কল্পিত ‘প্রাইভেট মিলিশিয়া’: ভারতীয় ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ বিষয়ে ভুয়া খবর
নর্থইস্ট নিউজ নামে ভারতভিত্তিক একটি ওয়েবসাইটে গতকাল ৮ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আগামী ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি প্রতিরোধে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার উদ্যোগে ৯,০০০ সদস্যের বেসরকারি একটি 'মিলিশিয়া বাহিনী'কে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিয়ে মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে।

নর্থইস্ট নিউজ-এর প্রতিবেদনটি কপি করে অনেকে ফেসবুকে একই দাবি প্রচার করছেন।
তবে দ্য ডিসেন্ট-এর যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, নর্থইস্ট নিউজ-এর দেয়া খবরটি সত্য নয়।
প্রথমত, নর্থইস্ট নিউজ-এর প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ নামহীন সূত্রের ওপর নির্ভরশীল এবং দাবির পক্ষে কোন প্রমাণও হাজির করা হয়নি। নিকট অতীতে বাংলাদেশ বিষয়ে এমন নামহীন এবং প্রমাণহীন এমন অসংখ্য দাবি সন্দেহজনক (dubious) ওয়েবসাইটটি থেকে প্রচার করা হয়েছে, যেগুলো ফ্যাক্ট চেকাররা খণ্ডন করেছেন।
নর্থইস্ট নিউজ কর্তৃক ছড়ানো যেসব খবর অতীতে ফ্যাক্ট চেকাররা খণ্ডন করেছেন তেমন দুটি লিংক দেয়া হয়েছে এখানে এবং এখানে।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক একটি খবরকে বিকৃত এবং অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করেছে নর্থইস্ট নিউজ।
কল্পিত ‘প্রাইভেট মিলিশিয়া’ ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে– যার উপদেষ্টা হলেন আসিফ মাহমুদ সজীভ ভুঁইয়া– বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায় যে, ৯ হাজার তরুণ–তরুণীকে আত্মরক্ষার নানা কৌশল এবং আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
তবে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এখনও শুরু হয়নি।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উল্লিখিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আগামী ২২ নভেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হবে এবং ১১৪টি ব্যাচে পর্যায়ক্রমে মোট ৮,২৫০ জন যুব ও ৬০০ জন যুব নারীকে জুডো, কারাতে, তায়কোয়ানডো ও শ্যুটিং বিষয়ে আত্মরক্ষামূলক মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এ বিষয়ে বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে তরুণদের প্রশিক্ষিত করার জন্য এটি একটি পাইলট প্রকল্প।
আসিফ মাহমুদ বলেন, “এটা কোনো বাহিনী নয়, প্রশিক্ষণের পর তাদের কাউকে অস্ত্র দেওয়া হবে না। কোথাও রিক্রুটও করা হবে না। প্রশিক্ষণ শেষে তারা তাদের নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবেন। তাদের ডাটা থাকবে, যদি কখনো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেন তাদের ডাক দেওয়া যায়।”
অর্থাৎ, তরুণ–তরুণীদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সরকার হাতে নিলেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম– এমনকি কাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে সেটির যাচাইবাছাইও এখনও শুরুই হয়নি।
উপদেষ্টার পক্ষ থেকে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে কোনো মিলিশিয়া বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত বা আগ্নেয়াস্ত্র প্রদান করা হবে না।
ফলে, নর্থইস্ট নিউজ এর প্রতিবেদনে ‘আসিফ মাহমুদের উদ্যোগে ঢাকায় ১০-১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কর্মসূচি প্রতিরোধে ৯০০০ হাজার সদস্যের প্রাইভেট মিলিশিয়া বাহিনী মোতায়েন করা হবে’-- এই দাবি অসত্য এবং কল্পিত।
যেই ব্যক্তিগত পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শুরুই হয়নি (এবং শেষ হতে বহু মাস লাগবে) এবং যেটি কোন বাহিনী হিসেবে গঠিত হওয়ার ঘোষণা নেই সেটিকে ‘ইতোমধ্যে গঠিত মিলিশিয়া বাহিনী’ হিসেবে প্রচার করা উদ্দেশ্যেমূলক ভুয়া খবর বা ডিসইনফরমেশন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
ঢাকায় পুলিশের মহড়া
এদিকে বাংলাদেশে শীর্ষ দুই সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং বিডিনিউজ জানিয়েছে, গতকাল শনিবার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর ১৪২টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে একযোগে ‘বড় মহড়া’ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। প্রায় সাত হাজার পুলিশ সদস্য এ মহড়াতে অংশ নেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ৫ আগস্টের আগে সীমিত আকারে মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পুলিশের এমন মহড়া অনুষ্ঠিত হলো।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “এটা আমাদের নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া; ফোর্স মোবিলাইজেশনের একটা অংশ, যা নিয়মিতই হয়ে থাকে।” কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রস্তুতি কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই, এটা আমাদের নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়ার অংশ।”
প্রসঙ্গত, আগামী ১৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক শেখ হাসিনা এবং সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বিচারের রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষ্যে ১০ নভেম্বর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ১৩ নভেম্বর দেশব্যাপী লকডাউন কর্মসূচিও রয়েছে।