বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে অনলাইনে ক্যাম্পেইন করছে কারা?

১ মার্চ, ২০২৬

গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কাদুগলি লজিস্টিকস বেইসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায়  ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত ও ৯ জন আহত হন। এ ঘটনায় দেশবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ নিহত সেনাদের জন্য শোক প্রকাশ করেন।

সশস্ত্রবাহিনী, সরকার, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও বিবৃতি দিয়ে শোক প্রকাশ করে। ১৩ই ডিসেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেন।

দেশের বাইরে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগের ঘটনায় দলমত নির্বিশেষে শোকাহত হলেও সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিন্নচিত্রও পরিলক্ষিত হয়েছে।

‘তাগুত বাহিনী’র ‘মুরতাদ সদস্য মরেছে’

তারেক রহমানের শোকবার্তার পোস্টটি শেয়ার করে শাখাওয়াত উল্লাহ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে নিহত সেনা সদস্যদেরকে ‘তাগুত সেনাবাহিনী’র সদস্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। 
শাখাওয়াত উল্লাহ নামক আইডির পোস্টে লেখা হয়েছে, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো খবর। এই তাগুত সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হয়ে বহু মুসলিম দেশে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বর্তমানে সোমালিয়ায় মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়াইরত আছে, এ লড়াই যদি কোন সেনাবাহিনী মারা যায় তাহলে সে জাহান্নামী, কারণ সে আল্লাহর জমিন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠাকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, কবে বুঝ আসবে আমাদের এই দেশের শাসক ও সামরিক বাহিনীর, যে পশ্চিমারা  তাদেরকে সামনে ঠেলে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে, সুদানে মুসলিম রাষ্ট্র ভেঙে তারা খ্রীষ্টান রাষ্ট্র তৈরি করেছে যার নাম দিয়েছে পূর্ব তিমুর অর্থাৎ দক্ষিণ সুদান, এই খ্রিষ্টান রাষ্ট্র বানানোর জন্য আমাদের বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও লড়াই করেছে এবং সেই খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।”

১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর পেইজ থেকেও আমির ডা শফিকুর রহমানের শোকবার্তা প্রচার করা হয়।

মুহাম্মদ আনিস উদ্দিন নামের একটি আইডি থেকে পোস্টটি শেয়ার দিয়ে ক্যাপশনে লেখা হয়, “মরছে মুরতাদ হয়ে আর বানিয়ে দিচ্ছে শহীদ।”

জামায়াতের পেইজের ওই পোস্টে ৯৭টি কমেন্ট পড়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৮টি কমেন্ট এমন পাওয়া গেছে যেগুলোতে নিহত সেনাদেরকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দেওয়া, তাদের মৃত্যুতে উল্লাস এবং নিহত সেনাদের মৃত্যুকে ‘শহীদি মৃত্যু’ বলায় জামায়াত ইসলামীকে কটাক্ষ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘তাগুত’, ‘মুরতাদ’ ও ‘নাপাক’ বাহিনী বলে প্রচারণা নতুন নয়। কয়েক বছর ধরে সশস্ত্র বাহিনীকে এধরণের আখ্যা দিয়ে প্রচারণা চলে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

দ্য ডিসেন্ট ৬০টির মত ফেসবুক আইডির কন্টেন্ট বিশ্লেষণ করেছে যেসব আইডি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময় এধরণের প্রচারণা চালিয়েছে।

ইতিপূর্বে বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র বাহিনীকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে প্রচারণা চালালেও ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বিভিন্ন ইস্যুতে এ প্রচারণার বৃদ্ধি দেখতে পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট।  

সাম্প্রতিক আরও যেসব ইস্যুতে একই রকম প্রচারণা হয়েছে

গত বছরের ২২ এপ্রিল কোহিনুর কেমিক্যাল কারখানায় একজন হিন্দু ধর্মালম্বী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নবীকে (স) অবমাননার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার শাস্তি দাবি করে কারখানাটির সামনে অবস্থান নিয়ে একদল বহিরাগত সড়ক অবরোধ করে। এক পর্যায়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরিয়ে দিতে লাঠি চার্জ করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে পোস্ট দিতে দেখা যায় বিভিন্ন আইডি থেকে। 

গত বছরের ৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষ মিশনে যোগ দিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৯৯ জন সদস্য ঢাকা ত্যাগ করে।

