ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম: যেভাবে সংবাদ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করছে মেটা

৬ জানুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরেন গত ২৫ ডিসেম্বর। এর পরের দিন, অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর বিএনপির এই শীর্ষ নেতাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো। এদের মধ্যে দুটি সংবাদমাধ্যম এআই দিয়ে বানানো ছবি ‘প্রকৃত ছবি’ হিসেবে তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ছবিটি ‘এআই দিয়ে তৈরি’- এটা জানিয়ে ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডিসেন্ট। একই বিষয়ে একটি ফটোকার্ডও দ্য ডিসেন্ট এর ফেসবুক পেইজে (fb.com/TheDissent) প্রকাশ করা হয়।

তবে কিছুক্ষণ পরই ফটোকার্ডটি সরিয়ে নেয় ফেসবুক এবং কারণ হিসেবে প্রযুক্তি প্লাটফর্মটি জানায় দ্য ডিসেন্ট মেটার ‘কপিরাইট নীতি’ লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু বাস্তবে দ্য ডিসেন্ট মেটার ‘কপিরাইট নীতি’ লঙ্ঘন করেনি। কারণ, ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিবেদনে কোন ছবির তুলনামূলক চিত্রায়ন ফেসবুকের নীতি লঙ্ঘন করে না। ফেসবুক নিজেই থার্ডপার্টি ফ্যাক্ট চেকারদেরকে নিয়োজিত করে রেখেছে তার প্লাটফর্মে প্রকাশিত এমন ভুয়া খবরগুলো চিহ্নিত করতে। এবং এই ফ্যাক্ট চেকিং প্রক্রিয়ায় অসত্য তথ্যসহ কারো প্রকাশ করা ছবি বা ভিডিওর অংশ বিশেষ ব্যবহার করে তুলনামূলক চিত্রায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্য ডিসেন্ট এর এমন ৭টি ফ্যাক্ট চেক এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবিকে ‘কপিরাইট নীতির লঙ্ঘন’ বলে সরিয়েছে ফেসবুক। প্রথম ৩টি কপিরাইট ক্লেইমের ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকলেও পরে ক্লেইমগুলোর ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন করার কোন অপশন ফেসবুকের নোটিফিকেশনে পাওয়া যায়নি। প্রথম ৩টি আবেদনের প্রেক্ষিতে কোন প্রতিউত্তর দেয়নি ফেসবুক।

ছবি সরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে প্রথম ছবিটির ক্ষেত্রে মেটা জানিয়েছে, দ্য ডিসেন্ট এর প্রকাশিত ছবিটির কপিরাইট নিজেদের দাবি করে রিপোর্ট করেছেন সাদমান জাহিন হামিম নামের একজন ব্যবহারকারী, যার ইমেইল [email protected]। দ্বিতীয় ছবিটি নিজের দাবি করে রিপোর্ট করেছেন তিতাস চাকমা এবং তার ইমেইল [email protected]। এবং তৃতীয় ক্লেইম থেকে পরের গুলোর ক্ষেত্রে কোন আইডি বা ইমেইল থেকে ক্লেইম পাঠানো হয়েছে তা দেখার কোন অপশন ছিল না।

পরপর এতগুলো কপিরাইট ক্লেইমের ফলে দ্য ডিসেন্ট এর ফেসবুক পেইজটি রিমুভ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, এমনটিই নোটিফিকেশনে জানিয়েছে ফেসবুক। পাশাপাশি পেইজটির একাধিক এডমিনের পোস্ট করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি এ ধরণের ঘটনা শুধু দ্য ডিসেন্ট-এর ফেসবুক পেইজেই ঘটেছে এমনটি নয়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ এবং একাধিক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের পেইজের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটছে। গত ১০ দিনে ঘটে যাওয়া এই ধরনের অন্তত ২৫টির বেশি কপিরাইট ক্লেইমের প্রমাণাদি সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট।

ব্যক্তিগত সেলফি ছবিতেও কপিরাইট ক্লেইম!

