পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইটে ভুয়া লেখকের নিবন্ধ নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

১৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দৈনিক মানবজমিন একটি প্রতিবেদন ছাপে—“একটি পাকিস্তানি সংবাদপত্র ‘পূর্ব পাকিস্তানকে’ ফিরে পাওয়ার খোয়াব দেখছে।” 

মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, "একটি পাকিস্তানি সংবাদপত্র দ্য ক্যাচলাইন ‘পূর্ব পাকিস্তানকে’ ফিরে পাওয়ার খোয়াব দেখছে। পত্রিকাটি বলছে, ৫৪ বছর পর হিসাব নিকাশের সময় এসেছে। ‘পূর্ব পাকিস্তান’কে ফিরে আসতে হবে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য ক্যাচলাইন এক নিবন্ধে এই অভিমত তুলে ধরেছে। সিনিয়র সাংবাদিক তাবাসসুম মোয়াজ্জাম খানের নিবন্ধটি দ্য ক্যাচলাইনে প্রকাশিত হয়।”

নিবন্ধটিতে আপাতত দৃষ্টিতে, পাকিস্তানপন্থী বয়ান উঠে এসেছে। মূলত ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন করে কিভাবে পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি করা যায় সেই স্বপ্ন দেখিয়েছেন লেখিকা। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আজমের বড় ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমীকে একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার হাত ধরে পাকিস্তানের প্রভাব বাংলাদেশে কিভাবে তৈরি করা যাবে- এমন আলোচনা করা হয়েছে।

মানবজমিন লেখাটি প্রকাশের পর দ্রুত সেটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন ফেসবুক একাউন্ট ও পেইজ থেকে লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে।

তার কয়েকদিন পর ২৪ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী দ্য ক্যাচলাইনে প্রকাশিত লেখাটিকে নিন্দা জানান। তিনি এটিকে “পাগলের প্রলাপের” এবং লেখক তাবাসসুম মোয়াজ্জেম খানকে ‘ভারতের পাকিস্তানি নারী এজেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।

আরও পরে গত  ৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজকের পত্রিকা সেই মতামত নিবন্ধ এর বক্তব্যের সাথে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকা সফরকে মিলিয়ে একটি উপসম্পাদকীয় ছাপে—শিরোনাম: “বাংলাদেশ কি প্রতিবাদ জানাবে না।”

এটির লেখক আবু তাহের খান দ্য ক্যাচলাইন এর নিবন্ধের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তান থেকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মতামত প্রকাশের পরও বাংলাদেশ সরকার কি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে না?

দ্য ক্যাচলাইন এর নিবন্ধের ওপর ভিত্তি করে ২০ আগস্ট একটি বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও পোস্ট করেন নবনীতা চৌধুরী তার ইউটিউব চ্যানেলে যার শিরোনাম ছিল, “সেনাপ্রধান হচ্ছেন গোলাম আজমের ছেলে?"। তাতে নবনীতা বলেন, "ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত শহীদ রেজা আলভী কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকা দ্য ক্যাচলাইনে এমন একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে..”।

অর্থাৎ, দ্য ক্যাচলাইন এর নিবন্ধটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে বেশ ভালই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এবং সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ বিশ্লেষকরা এই ওয়েবসাইটটিকে ‘পাকিস্তানের শীর্ষ পত্রিকা’ বলেও অভিহিত করছেন।

এবং নিবন্ধের লেখক তাবাসসুম মোয়াজ্জাম খানকে উল্লেখ করা হয়েছে “জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক” বা পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে। যদিও দ্য ক্যাচলাইন এর নিবন্ধের কোথাও লেখকের কোন পরিচয় দেয়া ছিল না। তার দেশ কোনটি, বা পেশা কী এসবের কোন তথ্যও মূল নিবন্ধে দেয়া হয়নি।

দ্য ডিসেন্ট তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে ‘দ্য ক্যচলাইন’ ওয়েবসাইটটি কেমন সংবাদমাধ্যম এবং তাদের লেখক তাবাসসুম মোয়াজ্জাম খান আসলে কে?

মূলত ১৬ আগস্ট ২০২৫ ‘দ্য ক্যাচলাইন’–এ ইংরেজিতে যে মতামত নিবন্ধটি ছাপা হয়, তার শিরোনাম—“East Pakistan Must Return: Pakistan’s Hour of Reckoning After 54 Years।” 

দ্য ক্যাচলাইন কেমন সংবাদমাধ্যম?

