সেলেব্রিটিদের ভিডিও এডিট করে ফেসবুকে বিনিয়োগ প্রতারণার ফাঁদ
ফেসবুকে বিভিন্ন সেলেব্রিটিদের অন্য প্রসঙ্গে বানানো ভিডিওকে এডিট করে বিভিন্ন স্ক্যাম ওয়েবসাইটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এসব ভিডিওতে বলা হচ্ছে, উক্ত ওয়েবসাইটগুলোতে একাউন্ট করে টাকা বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী শুধু বিজ্ঞাপন দেখে দেখে দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা যাবে। এসব এডিটেড ভিডিওকে সত্য মনে করে অনেকেই এসব ওয়েবসাইটে একাউন্ট খুলে টাকা ডিপোজিট করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
ফেসবুকে robiseba.com নামক একটি ওয়েবসাইটের একটি প্রচারণামূলক ভিডিওর সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করে দ্য ডিসেন্ট। ভিডিওটির ক্যাপশন থেকে সংশ্লিষ্ট কী-ওয়ার্ড সার্চ করলে একই ধরনের আরো অনেকগুলো ওয়েবসাইটের প্রচারণামূলক ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।
সেই ভিডিওগুলো থেকে এ ধরণের প্রতারণামূলক মোট ১২টি ওয়েবসাইটের সন্ধান পায় দ্য ডিসেন্ট। ওয়েবসাইটগুলো হলো- Robiseba.com, ovi777.com , www.seba9.com , finfare9.com, ctyloen.com, easycash9.com, citylone11.com, bdlon99.com, bkash0.com, www.gpt79.com, www.robi77.com এবং www.itbd7.com ।
অনলাইন সেলেব্রিটিদের এডিটেড ভিডিও দিয়ে প্রচারণা
বিভিন্ন সেলিব্রিটি, ধর্মীয় বক্তা ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের অন্য প্রসঙ্গে দেওয়া ভিডিও বক্তব্য কাটছাঁট করে ফেসবুকে এসব ওয়েবসাইটের প্রচারণামূলক ভিডিওতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে যাদের প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা কম তারা এসব এডিটেড ভিডিওকে সত্য মনে করে এসব ওয়েবসাইটে একাউন্ট খুলে টাকা জমা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন।
যেমন, সংগীতশিল্পী তাসরিফ খানকে এমন একটি ভিডিওতে বলতে দেখা যাচ্ছে, “ক্যারিয়ার নিয়ে বা উপার্জন নিয়ে কি আপনার আসলে কোনো ইচ্ছা আছে? যদি না থাকে তাহলে ভিডিওটা আপনার জন্য না। আপনি চাইলে ভিডিওটা স্কিপ করতে পারেন। বাংলাদেশে বেকারত্বের যে মহাসমস্যা এটা সমাধান করার উদ্দেশ্যে আর্ন করার দরকার । যে কারণে আমাদেরকে পরিশ্রম করতে হবে সময় দিতে হবে। ভিডিওটি আপনি স্কিপ করেননি তার মানে ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার বেশ একটা আগ্রহ আছে। আর্ন সম্পর্কে ভিডিওটা দেখে খুব ভালো একটা ধারণা নিতে পারবেন। আপনার ক্যারিয়ারের জন্য আপনার ইম্পর্টেন্ট। এছাড়াও মোস্ট ইম্পর্টেন্টলি ভিডিওটা দেখে খুব ভালো একটা ধারণা নিতে পারবেন। এখন আপনি জানেন আপনার আসলে কী করতে হবে। সো ডু ইট।”
এরপর সেখানে Robiseba.com নামক একটি ওয়েবসাইটের ব্যাপারে বলা হয়, যেটিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ডিপোজিট করে বিজ্ঞাপন দেখার মাধ্যমে প্রতিদিন টাকা ইনকাম করা যাবে বলে দাবি করা হয়।
কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, তাশরিফ খানের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রমোশনাল ভিডিও থেকে কিছু অংশ কেটে নতুনভাবে জুড়ে দিয়ে রবিসেবা নামের এই ওয়েবসাইটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তাসরিফ খান এই ভিডিওতে মূলত ‘SR Dream It’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ১ টাকায় ফ্রিল্যান্সিং কোর্স এবং ফ্রী সেমিনারে অংশ গ্রহণ নিয়ে এই ভিডিওটি তৈরি করেছিলেন। ২ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের ভিডিওটির প্রথম ৮ সেকেন্ড, ২২ থেকে ৩০ সেকেন্ড, ৪৩ সেকেন্ড থেকে ৪৬ সেকেন্ড, ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড থেকে ৪৭ সেকেন্ড, ২ মিনিট ৩ সেকেন্ড থেকে ৭ সেকেন্ড এবং ২ মিনিট ৩৪ থেকে ৩৭ সেকেন্ড কেটে নিয়ে একসাথে বসিয়ে দিয়ে রবিসেবা নামক ওয়েবসাইটটির প্রচারণামূলক ভিডিওটি বানানো হয়েছে।
একইভাবে ধর্মীয় বক্তা এবং অনলাইনে জনপ্রিয় আবরারুল হক আসিফকে আরেকটি ভিডিওতে বলতে দেখা যাচ্ছে, “এই স্মার্টফোন দিয়ে বাসায় বসে লক্ষ লক্ষ টাকা ইনকাম করা সম্ভব। আপনি যখন এই ভিডিওগুলো দেখবেন ইউ উইল বি মোটিভেইটেড। ইউ উইল ডেফিনিটলি বি মোটিভেইটেড ইনশাআল্লাহ। চেষ্টা করেছি যুবকদের জন্য কিছু বলার। আপনারা এই পজিটিভ মেসেজগুলো সবার কাছে ছড়িয়ে দিবেন, শেয়ার করে দিবেন। হতে পারে আপনার একটি শেয়ারে কারো লাইফ চেইঞ্জ হতে পারে। ”
এরপর সেখানে www.gpt79.com নামে একটি ওয়েবসাইট একাউন্ট খোলার জন্য বলা হয়। মূলত আবরারুল হক আসিফের একাধিক ভিন্ন বিষয়ের বক্তব্যের ভিডিওকে প্রেক্ষাপটহীন এই প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ওয়াজে বেকারত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মার্টফোন দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ইনকাম করা সম্ভব বলেছিলেন। এছাড়াও আরজে নিরবের সাথে আরেকটি সাক্ষাতকার থেকে ভিডিওর অংশ কেটে নিয়ে উক্ত প্রচারণামূলক ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়াও টেক রিভিউ কনটেন্ট ক্রিয়েটর স্যামজোনকে একটি ভিডিওতে বলতে দেখা যাচ্ছে, “একটা মোবাইল অ্যাপস দিয়ে একদম কোনো কাজ না করেই আপনি টাকা আর্ন করতে পারেন। হ্যাঁ একদম জেনুইনলি আপনার ফোনে টাকা চলে আসবে। একদম আপনার একাউন্টে টাকা চলে আসবে। আপনি বিশ্বাস করেন, আপনাকে টাকা দিবে। আমারই এক ছোটভাই এভাবে টাকা পেয়েছে। দেখুন এই মুহুর্তে অনেক অ্যাপস রয়েছে, অনেক এড আসবে আপনার সামনে সেগুলো ব্যবহার করে বা টুকটাক কাজবাজ করে টাকা পয়সা ইনকাম করতে পারবেন। বাস্তবিক অর্থে আমি এখন পর্যন্ত দেখি নাই ওভাবে টাকা ইনকাম করে ফেলছে ফোন দিয়ে। বাট আমি যে অ্যাপসটার কথা বলছি এটা দিয়ে আপনি টাকা পয়সা ইনকাম করতে পারবেন।” এরপর সেখানে ovi777.com নামে একটি ওয়েবসাইটের কথা বলা হয়।
কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি এডিটেড ও বিভ্রান্তিকর। ২০২৩ সালের ৮ মে প্রকাশিত অনলাইন স্ক্যাম নিয়ে বানানো সতর্কতামূলক একটি ভিডিও-এর প্রথম ৮ সেকেন্ড এবং ২ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড থেকে ৩ মিনিট ১৩ সেকেন্ড পর্যন্ত অংশগুলো কেটে নিয়ে একটি ভিডিওতে জুড়ে দিয়ে উক্ত ওয়েবসাইটের প্রচারণামূলক ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
কী হয় এসব ওয়েবসাইটে