৪ জানুয়ারি তারিখে দ্য ডিসেন্ট এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশিরের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে (Qadaruddin Shishir; fb.com/qshishir) একটি কপিরাইট ক্লেইমের নোটিফিকেশন আসে। নোটিফিকেশনটির মাধ্যমে জানানো হয় যে, ৩১ ডিসেম্বর তার পোস্ট করা একটি ছবি রিমুভ করা হয়েছে।

কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, “The post may contain something that infringes someone else’s copyright.”

কিন্তু ছবিটি ছিল ৩১ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ৩ মিনিটে ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে শেওড়াপাড়া এলাকায় মেট্রোতে তোলা একটি সেলফি ছবি; যা কদরুদ্দীন শিশির নিজে তার সেল ফোনে উঠিয়েছেন এবং ছবিটির মেটাডাটা রয়েছে। একই স্থানের আরও কয়েকটি ছবি শিশিরের ডিভাইসে রয়েছে।

ফলে, এই ছবির কপিরাইট শিশির ছাড়া অন্য কারো হওয়ার সুযোগ নেই। একইসাথে ওই পোস্টে যে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে সেটিও শিশির ও তার সঙ্গীদের সাথে ঘটা ওইদিনের একটি ঘটনার বর্ণনা; যা শিশির নিজে লিখেছেন। ফলে, টেক্সটের কপিরাইটও অন্য কারো হওয়ার সুযোগ নেই।

দ্য ডিসেন্ট এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশিরে নিজের তোলা সেলফিতে কপিরাইট ক্লেইম করা হয়েছে

দ্য ডিসেন্ট এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশিরে নিজের তোলা সেলফি এবং সেটির ক্যাপশনে কপিরাইট ক্লেইম করা হয়েছে!

কিন্তু এরপরও শিশিরের ছবিযুক্ত পোস্টটি ‘অন্যের কপিরাইট অধিকার থাকতে পারে’ সন্দেহে ফেসবুক রিমুভ করে দিয়েছে। সাথে সাথে রিভিউ আবেদন করা হলেও ২০ ঘণ্টা পর পর্যন্ত কোন জবাব পাওয়া যায়নি সামাজিক মাধ্যম প্লাটফর্মটির কাছ থেকে।

এভাবে একজনের তোলা বা তৈরি করা ছবি বা কন্টেন্ট অন্যজন ‘নিজের’ বলে দাবি করে ‘কপিরাইট স্ট্রাইক’ করলে কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই সেই কন্টেন্ট মূল মালিকের পেইজ বা প্রোফাইল থেকে সরিয়ে দিচ্ছে মেটা।

এই ধরনের ভুয়া কপিরাইট ক্লেইমের শিকার হওয়ার পর বিজনেস পেইজের ক্ষেত্রে মনিটাইজেশন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পেইজ বা প্রোফাইলের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপিত হচ্ছে।

ভুয়া কপিরাইট ক্লেইমের সংঘবদ্ধ আক্রমণ?

গত ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন তরুণ রাজনীতিবিদ ওসমান হাদি যিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতা ছিলেন, তাকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। আহত অবস্থায় তিনি গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে ইন্তেকাল করেন।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ওসমান হাদি কর্তৃক কবিতা আবৃত্তির একটি ভিডিও পোস্ট করা হলে কয়েকদিন পর সেটি সরিয়ে দেয় মেটা।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস টিম দ্য ডিসেন্ট-কে জানিয়েছে, কপিরাইট ক্লেইম দিয়ে পোস্টটি সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর একইভাবে একই পেইজ থেকে প্রধান উপদেষ্টার প্রোফাইল ছবিটিও সরিয়ে দেয়া হয়।

যদিও পরে রিভিউ আপিলের মাধ্যমে সেই পোস্ট দুটি আবার ফিরে আসে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমানের দাবি, বিগত কয়েক মাসে তার অন্তত ১৭টি পোস্টে ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম করা হয়েছে। প্রথম এই ধরনের ক্লেইম আসে গত ১৩ জুন। এবং অতিসম্প্রতি গত ডিসেম্বরের ২২ ও ২৩ তারিখে আরও দুটি ক্লেইম এসেছে। এর মধ্যে ৩টি ক্লেইমের স্ক্রিনশট তিনি দ্য ডিসেন্ট এর সাথে শেয়ার করেছেন।

