ভুয়া লাইসেন্স, ভুয়া ঠিকানা, ভুয়া প্রডাক্ট রিভিউ ও ডিপফেক ভিডিও দিয়ে ‘যৌন রোগের ঔষধ’ বিক্রি
জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারির নামে ফেসবুকে অসংখ্য পেজ খুলে সেগুলো থেকে অননুমোদিত যৌন শক্তিবর্ধক পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। দ্য ডিসেন্ট এমন ৫০টি ফেসবুক পেজ খুঁজে পেয়েছে যেখানে মিজানুর রহমান আজহারির ছবি, ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া মন্তব্য যুক্ত করে শত শত বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে ফেসবুকের নীতিমালা ভঙ্গ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি এসব ডিপফেক ভিডিওকে ‘সত্যিকারের’ মনে করে পোস্টগুলোর কমেন্টে ভুয়া ওষুধ ক্রয় করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব পেজের অনেক বিজ্ঞাপনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করার জন্য কিছু ব্যক্তিদের দিয়ে প্রশংসামূলক ভুয়া মন্তব্য (প্রডাক্ট রিভিউ) করা হচ্ছে। অননেুমোদিত এসব পণ্য বিক্রি করতে ভুয়া লাইসেন্স এবং ভুয়া ঠিকানাও ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নামে ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচার করে পণ্য বিক্রির ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগে বিভিন্ন সময় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস, এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের নাম, ছবি, ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে ভুয়া ওষুধ, নিষিদ্ধ জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছে।
ড. মিজানুর রহমান আজহারির ছবি ব্যবহার করে প্রচারিত ডিপফেক ভিডিওগুলোতে দেশের প্রতিষ্ঠিত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করা হচ্ছে। অনেক বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে, ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রকৃত কার্যকরী চিকিৎসাপদ্ধতি মানুষের কাছে গোপন রাখছে।
এছাড়াও ভিডিওগুলোতে ‘মাত্র ৬দিনেই পুরুষত্বহীনতার সমাধান’ এবং ‘ওষুধ বিফলে গেলে এক লক্ষ টাকা থেকে এক লক্ষ ডলার’ ফেরত দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এমনকি ডিপফেক ভিডিওতে আজহারিকে এমন চ্যালেঞ্জ দিতে দেখা গেছে যে, ওষুধ কাজ না করলে ইসলামের দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি!

একটি বিজ্ঞাপনমূলক ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, ‘কোনো ধরনের ডাক্তার এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ২৪ ঘণ্টায় যৌন সমস্যার সমাধান হবে।’
অনুসন্ধানে ৩৬টি ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে মিজানুর রহমান আজহারির নাম ভাঙিয়ে এসব যৌন শক্তিবর্ধক পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। ফেসবুকের অ্যাড লাইব্রেরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই মাসে প্রাপ্ত ৫০টি পেজ থেকে গত এক মাসে ৫৯০টি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে।
মিজানুর রহমান আজহারি দ্য ডিসেন্ট-কে জানিয়েছেন, তার পক্ষ থেকে গত বেশ কিছুদিন ধরে এসব ভুয়া পেজের বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি।
“বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। অনেক সাধারণ মানুষ না বুঝেই এগুলো বিশ্বাস করতে পারে”, বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
জনাব আহজারির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেখা গেছে তিনি গত জানুয়ারি মাস থেকে একাধিকবার এসব ভুয়া কন্টেন্টের বিষয়ে তার অনুসারীদের সতর্ক করে পোস্ট দিয়েছেন। পাশাপাশি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডাইরি (জিডি) করেছেন বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজের নাম উল্লেখ করে।
জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া লাইসেন্সে ওষুধ বিক্রি