এসব ওয়েবসাইটগুলোতে কী হয় সেটা জানতে তাসরিফ খানের এডিটেড বক্তব্য সম্বলিত ভিডিওটিতে উল্লিখিত http://Robiseba.com নামক ওয়েবসাইটটিতে নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এরপর সেখানে একটি প্রোফাইল তৈরি হয়। এছাড়াও বোনাস হিসেবে প্রোফাইলে সাথে সাথে ১০০ টাকা ব্যালান্স দেখানো হয়। যখন এই ১০০টাকা তোলার চেষ্টা করা হয় তখন বলা হয় সর্বনিন্ম ৫০০ টাকা হলে তারপর টাকা তোলা যাবে। এরআগে নয়। সেজন্য একাউন্টে প্রথমে টাকা ডিপোজিট করতে বলা হয়।
ওয়েবসাইটটিতে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ডিপোজিট প্যাকেজ দেখা যায়। প্রতিটি প্যাকেজের মেয়াদ ৬০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫০০ টাকার প্যাকেজে প্রতিদিন ৩টি বিজ্ঞাপন দেখার মাধ্যমে ৩০০ টাকা আয় করা যাবে বলে দাবি করা হয়েছে। ১,০০০ টাকার প্যাকেজে প্রতিদিন ৬টি বিজ্ঞাপন দেখে ৬০০ টাকা, ১,৫০০ টাকার প্যাকেজে ৯টি বিজ্ঞাপন দেখে ৯০০ টাকা, এবং ২,০০০ টাকার প্যাকেজে ১২টি বিজ্ঞাপন দেখে ১,২০০ টাকা আয়ের দাবি করা হয়েছে।

্রবিসেবা নামক ওয়েবসাইটের একটি প্যাকেজ
একইভাবে, ৩,০০০ টাকার প্যাকেজে ১৮টি বিজ্ঞাপন দেখে ১,৮০০ টাকা, ৪,০০০ টাকায় ২৪টি বিজ্ঞাপন দেখে ২,৪০০ টাকা, ৫,০০০ টাকায় ৩০টি বিজ্ঞাপন দেখে ৩,০০০ টাকা আয়ের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১০,০০০ টাকার প্যাকেজে প্রতিদিন ৬০টি বিজ্ঞাপন দেখে ৬,০০০ টাকা, ১৫,০০০ টাকায় ৯০টি বিজ্ঞাপন দেখে ৯,০০০ টাকা, ২০,০০০ টাকায় ১২০টি বিজ্ঞাপন দেখে ১২,০০০ টাকা, ৩৫,০০০ টাকায় ২০০টি বিজ্ঞাপন দেখে ২০,০০০ টাকা এবং ৫০,০০০ টাকার প্যাকেজে ২৫০টি বিজ্ঞাপন দেখে ২৫,০০০ টাকা আয় করা যাবে বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুয়া ভেরিফাইড এজেন্ট এবং ট্রেড লাইসেন্স
ওয়েবসাইটটিতে “ভেরিফাইড এজেন্ট” শিরোনামে চারটি আইডি কার্ড প্রদর্শন করা হয়েছে, যেগুলোকে “রবিসেবা” নামক প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল এজেন্ট আইডি হিসেবে দাবি করা হয়েছে। প্রতিটি কার্ডে এজেন্টের ছবি, নাম, পদবি , এবং অবস্থান উল্লেখ রয়েছে।
কার্ডগুলোর উপরের অংশে “Official Agent ID” ও “Government Approved” লেখা দেখা যায়। নিচের অংশে একটি বারকোড, কিছু সংখ্যা, এবং “ICT Division” লোগোর মতো চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি আইডির পাশে সবুজ রঙের “Verified” ব্যাজ যুক্ত করা হয়েছে, যা এগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা নির্দেশ করে।
সেখানে মো. মিজানুর রহমান নামে একজনের ছবি দেখা যাচ্ছে। তার পদবী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে “Senior Service Agent” এবং অবস্থান “Dhaka, Bangladesh” লেখা রয়েছে।
কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, পরিচয়টি ভুয়া। ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে তার নাম মেসবাহ মুন্না, মিজানুর রহমান নয়। মূলত উইকিমিডিয়া থেকে মেসবাহ মুন্না নামে একজন লেখকের ছবি নিয়ে রবিসেবা ওয়েবসাইটে বসিয়ে দিয়ে একটি ভুয়া নাম ব্যবহার করে তাকে ওয়েবসাইটটির ভেরিফাইড এজেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উইকিমিডিয়ায় তার প্রোফাইল থেকে নাম সংগ্রহ করে মেসবাহ মুন্না নামের ওই ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করেছে দ্য ডিসেন্ট। মেসবাহ মুন্না বলেন, “উইকিমিডিয়াতে আমার প্রোফাইল ছিল। ওখানে আমি লেখালেখি করতাম। ওখান থেকে ছবিটা নিছে আমি বুঝতে পারছি পরে। আর পাসপোর্ট সাইজ পিক লিখে সার্চ করলে আমার ছবিটা গুগল সার্চে চলে আসতেছে। এই কারণেই তারা হচ্ছে ছবিটা পেয়েছে সম্ভবত।” এছাড়াও এই ওয়েবসাইটের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান তিনি।