দ্য ডিসেন্ট এর সাথে শেয়ার করা মোস্তাফিজের একটি পোস্টে কপিরাইট রিপোর্ট করা একটি পেইজের নাম, ‘যমুনা টেলিভিশন’। তবে সংযুক্ত ইমেইলটি ছিল [email protected]; যা যমুনা টেলিভিশনের অফিসিয়াল ইমেইল নয়।

অর্থাৎ যমুনা টেলিভিশনের নামে পরিচালিত ভুয়া কোন পেইজ থেকে এই কপিরাইট স্ট্রাইক দেওয়া হয়। আর বাকি দুটি স্ট্রাইক দেওয়া হয় “ফ্রান্স ২৪” এবং “শেখ হাসিনা অফিশিয়াল” নামের দুটি ফেসবুক পেইজ থেকে।

প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক আব্দুর রব ভুট্টোও নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করে দাবি করেন, কপিরাইট ইস্যুতে রিপোর্ট করে তার ফেসবুক পোস্ট সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

ফেসবুকে সম্প্রতি আরও অনেকে একই রকম দাবি করে পোস্ট করেছেন যে, তারা ভুয়া কপি রাইট ক্লেইমের ভুক্তভোগী হচ্ছেন।

যেমন, “Hey Bro Club” নামের ফেসবুক পেইজ থেকে পোস্ট করে বলা হচ্ছে, “গত ২/৩ দিন ধরে হাদী ভাইকে (ওসমান হাদি) নিয়ে পোস্ট শেয়ার করায় কিছু গ্রুপ ফেইক কপিরাইট দিয়ে আমার ভিডিওগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ৬/৭ টা ভিডিও টেকডাউন করে ফেলসে। হয়তো যেকোন মুহূর্তে আমার পেইজটা suspend হয়ে যেতে পারে। কপিরাইটএর কিছু স্ক্রিনশট কমেন্ট এ দিচ্ছি।”

একইভাবে “আবু সাঈদ, মুগ্ধ। শেষ হয়নি যুদ্ধ” নামের আরেকটি ফেসবুক পেইজ থেকে বলা হয়েছে, “এক্টভিস্টদের উপর আক্রমণ করা হচ্ছে! আইডি ডিজেবল করা হচ্ছে! রিচ কমিয়ে জিরো করা হচ্ছে !অযথা কপিরাইট ক্লেইম দেয়া হচ্ছে !”

এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কাজ করা “দ্য রেড জুলাই নিউজ” পেজের একটি পোস্ট ভুয়া কপিরাইট রিপোর্ট দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ফেসবুকে ভুয়া কপিরাইট স্ট্রাইকের শিকার সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান দ্য ডিসেন্টকে জানান, ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম করে তার অন্তত ১৭টি পোস্ট অপসারণ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় তার এক লাখ ৩০ হাজার ফলোয়ারের একটি ফেসবুক পেইজ ডিজেবল হয়ে যায়।

তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘ দিন সেনাবাহিনীতে গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতায় অনেক তথ্য পেতাম যা শেয়ার করে জনগনকে আপডেট রাখার চেষ্টা করতাম তা ব‍্যাহত হচ্ছে।” এছাড়া ভবিষ্যতেও তিনি ভুয়া কপিরাইট ক্লেইমের শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মোস্তাফিজ।

রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট আরাফাত শৈশব দ্য ডিসেন্টকে জানান, তিনি তার প্রোফাইল থেকে তারেক রহমানের একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন। ছবিটির বিপরীতে কপিরাইট দাবি করে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। অভিযোগকারী হিসেবে সেখানে নাম দেখানো হয় ‘ডা. জুবাইদা রহমান’ নাম। ডা. জুবাইদা রহমান হলেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের স্ত্রী। যদিও শৈশবের পোস্টে কপিরাইট ক্লেইম করতে ‘শুভ দাস’ নামের এক ব্যক্তির ইমেইল। অর্থাৎ, তারেক রহমানের ছবিতে কপিরাইট ক্লেইম দেয়ার জন্য তার স্ত্রীর নামের একটি পেইজ ব্যবহার করা হলেও ইমেইল ব্যবহার করা হয়েছে অন্য ব্যক্তির।