ড. মিজানুর রহমান আজহারি বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন ইসলামি আলোচক। তিনি আল আজহার ইউনিভার্সিটির তাফসির অ্যান্ড কুরআনিক সাইন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া-এর ডিপার্টমেন্ট অব কুরআন অ্যান্ড সুন্নাহ স্টাডিজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বর্তমানে সেখানেই পিএইচডি গবেষণা করেছেন।
আজহারির ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার), ইউটিউব, টিকটক অ্যাকাউন্টগুলোতে তাকে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ব্যক্তি ফলো করছেন। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেন এমন বাংলাদেশি ইসলামি বক্তাদের মধ্যে ফলোয়ার সংখ্যার দিক থেকে তিনি সবার শীর্ষে।
এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাচ্ছে অসাধু চক্র। তার নাম, ছবি এবং তার নামে তৈরি ভুয়া ভিডিও ও ভুয়া উক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে যৌনবিষয়ক ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। দ্য ডিসেন্ট এমন অন্তত ৫০টি ফেসবুক পেজ খুঁজে পেয়েছে যেখানে আজহারির নাম ও ছবি ব্যবহার করে যৌন উদ্দীপক দুইটি ওষুধ (ইউনিকর্ন এবং জিনসেং) বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪টি পেজ মিজানুর রহমান আজহারি নামে পরিচালনা করা হচ্ছে এবং বাকি পেজগুলো তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিম্বা তার নামের অংশ বিশেষ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

আজহারির ছবি তৈরি করে প্রচার করা একাধিক ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, এসব ওষুধ গ্রহণে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন নেই।
যদিও চিকিৎসকরা ভিন্ন কথা বলছেন। তথাকথিত 'ইউনিকর্ন' বা এ জাতীয় যৌন উদ্দীপক ওষুধ এবং জিনসেং ক্যাপসুল চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে চিকিৎসকরা মতামত দিয়েছেন।
মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে ভেষজ বা প্রাকৃতিক বলে দাবি করা অনেক ওষুধে আসলে অঘোষিতভাবে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক উপাদান মেশানো থাকে। এসব ওষুধ সেবনের ফলে রক্তচাপ হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে বা বেড়ে যেতে পারে, যা সরাসরি হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া বা বুক ধড়ফড় করার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে যাদের হার্টের সমস্যা বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের জন্য এই ধরনের অনিবন্ধিত ওষুধ জীবননাশের কারণ হতে পারে
জিনসেং-এর ক্ষেত্রেও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ হলো, এটি দীর্ঘ সময় সেবন করলে অনিদ্রা, অস্থিরতা এবং শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। চিকিৎসকরা বারবার পরামর্শ দেন যে, যেকোনো যৌন উদ্দীপক বা শক্তিবর্ধক সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা বিবেচনা না করে এসব ওষুধ খেলে কিডনি ও লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
ভুয়া ফেসবুক পেজগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তাদের ওষুধগুলো Bangladesh Standards and Testing Institution (BSTI) এবং Bangladesh Council of Scientific and Industrial Research (BCSIR) কর্তৃক অনুমোদিত বলে প্রচারণা চালায়।
"Halal Azhari Shop - Medical Team" নামক একটি পেজে দাবি করা হয়েছে, তাদের বিক্রি করা Ginseng পণ্যটি BCSIR কর্তৃক অনুমোদিত। পোস্টটির অর্ডার নাউ বাটনে ক্লিক করলেhttps://halalazharishop.com/ নামক একটি ওয়েবসাইট আসে। ওয়েবসাইটে BCSIR কর্তৃক অনুমোদনের একটি ছবি পাওয়া যায়। তবে যাচাই করে দেখা যায়, BCSIR ল্যাবে পরীক্ষা করা পণ্যটি Ginseng নয় বরং White Cure নামক একটি পণ্য, যেটি মূলত একটি স্কিনকেয়ার পণ্য।