প্রথমত, দ্য ক্যাচলাইন (thecatchline.com) ওয়েবসাইটটি নিজেদেরকে ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সংবাদপত্র হিসেবে দাবি করেছে। ওয়েবসাইটটি চালুর সময় বলা আছে জুন ২০২৩। তবে ডোমেইন নিবন্ধনের তথ্যে দেখায়—সাইটটি রেজিস্টার করা হয়েছে ৬ ডিসেম্বর ২০২৩।

অপরদিকে তাদের দুটি আলাদা ফেসবুক পেইজ আছে যেগুলো ২০১৪ এবং ২০২০ সালে চালু করা। এছাড়া একই নামে তাদের একটি সাপ্তাহিক ছাপা পত্রিকাও প্রকাশিত হয়, যেটির কিছু ছবি তাদের দ্বিতীয় ফেসবুক পেইজে বিভিন্ন সময়ে পোস্ট করা হয়েছে।

পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে পাওয়া যায় ফয়সাল আজফার আলভির নাম। ঠিকানা, ইসলামাবাদ। সাইটের সম্পাদকীয় পাতায় আরও দুইটি নাম আছে—প্রধান সম্পাদক তাইয়্যাবা জাবিন ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহাব রাজা আলভি। 

এর বাইরে পত্রিকাটির রিপোর্টিং টিমের তথ্য খুব সীমিত। ওয়েবসাইটে আলাদাভাবে কোনো প্রতিবেদকের তালিকা নেই। ফেসবুক পেইজ ঘেঁটে দেখা যায়, বার্সেলোনা থেকে রাজা সাকিব আলি রাঠোর এবং বাংলাদেশের রংপুর থেকে রুসাইদ আহমেদ—এ দুজনকে "বিশেষ প্রতিনিধি” বলা হয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশের "বিশেষ প্রতিনিধি" এখনো অনার্সে পড়ছেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। লিংকডইন এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন আর এখন কাজ করছেন দ্য ক্যাচলাইনে। সেখানে তার বেশ কিছু লেখাও পাওয়া যায়। 

দ্য ক্যাচলাইন কতটা প্রসিদ্ধ সংবাদমাধ্যম তা বুঝতে আমরা পাকিস্তানের তিন জন সাংবাদিকের মতামতও নেই।  ডয়েচে ভেলের সঙ্গে কাজ করা এক সাংবাদিক জানান, তিনি এই প্ল্যাটফর্মকে মূলধারার কাগজ হিসেবে চেনেন না। টাইমস অব করাচির আরেকজনও বলেন, নামটি তার কাছে নতুন। বার্তা সংস্থা এএফপির করাচি ভিত্তিক একজন সাংবাদিক যিনি ২০ বছর ধরে সাংবাদিকতার সাথে আছেন তিনি বলেন, ‘আমি নামটি তোমার কাছ থেকে এই প্রথম শুনলাম’।

অর্থাৎ, মানবজমিন এবং অন্যান্য জায়গায় এটিকে ‘শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্র’ বলে যে পরিচয় দেয়া হয়েছে তা সঠিক নয়। কারণ, দেশটির মূলধারার সাংবাদিকরা এই সংবাদমাধ্যমের নামও জানেন না!

দ্য ক্যাচলাইনের ডোমেইন নেটওয়ার্ক ঘেঁটে দেখা যায়, পত্রিকাটির সম্পাদক ফয়সাল আজফার আলভির নামে ইংরেজি-উর্দু মিলিয়ে এমন অন্তত ১০টি নিউজ ওয়েবসাইট নিবন্ধন করা আছে। কিছু সাইট বন্ধ হয়ে গেছে, কিছু চালু আছে। 

তার মধ্যে একটি thepublictribune.com, এর সাথে দ্য ক্যাচলাইনের ওয়েবসাইটের নকশা ও কাঠামোয় মিল দেখা যায়। কিন্তু এই ওয়েবসাইটের কোথাও সম্পাদক বা মালিকের নাম নেই।

ফয়সাল আজফার আলভির নিবন্ধিত ওয়েসাইটগুলোর তালিকা

ফয়সাল আজফার আলভির সাথে অনলাইনে পাওয়া তার মোবাইল নম্বর, এক্স একাউন্ট এবং ইমেইল ইত্যাদি মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি সাংবাদিকরা জানান, তিনি এমন কোন পরিচিত ব্যক্তি নন যে তার নম্বর সহজে যোগাড় করা সম্ভব।

সার্বিক পর্যবেক্ষণের পর দ্য ক্যাচলাইন-কে একটি অনির্ভরযোগ্য এবং অপেশাদার ওয়েবসাইট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

তাবাসসুম মোয়াজ্জেম খান কেমন লেখক?