বিভিন্ন আইডি ও পেইজের পোস্টে ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম দিতে ব্যবহৃত আইডি ও ইমেইল ঠিকানা

বিভিন্ন আইডি ও পেইজের পোস্টে ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম দিতে ব্যবহৃত আইডি ও ইমেইল ঠিকানা | দ্য ডিসেন্ট কর্তৃক সংগৃহীত

ভুক্তভোগী শৈশব জানান, ভুয়া রিপোর্টের কারণে তার আইডি পুরোপুরি ব্যান না হলেও দীর্ঘদিনের জন্য “রেস্ট্রিক্টেড” ছিল। এর ফলে তার আইডির রিচ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। শৈশব আরও বলেন, “আমার মনিটাইজেশন বন্ধ করে দিয়েছে ফেসবুক। যদিও, ওরা আমাকে কখনো টাকা দেয় নাই। তবে আমার জন্য না হলেও, কারো কারো জন্য তো এটা সমস্যাই।”

কারা করছে এসব ভুূয়া কপিরাইট ক্লেইম?

উপরে উল্লিখিত ঘটনাগুলোয় যেসব ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম করা হচ্ছে সেসবের সাথে কে বা কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে অতীতে বাংলাদেশে একাধিক সাইবার গ্রুপের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগে উঠেছিল; যারা ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম এবং এরকম আরও নানান পদ্ধতিতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পোস্ট রিমুভ করা বা পেইজ গায়েব করে দেয়ার সাথে জড়িত ছিল।

“Crack Platoon-Bangladesh Cyberforce” এবং “Ryan Draper” নামের দুটি পেইজ থেকে সম্প্রতি তাদের একাধিক পোস্টে জানিয়েছে তারা বিভিন্ন ব্যক্তির পেইজ/আইডি ফেসবুক থেকে রিমুভ করেছে।

“Crack Platoon-Bangladesh Cyberforce”-- যারা নিজেদেরকে পতিত স্বৈরাচার ‘শেখ হাসিনার সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেয়– তাদের ২৫ ডিসেম্বরের এক পোস্টে বলেছে, “জামাত–শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহৃত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত গুপ্ত শিবিরদের পেইজ PUSAB—কে কনটেন্ট ডিসেবল করা হয়েছে।” (আর্কাইভ লিংক)।

পোস্টের সঙ্গে যুক্ত স্ক্রিনশটে ফেসবুকের কপিরাইট ক্লেইমের ফর্মটিও দেখা যায়।


Crack Platoon-Bangladesh Cyberforce নিজেরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক আইডি বা প্রোফাইল রিমুভ করেছে এমন দাবি গর্বভরে প্রচার থাকে। পেইজটির এমন কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে ও এখানে; যেখানে তারা সাম্প্রতিক সময়ে রিমুভ করা কয়েকটি আইডির ছবি শেয়ার করেছে।

Crack Platoon-Bangladesh Cyberforce এর সোশাল মিডিয়া এনালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেয়া Ryan Draper নামক ফেসবুক আইডিতে ২৫ ডিসেম্বর একটি পোস্ট দেয়া হয় PUSAB-কে নিয়ে।

পোস্টটিতে লেখা হয়েছে, “সকাল থেকে পুসাবের অফিসিয়াল পেইজে কমপক্ষে ১০টি কপি রাইট স্ট্রাইক দেওয়া হয়েছে। এখন পেজটি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

পোস্টে যে ভিডিও সংযুক্ত করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে PUSAB নামক পেইজটির বিরুদ্ধে কপিরাইট ক্লেইমের স্ক্রিনশট।


Ryan Draper এর প্রোফাইলে বিভিন্ন সময়ে বহু ফেসবুক পেইজ ও আইডিকে (কপিরাইট ক্লেইম দিয়ে) রিমুভ করার কৃতিত্ব দাবি করে পোস্ট করতে দেখা গেছে। এরকম কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে ও এখানে।

আবার একই দিনে, “Qawmi Cyber Expert Team” নামক ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট দিয়ে বলা জানানো, “ভারতের হকার সাংবাদিক ময়ুখ রঞ্জন ঘোস এর ভেরিফাইড ফেসবুক একাউন্ট থেকে কপিরাইট এর মাধ্যমে চারটি পোষ্ট রিমুভ করা হলো।”