এছাড়াও Urocin Bd নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে মিজানুর রহমান আজহারির ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এমন দাবিতে Urocin নামক একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। পোস্টে দেওয়া ওয়েবসাইটে (https://urocinbd.shop/) প্রবেশ করলে দেখা যায়, ওয়েবসাইটে Urocin পণ্যকে Bangladesh Standards and Testing Institution (BSTI) কর্তৃক পরীক্ষিত বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে সংযুক্ত নথির ছবিটি যাচাই করলে দেখা যায়, সেটি মাথায় ব্যবহার করার জন্য একটি তেলের পরীক্ষার রিপোর্ট। এছাড়াও সংযুক্ত নথিতে ‘ব্যাক আড়ং’কে পণ্যটির লাইসেন্স দেওয়া বলে লেখা রয়েছে। Urocin পণ্য বা Urocin BD নামক কোনো প্রতিষ্ঠানকে ওই লাইসেন্স দেয়ার তথা লেখা নেই। অর্থাৎ, অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা লাইসেন্সকে নিজেদের লাইসেন্স বলে অসত্যভাবে প্রচার করছে এসব ভুয়া পেজ।

টাকা খরচ করে ৫৯০টি বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে ফেসবুকে
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫০টি পেজের মধ্যে ২৭টি পেজ গত দুই মাসে খোলা হয়েছে, আবার কিছু পুরোনো পেজের নাম পরিবর্তন করে আজহারি বা বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক নাম দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত ৫০টি পেজে এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সর্বমোট সাত লক্ষ পনের হাজার ফলোয়ার যুক্ত থাকতে দেখা গিয়েছে। কোন কোন পেজে আজহারি ছাড়াও অন্যান্য ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে একই পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে।
মেটার অ্যাড লাইব্রেরি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব পেজে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯০টি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে। প্রতিটি বিজ্ঞাপন সর্বনিম্ন এক ডলার খরচ করে প্রচার করা হলেও অন্তত ৫৯০ ডলার খরচ করা হয়েছে। কিছু বিজ্ঞাপন মাসাধিককাল ধরে সক্রিয় আছে; ফলে সেগুলোর জন্য খরচ করা অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধের বিজ্ঞাপনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে যমুনা টিভির খবরের আদলে ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে প্রচারণা করতে দেখা গেছে একাধিক পেজে। যমুনা টিভির একটি ভুয়া খবর ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, “স্পেসএক্স কোম্পানি মিজানুর রহমানের উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে কয়েক মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করেছে। মাত্র তিন দিনের মধ্যে বৃহত্তম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে ধ্বংস করেছে এবং ১০ লক্ষ পুরুষকে প্রোস্টাটাইটিস এবং দুর্বল ইরেকশন থেকে মুক্ত করেছে।”

যমুনা টিভির নিউজের আদলে তৈরি করা আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, “ঢাকার এক ঝাঁক বিজ্ঞানী বা স্বাধীন ইউরোলজিস্টদের সাথে বসে মিজানুর রহমান আজহারির আবিষ্কৃত এই উপাদান তৈরি করা হয়েছে।”
দ্য ডিসেন্ট ৫০টি পেজ বিশ্লেষণ করে এসব পেজের সাথে সংশ্লিষ্ট ৩৬টি ওয়েবসাইট শনাক্ত করেছে, যেসব ওয়েবসাইট থেকে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং বিক্রয়ের অর্ডার নেওয়া হয়। রিপোর্টের শেষে ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর দেখুন।
বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ভুয়া রিভিউ
মেটা প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত এসব বিজ্ঞাপনকে বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কৃত্রিমভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া (পণ্য রিভিউ) ও মন্তব্য তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।