Al Firdaws নামের একটি পেইজ থেকে “মুসলিম সুদান ভেঙ্গে নব্যসৃষ্ট খৃষ্টান দেশ ‘দক্ষিণ সুদান’ এর নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৯৯ জন সদস্যের ঢাকা ত্যাগ” শিরোনামে মিশনে যাওয়া নৌবাহিনী সদস্যদের ছবি দিয়ে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। 

ওই পোস্টের নিচে ১৭০ টি কমেন্ট পাওয়া যায়। এসব কমেন্টের বেশিরভাগই নৌবাহিনী সদস্যদের মুরতাদ আখ্যা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের মৃত্যু কামনা করে করা হয়েছে। পোস্টটি ১৫০ জন শেয়ার করে যার অনেকগুলোতেই নৌবাহিনী সদস্যদের মুরতাদ আখ্যা ও মৃত্যু কামনা করে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও Al Firdaws এর ফটোকার্ডটি পোস্ট করে নৌসেনাদের মুরতাদ আখ্যা দিয়ে পোস্ট করতে দেখা যায় আরও অনেক আইডি থেকে। 

Al Firdaws নামের পেইজটি আল-কায়দা, টিটিপিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সন্ত্রাসী হামলার খবর ও এসব সংগঠনের মতাদর্শ নিয়মিত প্রচার করে থাকে।

২০২৪ সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী প্রকৌশলীরা জাতিসংঘ পদক লাভ করে। এই খবরটি বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করার পর সংবাদমাধ্যমগুলোর পেইজে কমেন্ট সেকশনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে কমেন্ট করতে দেখা যায় বহু ব্যবহারকারীকে। এছাড়া খবরটি শেয়ার দিয়েও মুরতাদ আখ্যা দিতে দেখা যায় অনেক আইডি থেকে। 

২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বাংলাদেশ ও ভারতের সেনাবাহিনীর একটি দল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তের শূন্য রেখায় সৌজন্য সাক্ষাত করে। সাক্ষাতের ছবিটি দিয়ে সেনাবাহিনীকে মুরতাদ বাহিনী আখ্যা দিয়ে পোস্ট করতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। 

গত বছরের ২১ মার্চ বায়তুল মোকাররমে ইসরায়েলী হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। কর্মসূচী থেকে এক ব্যক্তির কাছে কালো পতাকা পাওয়ায় তাকে আটক করে সেনাবাহিনী। এ ঘটনার ভিডিও পোস্ট করে সেনাবাহিনীকে মুরতাদ বাহিনী হিসেবে প্রচার করা হয় ফেসবুকে। 

গত বছরের ১৭ নভেম্বর এক্সকাভেটর নিয়ে ধানমন্ডী ৩২ ভাঙার কর্মসূচী দেন একদল বিক্ষোভকারী। তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাইফুল ইসলাম নামের এক যুবক সেনাবাহিনীকে ‘আমাদের পোষা কুকুর’ বলে অভিহিত করেন। 

পরে সেনাসদস্যরা তার বাসায় গিয়ে তাকে মারধর করেছেন বলে অভিযোগ তোলেন ওই যুবক। তার অভিযোগ তোলার পর সেনাবাহিনীকে মুরতাদ ও তাগুত বাহিনী বলে প্রচারণা চালাতে দেখা যায় ফেসবুকে। 

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর শরীফ ওসমান হাদি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর তার মৃত্যুর  পেছনে সেনাবাহিনী জড়িত দাবি করে বাহিনীটিকে ‘তাগুত বাহিনী’ আখ্যা দিয়ে প্রচারণা করা হয় ফেসবুকে। 

এই বছরের জানুয়ারিতে গাজায় শান্তি ফেরানোর জন্য প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর অংশ হতে বাংলাদেশের আগ্রহ প্রকাশের আলোচনা উঠলে সেনাবাহিনীকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে প্রচারণা করা হয়। 

প্রচারণা চালায় কারা

বিভিন্ন ইস্যুতে ২০১৫ সাল থেতে সশস্ত্র বাহিনীকে ‘মুরতাদ’, ‘নাপাক’, ’তাগুত’ বাহিনী বলে প্রচারণায় অংশ নিয়েছে এমন সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট থেকে বিশ্লেষণের জন্য দ্য ডিসেন্ট ৬০টি আইডি বাছাই করেছে। 

