দু? তোমার কাপড়ের এই অবস্থা কেন?”
আরেকজন, জয়নুল হাসান কিশোরীকে “স্লিম আইটেম” বলে উল্লেখ করেন।
কেউ কেউ অবশ্য এসব ভিডিওর সমালোচনাও করেছেন কমেন্টে। তেমন একজন আরজে সিয়াম লিখেছেন: “মেয়েটির জীবন নষ্ট করে দিচ্ছেন কেন অনলাইনে ভিডিও পোস্ট করে? আমরা মানুষ হয়েও মানবিক হতে পারি না?”

মো. মহিন উদ্দিন মন্তব্য করেন: “অনেক পরিবার সন্তানদের নিয়ে কক্সবাজারে যায়, কিন্তু এ ধরনের ভিডিওর কারণে তারা সমুদ্রে নামে না।”
আইএইচ রানা লেখেন: “এগুলো কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে না? এটা স্পষ্ট অপরাধ। আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
আগেও অভিযোগ উঠেছে, তবু কার্যকর ব্যবস্থা নেই
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোপনে স্নানরত নারীদের ভিডিও করার অভিযোগে কেবল একজনকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত মো. ইউনুস মিয়া (৩৩) গত বছরের ২৫ আগস্ট নারী পর্যটকদের ভিডিও করার অভিযোগে ধরা পড়েন।
কিন্তু তিনি নিজে একাই এসব ভিডিও ধারণ করতেন নাকি কোন বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন—সেটা পরিষ্কার নয়। স্থানীয় পুলিশ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।
নারী সাংবাদিক, কবি ও লেখকদের সংগঠন ‘আওয়াজ’-এর সভাপতি ইরিন আক্তার বলেন, সৈকতে সক্রিয় গ্রুপগুলো গোপনে ভিডিও ধারণ করছে, এতে নারী ও শিশুরা ঝুঁকিতে পড়ছেন।
“নারীরা অনেক সময় জানেনই না যে তাদের ভিডিও অনলাইনে আপলোড হয়েছে,” তিনি বলেন।
এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ‘আওয়াজ’ গত ১০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে সাত দফা প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
“আমরা দাবি জানিয়েছি সৈকতে আরও নারী পুলিশ মোতায়েন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে,” যোগ করেন ইরিন।
পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবুও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা
TOAB-এর হিসাবে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি মানুষ কক্সবাজারে ভ্রমণ করে, তাদের বেশিরভাগই পরিবার নিয়ে।
“পর্যটকদের ব্যক্তিগত স্নানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিন্দনীয়। কোনো সুস্থ মানুষ এটা মেনে নিতে পারে না,” বলেন TOAB-এর সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া।
“এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া খুবই জরুরি, নইলে মানুষ কক্সবাজার যাওয়া বন্ধ করে দেবে,” তিনি যোগ করেন।
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) অনলাইনে হয়রানি ও সাইবার অপরাধ পর্যবেক্ষণ করে।
যোগাযোগ করা হলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান বলেন, কেউ অভিযোগ না করলে তারা ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
“এখন পর্যন্ত আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। হ্যাঁ, আমরা বিষয়টি লক্ষ্য করেছি, তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না আসা পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে পারব না,” তিনি জানান।