দ্য ডিসেন্ট এমন একাধিক পোস্ট খুঁজে পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে কয়েক ডজন অ্যাকাউন্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক মন্তব্য করা হয়। একই একাউন্ট থেকে একাধিক পোস্টে একই মন্তব্য করতে দেখা গেছে। এসব মন্তব্যকারী একাউন্টগুলোর অন্তত ২০টি যাচাই করে দেখা গেছে সেগুলোর প্রোফাইল লক করা, অথবা চিহ্নিত করা যায় এমন তথ্য বা ছবি প্রোফাইলে নেই।
Azhari Shop নামক একটি পেজ থেকে ৩০ মার্চ প্রকাশিত মিজানুর রহমান আজহারির ডিপফেক ব্যবহার করে একটি বিজ্ঞাপনের কমেন্ট বক্স বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পোস্টে যতগুলো ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায়, সবগুলোই একই দিনে অর্থাৎ ৩০ মার্চ রাত ৯:১০ থেকে ৯:১৮ মিনিটের ব্যবধানে করা হয়েছে।
Imran Mahamud নামে এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, “কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নাই, ভালো প্রোডাক্ট,, আমি ব্যবহার করছি এবং ফলাফল পাইছি যারা এই সমস্যায় ভুগতেছেন তারাও ব্যবহার করতে পারেন।।” Josim Uddim লিখেছেন, “আমি চট্টগ্রাম থেকে বলতেছি আপনাদের ঔষধ সেবনের ফলে সুস্থ হয়ে গেছি।” Mostafa Kamal নামে একজন লিখেছেন, “আগে অনলাইনে অর্ডার করতে ভয় পাইতাম যদি পন্য না দেয় বা নকল পন্য দেয় সে জন্য।অনেক সাহস করে একটা পন্য অর্ডার কনফার্ম করছিলাম আলহামদুলিল্লাহ যা দেখাইছে তাই পাইছি।ধন্যবাদ ভাই আপনাদের অরিজিনাল পন্য দেওয়ার জন্য।” Sufi Alom লিখেছেন, “অনেক অনেক উপকার হলো, আমিও এমন।একটি মেডিসিন খুঁজছি ধন্যবাদ আপনাকে ভাই।” Monu Mia লিখেছেন, “আমার বিশ্বাস ছিল না যে এত ভালো প্রোডাক্ট পাওয়া যায় অনলাইনে ধন্যবাদ ভাই আপনাকে।”
নামপ্রকাশ না করার শর্তে একজন মন্তব্যকারী দ্য ডিসেন্টকে জানান, তিনি তার এক বন্ধুর কথায় এমন কমেন্ট করেছেন। তার বন্ধু এমন কিছু গ্রুপের সাথে যুক্ত যারা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পোস্টে কমেন্ট করে থাকেন।
তবে তিনি ঐ বন্ধুর পরিচয় এবং সেই গ্রুপগুলো কী কী সম্পর্কে কিছু চাননি।
Halal Azhari Shop -Medical Team" নামক অন্য একটি পেজে আজহারির ছবি ব্যবহার করে Ginseng নামক একটি পন্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। পোস্টটি দেওয়া হয়েছে ৩ এপ্রিল রাত ২টা ২৭ মিনিটে। পেজটিতে মাত্র ১৪২জন ফলোয়ার থাকলেও পোস্টটি দেওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে কয়েক ডজন ইতিবাচক কমেন্ট করতে দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী হচ্ছেন অনেকে
এসব বিজ্ঞাপন মানুষ কতটা বিশ্বাস করছেন বা সেগুলো মানুষের মনে আগ্রহ তৈরি করছে কিনা, তা বোঝার জন্য কৃত্তিমভাবে ইতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে এমন পূর্বে উল্লিখিত দুইটি পোস্টের কমেন্টগুলো বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডিসেন্ট।
Halal Azhari Shop -Medical Team" পেজের একটি পোস্টে ৪১৮টি কমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে অন্তত ৪২জন Ginseng পণ্যটি কিনতে বা এটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছেন। ১৭জন দাম জানতে আগ্রহী হয়েছেন।
যারা আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই পণ্যের দাম, কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অর্ডারের নিয়ম এবং মিজানুর রহমান আজহারির আসল পেজ কিনা জানতে চেয়েছেন।
AB Siddik নামে একজন মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন, “আসসালামু আলাইকুম আমি তো অনেক আশা করে নিয়েছিলাম হুজুরের কথা শুনে কিন্তু কোন কাজ হয় না, দুঃখজনক ব্যাপার এরাও ওদের মতই।”
কয়েকজন ব্যক্তি পোস্টটিকে ‘গুজব’ বলেও মন্তব্য করেছেন। একাধিক ব্যক্তি চেম্বারে গিয়ে সরাসরি ওষুধটি কিনতে চেয়েছেন। আবার কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্য লিখেছেন এভাবে: “আজহারি হুজুর ওয়াজ ছেড়ে এসব বাটপারি ব্যাবসা ধরেছেন।”