ভুয়া ভেরিফাইড এজেন্ট
এছাড়াও জুলহাস উদ্দিন নামে আরেকজন ভেরিফাইড এজেন্টের পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে ওয়েবসাইটে। কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, এই পরিচয়টিও ভুয়া। এখানে যার ছবি দেখা যাচ্ছে তার নাম মো. ওয়াসিম আলী। তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার। মূলত HyperDesign নামে তার একটি ফেসবুক পেইজ থেকে ছবিটি নিয়ে রবিসেবা ওয়েবসাইটের ভেরিফাইড এজেন্ট বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সৈকত আলম নামে আরেকজন ভেরিফাইড এজেন্টের পরিচয় সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, এটিও ভুয়া পরিচয়। ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে তার নাম মোঃ সাজিম উদ্দিন। তিনি যশোরের বাঘারপাড়ার মাদ্রাসাতুল বানাত আল, ইসলামিয়া আলিম ভদ্রডাঙ্গা মাদ্রাসার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের প্রভাষক। মূলত শিক্ষক বাতায়ন থেকে তার ছবিটি সংগ্রহ করে সৈকত আলম বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মোঃ সাজিম উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওয়েবসাইট থেকে আমার ছবি নিয়ে এটা করা হয়েছে। গুগলে পাসপোর্ট সাইজ ছবি লিখে সার্চ দিলে আমার ছবিটা চলে আসে। তারা মনে হয় এখান থেকে ছবিটা নিয়েছে। এছাড়াও রবিসেবা নামে কোনো ওয়েবসাইট বা প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি যুক্ত নন বলে জানান তিনি।
এছাড়া মো. আরমান হাসান নামে আরেকজন ভেরিফাইড এজেন্টের আইডি কার্ড রয়েছে। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে এটি ভারতের আসামের একটি এডুকেশনাল কাউন্সেলিং এবং স্টুডেন্ট সাপোর্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। ছবিটির ফাইল নেইম থেকে ধারণা করা যায়, এটি প্রতিষ্ঠানটির কোনো শিক্ষার্থীর ছবি।

ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স
এছাড়াও ওয়েবসাইটে “বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত একটি ট্রেড লাইসেন্স” দাবি সম্বলিত একটি তথাকথিত লাইসেন্সের ছবি দেখা যাচ্ছে। সেখানে মো. আরিফ হোসেন নামে একজনের ছবি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, এটিও ভুয়া পরিচয়। মূলত পিন্টারেস্ট থেকে সাকলাইন চিমা নামে একটি প্রোফাইল থেকে ছবিটি সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ভুয়া কমেন্ট
ওয়েবসাইটগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস জমানোর জন্য ফেসবুক পেইজের প্রোমোশনাল ভিডিওগুলোর কমেন্টবক্সে করা হচ্ছে টাকা পাওয়ার ভুয়া কমেন্ট। Seba 0nline income Bd নামের পেইজটি থেকে রবিসেবা ওয়েবসাইটটির প্রচারণা করে ভিডিও বানানো হয়েছে। ভিডিওটির কমেন্টবক্সে Mst Setu নামে একটি আইডি থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, “২০,০০০ টাকা দিয়ে প্যাকেজ নিয়েছি।দুই দিনেই রিটার্ন শুরু। রেগুলার ১০,০০০ টাকা ইনকাম। বিশ্বাসযোগ্য।” Mst Keya নামে আরেকটি আইডি থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, “২০ হাজার টাকা ইনভেস্ট করে কাজ করছি। রেজাল্ট দেখে অবাক।