৫-৮-২০: শ্রমিক আন্দোলনে নিহতের মনগড়া সংখ্যা ছড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ

Suraiya Salsabil Mukta
লেখক
সুরাইয়া সালসাবিল মুক্তা
৫ নভেম্বর, ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে একের পর এক প্রাণহানির গুজব। কোথাও পোশাকশ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা, কোথাও পুলিশের গুলিতে ২০ জন , কোথাও  ৮ জন বা ৫ জন সহ একাধিক দাবি করা হচ্ছে 

এসব দাবির সঙ্গে প্রচারিত ছবি, ভিডিও ও তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, পুরোনো হত্যাকাণ্ডের ছবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও এবং ভিত্তিহীন তথ্য ব্যবহার করে গুজবগুলো ছড়ানো হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি দলের অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্ম থেকেও এসব অপপ্রচার চালানো হয়।

দ্য ডিসেন্টের যাচাই এ দেখা যায়, শ্রমিক আন্দোলনের নিহতের এসব পরিসংখ্যান ভিত্তিহীন। 

তবে, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে একজন নিহতের খবর পাওয়া যায়। গতকাল বুধবার (৪ নভেম্বর) দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনে এক পোশাকশ্রমিক গুরুতর আহত হলে মঙ্গলবার রাজধানীর উত্তরার এক হাসপাতালে মারা যান। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, একটি কারখানা বন্ধ করার জন্য বহিরাগত কিছু লোক সেখানে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করলে কর্তৃপক্ষ বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় বহিরাগতদের সঙ্গে কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এতে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এটি ছাড়া এই আন্দোলনে আর কোনো নিহতের ঘটনা ঘটনি।

আন্দোলনে একজন নিহতের তথ্য পাওয়া গেলেও থেমে নেই কাল্পনিক মৃত্যুর ভুয়া প্রচারণা। 

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ফেসবুক পেজ দৈনিক আজিকের কন্ঠ ডিজিটালে একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, চলমান গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনে গত ৫ দিনে নিহত ২০, আহত ২ হাজারের বেশি, গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক।

দেখুন এখানে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত গতকাল একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “কিছুক্ষণ আগে পুলিশের গুলিতে সাভারে একজন শ্রমিকের মৃ*ত্যু হয়েছে।”

দ্য ডিসেন্ট এর যাচাই এ দেখা যায়, ছবিটি বাগেরহাটে জমি সংক্রান্ত বিরোধে একজন নিহত ব্যক্তির। গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাগেরহাটের রামপালে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইয়ের হামলায় আহাদ আহমেদ (২৪) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হামলায় একজন নারী শ্রমিক নিহত হয়েছে দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীর স্বজনদের আহাজারির একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। 

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৬ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ার নোয়াপাড়ায় অবস্থিত ডেকো গ্রুপের আগামী ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় কাজ করার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুমি আক্তার (২৭) নামের এক নারী শ্রমিক। পরে তাকে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের উপ- স্কুল ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সাকিব আরেক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, “গাজীপুরে ৯ জন নিহত, নারায়নগঞ্জে ৫জন নিহত, সাভারে ৩জন নিহত।পুলিশের গুলিতে। এর পরও বসে থাকবেন।” 

আরেক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, “পুলিশের গুলিতে আশুলিয়ায় ৮ শ্রমিক নিহত।আহত শতাদিক।” 

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “হেমায়েতপুরে গুলি করে ৫ জন শ্রমিককে হত্যা।।”

‘Faceless Democracy - মুখহীন গণতন্ত্র’ নামের একটি ফেসবুক পেজ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে দাবি করা হয়,  গাজীপুরে পোশাকশ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, যুবলীগ সন্দেহে এক পোশাকশ্রমিককে বিএনপির সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে।

বাস্তবে, ছবিটি ফেনীর ছাগলনাইয়ায় গত জুনে সংঘটিত যুবলীগ নেতা জোবায়ের পারভেজ হত্যাকাণ্ডের; এর সঙ্গে সাম্প্রতিক পোশাকশ্রমিক বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক নেই।

একই দিন ‘Sajeeb Wazed Joy | এখন আর কারো আসমান কাঁপে না’ ও  ‘সিরিন শারমিন চৌধুরী’ নামের ফেসবুক গ্রুপ এবং ‘বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ’ ও ‘ছাত্রলীগ মুজিব সৈনিক’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে পোশাকশ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলির একটি ভিডিও প্রচার করা হয়।

পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

বাস্তবে, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। ভিডিওটি এর আগেও ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে প্রচারিত হয়েছিল।

 ‘সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল লিমন’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল এবং ‘প্রত্যাবর্তন ২০ জননেত্রী শেখ হাসিনা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও গাজীপুরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় দুই পোশাকশ্রমিক নিহত হওয়ার দাবি করা হয়।