মেটার নীতিমালা লঙ্ঘন করেই চলছে এসব বিজ্ঞাপন
মেটা প্ল্যাটফর্মে কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে নির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। জমা দেওয়া প্রতিটি বিজ্ঞাপন প্রথমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান করে দেখা হয়, তা নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদনযোগ্য কিনা। প্রয়োজনে বিজ্ঞাপনগুলো ম্যানুয়াল রিভিউয়ের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়, তবে প্রকাশের পরও যেকোনো বিজ্ঞাপন পুনরায় পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
মেটার বিজ্ঞাপন নীতিমালার “Unacceptable Business Practices (অগ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক আচরণ)” অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনদাতারা এমন কোনো পণ্য, সেবা বা অফার প্রচার করতে পারবেন না, যা প্রতারণামূলক বা বিভ্রান্তিকর পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। বিশেষত, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির নাম, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের উদ্দেশ্যে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই ধরনের প্রচারণাকে মেটা নীতিমালায় “celeb bait” বা সেলিব্রিটি প্রলুব্ধকরণ বিজ্ঞাপন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। বিভ্রান্তিকর এই বিজ্ঞাপন শনাক্তে মেটা ফেইস রেকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ছবিগুলো সংশ্লিষ্ট সেলিব্রিটির প্রোফাইল বা অনুমোদিত মিডিয়া উপস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হয়, যাতে কোনো বিজ্ঞাপনে কারও ছবি বা পরিচয়ের অপব্যবহার শনাক্ত করা যায়।
তবুও মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে নিয়মিতভাবে মিজানুর রহমান আজহারির নাম ও ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে। এতে কেবল মেটার নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন হচ্ছে না, বরং তাদের বিজ্ঞাপন যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
এসব পণ্যের পেছনে কারা
জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারির নাম ব্যবহার করে এসব ফেসবুক পেজ এবং ওয়েবসাইট কারা ব্যবহার করছে, তা জানার চেষ্টা করেছে দ্য ডিসেন্ট। ক্রেতা সেজে Halal Azhari Shop -Medical Team" এর ফেসবুক পেজে দেওয়া ফোন নম্বর 01340711583-এ কল দেওয়া হলে একজন ব্যক্তি অনলাইনে অর্ডার করতে বলেন।
পেজে বিক্রিত Ginseng পণ্যটি কার্যকর কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি শতভাগ কার্যকর। এ ওষুধ সেবনে কোনো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন নেই। এটি আজহারি হুজুরের তত্ত্বাবধানে মান নিয়ন্ত্রণ করে তৈরি করা হয়েছে।
Halal Azhari Shop -Medical Team পেজটি মিজানুর রহমান আজহারির ‘মেডিক্যাল টিম’ এর আসল পেজ কিনা এবং মিজানুর রহমান আজহারির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, “পেজটি মিজানুর রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।”
ব্যবসার জন্য বেশি পরিমাণ ওষুধ তাদের অফিসে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে কিনতে চাইলে, ঐ ব্যক্তি মিরপুর-২-এর লাভ রোডে মনা হাউজিং-এর ২য় তলায় অবস্থিত তাদের অফিসে যেতে বললেন। দ্য ডিসেন্ট-এর দুইজন প্রতিনিধি ৭ এপ্রিল দুপুরে মিরপুর-২-এর লাভ রোডে গিয়ে আলোচ্য ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে উপরের মোবাইল নম্বরে আবার ফোন করে ঠিকানাটি আবারও জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন এবং ফোন নম্বরটি ব্লক করে দেন।
অন্য নম্বর থেকে ফোন করা হলে পরিচয় পাওয়া মাত্রই সেই কলটিও কেটে নম্বরটি ব্লক করে দেন।