এসব আইডির মধ্যে ২২টিতে আল-কায়দা, ১১টিতে টিটিপি, ৭টিতে জেএমবি, ৪টিতে আইএস-এর মতাদর্শের পক্ষে বক্তব্য প্রচার করতে দেখো গেছে। এসব আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৮টি আইডি আসল নাম ও ছবি ব্যবহার করে খোলা হয়েছে এবং বাকী ৪২টি আইডি নকল নাম ও ছবি ব্যবহার করে খোলা হয়েছে। 

জেএমবি সমর্থক আইডিগুলো থেকে জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শায়খ আব্দুর রহমানের ছবি পোস্ট করে তার মৃত্যুকে মহিমান্বিত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া তার মৃত্যুর জন্য একাধিক আইডি থেকে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে ‘খুনি’ ও ‘তাগুত’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। 

আল-কায়দা সমর্থক আইডিগুলো থেকে আল-কায়দার পতাকার ছবি, ওসামা বিন লাদেনকে মহান মুজাহিদ হিসেবে তুলে ধরা, লাদেনের বক্তব্য প্রচার, টুইন টাওয়ারে হামলাকে উদযাপন, বিভিন্ন দেশে আল-কায়দার হামলার আপডেট, আল-কায়দার কর্মপ্রণালী ইত্যাদি নিয়ে পোস্ট দিতে দেখা যায়। দ্য ডিসেন্ট যেসব আইডিকে আল-কায়দা সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেসব আইডির অনেকগুলো থেকে টিটিপি’র পক্ষেও ইতিবাচক প্রচারণা করতে দেখা গেছে।

আইএস মতাদর্শী আইডিগুলোতে দাওলাতুল ইসলাম এর নাম উল্লেখ করে এর নীতি-আদর্শ, বিভিন্ন দেশে কর্মকাণ্ড, টুইন-টাওয়ারে হামলা উদযাপন, আইএস’র পতাকার ছবি, যুদ্ধরত এলাকার বেসামরিক নাগরিককে হত্যার ফতোয়া ইত্যাদি নিয়ে পোস্ট করা হয়েছে। 

টিটিপি সমর্থক আইডিগুলো থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে টিটিপি’র চালানো বিভিন্ন হামলাকে উদযাপন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে কাফের ও নাপাক আখ্যা দেওয়া, পাকিস্তানে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নিয়ে পোস্ট করতে দেখা যায়। 

সেনাবহিনীকে দলগত ‘মুরতাদ’ ফতোয়াটি আল-কায়দার

আল-কায়দার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (AQIS) সংশ্লিষ্ট বাংলা ওয়েবসাইট ‘দাওয়াহ ইলাল্লহ’তে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দলগতভাবে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে ২০১৫ সালে একটি ফতোয়া প্রচার করা হয়।

এতে বলা হয়, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হচ্ছে দলগতভাবে একটি মুরতাদ বাহিনী, যদিও এর ভিতর কোন কোন ফাসিক মুসলমান, এমনকি মুমিনও থাকতে পারে। তবে এই কারণে “এই মুরতাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদের হুকুম” এ কোন পরিবর্তন হবে না।”

ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়, “বর্তমান বিশ্বের যেকোন দেশের সেনাবাহিনীর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিমদের শত্রুদের স্বার্থ রক্ষা করা। এটা হচ্ছে মুসলিম ইতিহাসের মধ্যে অত্যন্ত জঘন্যতম একটি অধ্যায়! এই সেনাবাহিনীর দ্বারা দুইটি উদ্দেশ্যকে বাসত্মবায়ন করা হয়:

প্রথমত, দেশের রাজা অথবা প্রেসিডেন্ট এবং তার সহচরদেরকে রক্ষা করা অর্থাৎ তাগুতের রক্ষাকারী

দ্বিতীয়ত, এই উম্মতের শত্রু অর্থাৎ ইহুদী এবং আগ্রাসী (আমেরিকার) শক্তির স্বার্থ রক্ষা করা। 

- এই সেনাবাহিনী মুসলিম দেশগুলোতে মুরতাদ শাসকদেরকে রক্ষা করছে।

- এরা ইসলামী শরীয়াহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং

- যারা এই শরীয়াতকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদেরকে হত্যা করছে।

- তারা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করার জন্য পাকিস্থান, সোমালিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের মুজাহিদীনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।”