খোকন দাসকে ‘ইসলামিস্ট মব’ হত্যা করেছে দাবিতে বিজেপির অসত্য প্রচার

খোকন চন্দ্র দাস | ছবি: সংগৃহীত
Mahbub A Rahman
লেখক
মাহবুব এ রহমান
৪ জানুয়ারী, ২০২৬

গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে বাড়ি ফেরার পথে হামলার স্বীকার হন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার তিলই গ্রামের খোকন চন্দ্র দাস। গতকাল শনিবার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

‘ইসলামিস্ট মব’ খোকন চন্দ্র দাসকে হত্যা করেছে দাবি করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশিমবঙ্গের এক্স ও ইন্সটাগ্রাম একাউন্ট এবং ফেসবুক পেইজ থেকে পোস্ট করা হয়। ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে বাংলায় এবং এক্স-এ ইংরেজিতে একই পোস্ট করা হয়েছে। 

পোস্টে বলা হয়েছে, ‘‘দিপু দাসের পর এবার খোকন দাস-ইসলামপন্থী উন্মত্ত জনতার নৃশংস হামলায় তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় আজ ভোরে তিনি মৃত্যুর কাছে পরাজিত হন। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়-এটি পরিকল্পিত বর্বরতার ফল।’’

পোস্ট ৩টি দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। 

বিজেপি ছাড়াও ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স একাউন্ট থেকেও ‘জিহাদি ইসলামিস্ট’ এবং ‘মুসলিম মব’ খোকন দাসকে হত্যা করেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। 

দেখুন এখানে, এখানে, এবং এখানে।  

ভারতীয় একাধিক মিডিয়াও ঘটনাটিকে ‘ইসলামিস্ট মব’ ও ‘মব’ এর দ্বারা সংগঠিত বলে প্রচার করেছে। 

দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। 

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে দাবিটি সঠিক নয়।

ঘটনার পর আহত অবস্থায় খোকন চন্দ্র দাস হামলাকারী দুইজনের নাম বলেছিলেন। তারা হলো- কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান (২৭) ও সামছুদ্দিন মোল্যার ছেলে রাব্বি মোল্যা (২১)। এছাড়া পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ওই ঘটনায় অংশ নেওয়া আরেকজনের নাম জানতে পারে। সে হলো- স্থানীয় সহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদার (২৫)। যাদেরকে ইতোমধ্যে গ্রেফতারও করা হয়েছে। 

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, আক্রমণটি ছিল ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে। 

ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক এ প্রতিবেদককে জানান, ‘‘আমাদের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করেছে। পরে চিনে ফেলাতে আগুন দিয়ে পোড়ানোর চেষ্টা করেছে।’’

দ্য ডিসেন্ট পুলিশ ছাড়াও খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রী, ফুফাতো ভাই ও স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষকের সাথেও কথা বলেছে।

খোকন চন্দ্র দাসের ছেলে শান্ত দাসকে ফোন করলে তিনি তার অভিভাকের সাথে কথা বলিয়ে দেবেন বলে ফোন রেখে দেন। পরে আবার ফোন করলে খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সীমা দাস ফোন ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের আশপাশের মুসলমানদের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক। ওর সাথে কারো কোনো পূর্ব শত্রুতা নেই। ওরা কীজন্য হামলা করলো বলতে পারি না, আমরা টাকা পয়সা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি।’’

খোকন চন্দ্র দাসের ফুফাতো ভাই নিখিল দাস বলেন, ‘‘ঘটনাটার মূল বিষয় ডাকাতিই। ওর কাছে আনুমানিক ৬ লক্ষ টাকা ছিল তখন। ঘটনার পরে টাকা পাইনি আমরা। ওদের একজনকে খোকন চিনে ফেলায় ওরে কোপ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।’’

স্থানীয় ২৯ নং কেউর ভাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এনাম মুন্সী বলেন, ‘‘এই ঘটনায় জড়িতরা মূলত বখাটে ও নষ্ট টাইপের ছেলে। মাদকাসক্ত হিসেবেও পরিচিত এলাকায়।’’

‘‘খোকনের লাশ বাড়িতে আনার পর আমাদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের হাজার হাজার মুসলমানরা ওর বাড়িতে এসেছে। সহমর্মিতা জানিয়েছে,’’ বলেন এনাম মুন্সী।

ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে থানায় একটি মামলা হয়। খোকন চন্দ্র দাসের চিহ্নিত করা ২জনসহ ৩ জনের নামে খোকনের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন। মামলার এজাহারে ‘দস্যুতা সংগঠনকালে গুরুতর আঘাত ও হত্যাচেষ্ঠা’ উল্লেখ করা হয়েছে। 

সুতরাং এ ঘটনায় ‘ইসলামপন্থী উন্মত্ত জনতা’ জড়িত দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয়।

(নিহত খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রী ও আত্মীয়দের বক্তব্য পাওয়ার পর সেগুলো সংযোজন করে স্টোরিটা আপডেট করা হলো।)