দুই দিনেই টাকা উঠেছে। এখন নিয়মিত আয়।” Nodi Akter নামে আরেকটি আইডি থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, “৩০০০ টাকা দিয়ে মেম্বারশিপ নিলাম। প্রতিদিন ১৭০০ টাকা ইনকাম আসছে।সময় কম লাগে। রিটার্ন অনেক ভালো।” Sophia Olivia নামে আরেকটি আইডি থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, “শুরুতে ছোট প্যাকেজে কাজ করতাম।পরে বড় প্যাকেজে আপগ্রেড করেছি। ইনকাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। রেগুলার টাকা পাচ্ছি।” EMAIN নামে একটি আইডি থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, “১০০০ টাকা ইনভেস্ট করেছি এই প্যাকেজে। রেগুলার ৬০০ টাকা করে প্রতিদিন পাচ্ছি। টাকা আসছে ঠিক সময়মতো। উইথড্রো করতেও কোনো সমস্যা হয়নি।”

বিশ্বাস জমানোর জন্য ভিডিওর কমেন্টে করা হচ্ছে টাকা পাওয়ার ভুয়া কমেন্ট
আইডিগুলো ভিজিট করে দেখা গেছে, এগুলোতে কোনো আসল ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়নি যা সাধারণত ফেইক আইডির ক্ষেত্রে দেখা যায়। এছাড়া আইডিগুলোর টাইমলাইনে তেমন কোনো পোস্টও দেখা যায়নি। এছাড়াও এই আইডিগুলো থেকে যে কমেন্টগুলো করা হয়েছে সেগুলো সবগুলো করা হয়ে ১৬ এপ্রিল রাত ৮টা ৫ মিনিটে অর্থাৎ একই সময়ে।
অফিসের ভুয়া ঠিকানা
রবিসেবা ওয়েবসাইটটিতে তাদের হেডকোয়াটার্সের ঠিকানা দেওয়া রয়েছে লেভেল ৫, কর্পোরেট টাওয়ার, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১২০০। কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, ঠিকানাটি ভুয়া। কর্পোরেট টাওয়ার নামে মতিঝিলে কোনো টাওয়ারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ওয়েবসাইটটির কাস্টমার সাপোর্ট সেন্টারের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার হিসেবে ০১৩১৩৫২০৮৯২ এই নাম্বারটি দেওয়া আছে। কিন্তু এই নাম্বারে কল এবং মেসেজ দিয়ে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

রবিসেবা ওয়েবসাইটের অফিসের ভুয়া ঠিকানা
টাকা নেওয়া হচ্ছে বিকাশ, নগদ ও রকেটে
রবিসেবা ওয়েবসাইটে টাকা জমা নেওয়া হচ্ছে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে। যেসব নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হচ্ছে সেগুলো হলো—বিকাশ: ০১৮৩৩৫২৬৭৯৯, নগদ: ০১৬০৭৩৭০২৬৬ এবং রকেট: ০১৩৫২০১২০৮৭।
প্রতারিত হয়েছেন অনেকেই
আবু তাহের একটি সিকিউরিটির জব করেন। জবের পাশাপাশি কিছু এক্সট্রা ইনকামের আশায় তিনি ৫০০টাকা ডিপোজিট করেন রবিসেবা নামক ওই ওয়েবসাইটে। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ভিডিওটি দেখে আমি গত ২১ এপ্রিল ওই ওয়েবসাইটে একাউন্ট খুলি। ওই ওয়েবসাইটে যেহেতু রবি লেখা ছিলো আমি ভেবেছি রবি কোম্পানির কোনোকিছু হবে হয়তো। একাউন্ট খোলার পর আমি ৫০০ টাকা ডিপোজিট করেছি কিন্তু টাকাটা এখনো আমার একাউন্টে জমা হয়নি। পেন্ডিং দেখাচ্ছে। পরবর্তীতে আমি তাদের সাপোর্ট ইমেইল এবং হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু যোগাযোগ করতে পারিনি।”
একই ঘটনা ঘটেছে আয়েশা আক্তার মোহনা নামে এক নারীর সাথেও। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ওনারা যেভাবে বলেছে, আমি ঠিক সেভাবেই অ্যাকাউন্ট খুলে ৫০০ টাকা ডিপোজিট করেছি। কিন্তু ডিপোজিট করার পর থেকেই “পেন্ডিং” দেখাচ্ছে, এখনো টাকাটা অ্যাড হয়নি। ওনারা আমাকে কিছু বলেনি, আমি ভিডিও দেখে বাস্তব মনে হয়েছে বলেই বিশ্বাস করেছি। এরপর ভিডিওতে যেভাবে অ্যাকাউন্ট খুলতে ও টাকা জমা দিতে বলা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই করেছি। প্রথমে পেন্ডিং লেখা উঠেছিল, ভেবেছিলাম পরে টাকাটা অ্যাড হয়ে যাবে। কিন্তু ৩–৪ দিন হয়ে গেল, এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
তাসরিফ খানের এডিটেড ভিডিওটি দেখে রবিসেবা ওয়েবসাইটটিতে ৫০০ টাকা ডিপোজিট করেছিলেন মহিউদ্দীন রাজু নামে একজন। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমি সেদিন ভিডিওতে যেভাবে বলা হয়েছিল ঠিক সেভাবেই তাদের কাছে টাকা দিয়েছি। কিন্তু তারা সেটাকে পেন্ডিংয়ে রেখে দিয়েছে, কোনো কাজই করেনি। পরে আমি তাদের পেজে গিয়ে মেসেজ করলে একজন আমাকে বলে, এখন আরও ২০০০ টাকা দিতে হবে, তাহলেই নাকি তারা আমার বিষয়টি একটিভ করবে। সেই ২০০০ টাকার বিপরীতে তারা বলছে আমি ৪০০০ বা ৬০০–৮০০ টাকার মতো কিছু পাব। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রথমে তারা একরকম কথা বলেছে, আর টাকা দেওয়ার পর এখন আরেকরকম কথা বলছে। এটা কি প্রতারণা না?”
এছাড়াও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর স্যামজোনের ভিডিও সম্বলিত robi9.com নামে একটি ওয়েবসাইটের প্রোমোশনাল ভিডিও শেয়ার করে মোহাম্মদ রিহান নামে একজন লিখেছেন, “এর কথা শুনে কেউ টাকা ঢুকাবেন না। এখানে কোন টাকাই দেয় না সব মিথ্যা কথা । আপনি সেন্ড মানি করবেন কিন্তু ডিপোজিটে কোন টাকা দিবে না । এগুলো সব বাটপারি। আমার ১০০০ টাকা খেয়ে এখন আমার সাথে উল্টাপাল্টা খারাপ আচরণ করে।”
ওয়েবসাইটগুলোর প্রচারণামূলক ভিডিওতে যাদের ভিডিও এডিট করে বসানো হয়েছে অর্থাৎ তাসরিফ খান, আবরারুল হক আসিফ এবং স্যামজোনের সাথে যোগাযোগের চেষ্ট করেছে দ্য ডিসেন্ট। তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া যোগাযোগের নাম্বারে কল দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ইমেইল করে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
তাসরিফ খানের পক্ষ থেকে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আবরারুল হক আসিফকে ইমেইলের জবাবে তিনি জানান, এরকম কোনো বিজ্ঞাপনে তিনি অংশগ্রহণ করেননি।
স্যামজোনের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও প্রচারিত ভিডিওটি নিয়ে তার একটি সতর্কতা মূলক ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর পোস্ট করা এই ভিডিওতে তিনি বলেন, “একটা ভিডিও দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়ই, এই ভিডিওর শুরুতে আমি একটুখানি কথা বলছি যে মোবাইল ফোন দিয়ে টাকাপয়সা ইনকাম করা যায়। আমি এর আগে একটা স্ক্যামার নিয়ে ভিডিও তৈরি করেছিলাম যে তারা এরকম মোবাইল ফোন দিয়ে এরকম লোভনীয় অফার দেয় — এই টাইপের কথা। ওইটা বোঝানোর জন্যই ওটা বলছিলাম। এই স্ক্যামার করেছে কী, ওই অংশটুকু কেটে এনে ওর একটা ভিডিওর শুরুতে বসিয়ে দিয়েছে। এবং এই ভিডিওটা প্রায় তিন মিলিয়নের মতো ভিউ হয়ে গেছে এবং এই ভিডিওতে ইনভেস্ট করার কথা বলা হয়েছে। অনেকেই ইনভেস্ট করে ধরাও খাচ্ছে। তো এটা টোটালি একটা স্ক্যামার। আমরা অলরেডি থানায় জিডি করে এসেছি।”