এবার আসা যাক আলোচিত লেখকের বিষয়ে। দ্য ক্যাচলাইন-এর নিবন্ধে কেবলমাত্র লেখকের নাম এবং একটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল, তার কোন পরিচয় দেয়া হয়নি। তখন লেখাটি দ্য ডিসেন্ট আর্কাইভ করে রাখে। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে এবং ‘তাবাসসুম মোয়াজ্জেম খান’ এর নাম বাংলা এবং ইংরেজিতে সার্চ করে তার সম্পর্কে কোন তথ্য, তার পরিচয় বা তার আগের কোন লেখালেখির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কিন্তু মানবজমিন পত্রিকায় তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়ছিল, ‘একজন সিনিয়র সাংবাদিক’ হিসেবে। এদিকে জেনারেল আজমির বিবৃতিতে তাকে ‘পাকিস্তানের সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু তাদের এসব তথ্যের সূত্র কী, সেটি পরিষ্কার নয়।

কথিত বাংলাদেশি গবেষক তাবাসসুম মোয়াজ্জেম খান এর ছবি

কয়েকদিন পর দেখা গেল দ্য ক্যাচলাইন তাদের নিবন্ধের শেষে তাবাসসুম মোয়াজ্জেমের খান এর এক লাইনের পরিচয় যুক্ত করেছে যেখানে তাকে একজন “বাংলাদেশি গবেষক” দাবি করা হয়। কিন্তু এই নামে কোনো বাংলাদেশি গবেষকের অস্তিত্ব (তার প্রোফাইল, গবেষণাকর্ম, লেখালেখি, ছবি, সোশাল মিডিয়া একাউন্ট ইত্যাদি) অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি মূলত ভুয়া লেখকদের বৈশিষ্ট্যের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভুয়া নাম এবং পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক নিবন্ধ লেখার এবং পরিচিত সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রোপাগান্ডামূলক ওয়েবসাইটে সেগুলো প্রকাশ করার নজির রয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি ২০২৩ সালে এক অনুসন্ধানে দেখিয়েছিল কিভাবে বাংলাদেশ, ভারত এবং আরও কয়েকটি দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রোপাগান্ডামূলক ওয়েবসাইটে কয়েকশত নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছিল যেগুলোর লেখক ছিলেন ভুয়া নাম পরিচয় ও ক্রেডেনশিয়াল-ওয়ালা বিশেষজ্ঞরা।

অতি সম্প্রতি ডিসমিসল্যাব এর একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে একইরকম ভুয়া নাম পরিচয় ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্যযুক্ত নিবন্ধ বিদেশি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

দ্য ক্যাচলাইন-এ বাংলাদেশ থেকে কারা লেখেন?

সর্বশেষ দ্য ডিসেন্ট দেখেছে, বাংলাদেশ বিষয়ক আর কী কী লেখা দ্য ক্যাচলাইন-এ প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলোর লেখক কারা।

‘দ্য ক্যাচলাইন’–এ বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট মতামত নিবন্ধ লিখেছেন মূলত ৫ জন। নামগুলো হল, রুসাইদ আহমেদ, তাজুল ইসলাম, এম এ হোসাইন, কাজী মামুনুর রশীদ এবং সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।

কাকতালীয় ব্যাপার হল, রুসাইদ আহমেদ বাদে বাকি চারজন বাংলাদেশের আলোচিত আওয়ামী ও ভারতপন্থী প্রোপগান্ডা ওয়েবসাইট ‘দ্য উইকলি ব্লিটজ’–এরও নিয়মিত মতামত লেখক-সম্পাদক। বিশেষ করে সালাহদ্দিন শোয়েব চৌধুরী ও তাজুল ইসলাম ২০২৩ সালের শুরু থেকে ‘দ্য ক্যাচলাইন’–এও ধারাবাহিকভাবে লিখছেন। 

উল্লেখ্য, সালাহদ্দিন শোয়েব চৌধুরী দ্য উইকলি ব্লিটজের সম্পাদক এবং তাজুল ইসলাম নিজেকে দ্য উইকলি ব্লিটজের বিশেষ প্রতিবেদক বলে পরিচয় দেন। কাজী মামুনুর রশিদ মূলত জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এবং এম এ হোসাইন নিজেকে ভুরাজনীতি বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দেন।

নিচে দ্য ক্যাচলাইন-এ প্রকাশিত সালাউদ্দিন শোয়েব আর তাজুলের কিছু লেখার লিংক দেয়া হল: 

Bangabandhu, Awami League and Sheikh Hasina: Salah Uddin Shoaib Choudhury

French Authorities Silent on Extremist Asylum-Seekers and Cyber-Terror Activities: Tajul Islam

Bangabandhu – the exemplary symbol of inspiration: Tajul islam 


এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, বাংলাদেশকে ‘ফের পূর্ব পাকিস্তান’ বানানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে লেখা নিবন্ধটির প্রকাশকারী ওয়েবসাইটে যারা নিয়মিত বাংলাদেশ বিষয়ক লেখা লিখেন তারা মূলত ভারতপন্থী এবং আওয়ামীপন্থী ডিসইনফরমেশন ছড়ানোর সাথে জড়িত অন্য একটি প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইটের লেখক-সম্পাদক।

(অনুসন্ধানটিতে সহযোগিতা করেছে Activate Rights)