গুগল ম্যাপে খুঁজে এবং স্থানীয় বহু ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞেস করে মিরপুর-২-এর লাভ রোডে মনা হাউজিং-এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
Azhari Shop পেজে দেওয়া দুইটি নম্বর (01960553393 ও 01926302146)-এ যোগাযোগ করলে তারা Ginseng capsule পণ্যটি আসল এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এবং আজহারির তত্ত্বাবধানে প্রস্তুতকৃত বলে জানান। তবে সত্যিই যে পণ্যটি আজহারির তত্ত্ববধানে তৈরি তার পক্ষে কী প্রমাণ আছে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন এবং এরপর আর ফোন ধরেননি।
Azhari Dawa Shop BD. পেজে প্রদত্ত 01625313744 ফোন নম্বরে কল দিলে আশিকুর রহমান নামের একজন ব্যক্তি জানান, “আজহারি হুজুর এ পণ্যটি বিক্রি করছেন। এরপরেও কেন আপনি বিশ্বাস করছেন না? আমাদের লোকেশন বা বিস্তারিত আপনাদের বলব না, বিশ্বাস হলে কিনবেন না হলে বিরক্ত করবেন না।” এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
সতর্ক করেছেন মিজানুর রহমান আজহারি
গত ১৯ জানুয়ারি মিজানুর রহমান আজহারি এসব ভুয়া পেজের কার্যক্রমের বিষয়ে নিজের ফলোয়ারদের সতর্ক করে এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “সম্প্রতি কিছু কুচক্রী প্রতারক মহল সোশ্যাল মিডিয়াতে আমার ছবি, ভিডিও এবং এমনকি আমার ভয়েস ক্লোন করে ডিজিটাল মাধ্যমে নানা ধরণের প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরণের ভুয়া প্রোডাক্ট প্রমোশন, চিকিৎসা সেবা, বিশেষ করে ওষুধি পণ্যের অবৈজ্ঞানিক, বিভ্রান্তিকর ও বিব্রতকর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।”
তিনি আরও লিখেছেন, “এসব কন্টেন্ট দেখে, এআই সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন এমন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ভাই-বোনেরা আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। অনেকের মনে আমাদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। যা আমার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। এসব প্রচারণার সাথে আমার বা আমাদের ফাউন্ডেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার পরিচয় ব্যবহার করে এধরণের কোনো পণ্য বিক্রির চেষ্টা করা হলে তা সম্পূর্ণ ভুয়া এবং অনৈতিক। আশা করি, যে সকল চক্র এধরনের গর্হিত কাজে জড়িত— তারা অনতিবিলম্বে এসব অপকর্ম থেকে সরে আসবে। পরিশেষে শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে বিশেষভাবে অবগত করতে চাই— কোনো বিজ্ঞাপন দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার আগে আমাদের অফিশিয়াল সোর্স থেকে সত্যতা যাচাই করে নিন।”
জনাব আজহারি ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডাইরি (জিডি) করেন। জিডিতে তিনি লিখেছেন, “আমার নাম ব্যবহার করে অনলাইনে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু কুচক্রী মহল বিভিন্ন ধরণের প্রোডাক্ট বিক্রি করছে, যেগুলোর সঙ্গে আমার দূরতম সম্পর্ক নাই। … বিশেষ করে আমার ভয়েজ ক্লোন করে ডিজিটাল মাধ্যমে নানা ধরণের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, যা আমার জন্য বিভ্রতকর এবং সাধারণ মানুষের কাছে আমার ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে।”
এ বিষয়ে পল্টন থানার ওসি এবং জিডি তদন্তের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি।
এছাড়া দ্য ডিসেন্ট একটি চিঠি হাতে পেয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, গত ১৫ মার্চ বিটিআরসির চেয়ারম্যান বরাবর মিজানুর রহমান আজহারি তার নামে চলা একাধিক পেজের লিংক প্রদান করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছেন।
সংযুক্তি
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ভুয়া ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ফোন নাম্বার সমুহ দেখুন এখানে।