এই গ্রুপের দ্বারা রিমুভ করা ফেসবুক পেইজ বা আইডির কয়েকটি দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।

“Dark Cyber Gang - DCG” নামের আরেকটি পেইজ থেকে গত ২৬ ডিসেম্বর পোস্ট করা হয়েছিল, “টিম Dark Cyber Gang - DCG এর পক্ষ হতে না/স্তি/ক মুফতি ইমরান বশির এর ইউটিউব চ্যানেল থেকে ক/পিরা/ইট এর মাধ্যমে একটা পোস্ট টেক/ডা/উন করা হল।”

এই গ্রুপের দ্বারা বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ ও আইডি রিমুভ করার কৃতিত্ব দাবি করা কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে। তাদের একাধিক পোস্টে দেখা গেছে, ফেসবুকের কপিরাইট ক্লেইম এর মাধ্যমে পেইজ বা কন্টেন্ট রিমুভ করার প্রমাণের ছবি শেয়ার করা হয়েছে।

কী উপায়ে এভাবে অন্যের পোস্ট বা পেইজ বা একাউন্ট রিমুভ করে দেয়া হয় জানতে দ্য ডিসেন্ট কথা বলে একজন সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এক্সপার্ট ওমর ফারুকের সঙ্গে। 

ইয়াতি ডিজিটাল-এর ফাউন্ডার ওমর ফারুক বলেন, “ভুয়া ডকুমেন্ট বানিয়ে বড় কিছু সাইবার গ্রুপ সুনির্দিষ্ট ওয়েতে আপিল করে কাজটি করে থাকে। পোস্ট কিংবা ছবির ক্ষেত্রে সাধারণত এক থেকে তিন দিন, ভিডিওর ক্ষেত্রে মাসের বেশি সময় লাগে সরাতে। অনেক সময় এর থেকে বেশি সময়ও লাগে।”

তিনি আরও বলেন, “এটা কারও একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। বড় গ্রুপ বড় লেনেদেনের বিনিময়ে এসব কাজ করে। আন্তর্জাতিকভাবে কিছু এক্সপার্ট আছে, যারা ফেসবুকের অ্যালগরিদম বাইপাস করে কাজটি করতে পারে।”

ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম দিয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কন্টেন্ট বা পেইজ এমনকি স্বনামধন্য মিডিয়া আউটলেটের কন্টেন্ট সরিয়ে দেয়ার বিষয়টি স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতামত প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) লিগ্যাল স্পেশালিস্ট মনিশা বিশ্বাস বলেন, “ইন্টারমিডিয়ারি প্ল্যাটফর্মগুলোতে কপিরাইট আইনের অপব্যবহার অনলাইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। অপরাধীরা এই টুলগুলোকে ব্যবহার করে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করছে। প্ল্যাটফর্মগুলোর ‘কন্টেন্ট রিমুভাল’ এবং ‘স্ট্রাইক’ সিস্টেমে সংস্কার আনা জরুরি।” 

এছাড়া কোনো কন্টেন্ট সরানোর আগে উভয় পক্ষকে কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশে ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম দিয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কন্টেন্ট সরানোে চেষ্টা এবারই প্রথম নয়। এর আগে সুইডেন-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একটি মূলধারার গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বিগত সরকারের সংশ্লিষ্টরা। ভুয়া কপিরাইট অভিযোগ (DMCA/YouTube strike) ব্যবহার করে ভিন্ন মতাদর্শের সাংবাদিকদের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করার কাজ করেছে। এ জন্য তারা নকল ওয়েবসাইট ও ভুয়া পরিচয় তৈরি করে কন্টেন্ট কপি করে ব্যাকডেট দেখিয়ে হোস্টিং ও প্ল্যাটফর্মগুলোকে কন্টেন্ট টেকডাউন করতে বাধ্য করেছে।

বাংলাদেশের বাইরেও সাইবার অপরাধীরা প্ল্যাটফর্মের কপিরাইট স্ট্রাইক ও রিপোর্টিং সিস্টেমকে অপব্যবহার করে ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সারদের অ্যাকাউন্ট বন্ধের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেছে।