শরৎ হত্যার পেছনে ‘জিজিয়া কর’ দাবিতে অসত্য খবর প্রচার ভারতীয় মিডিয়ায়

শরৎ মণি চক্রবর্তী | ছবি: সংগৃহীত
Mahbub A Rahman
লেখক
মাহবুব এ রহমান
৭ জানুয়ারী, ২০২৬

গত ৫ জানুয়ারি রাতে নরসিংদীর পলাশে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে শরৎ মণি চক্রবর্তী (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।  শরতের মৃত্যুকে ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ায় নানা ধরণের ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বমূলক খবর প্রচার করা হয়েছে।  

এরকম কয়েকটি খবর দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। 

এসব রিপোর্টে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হচ্ছে, প্রাচীন আমলের ‘জিজিয়া’ করের মতো টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল শরৎকে। এরপরই তাকে হত্যা করা হয়। 

এবিপি আনন্দ ‘Bangladesh Situation: 'তোর বাবা নরেন্দ্র মোদি এলেও...', লাগাতার হুমকি, বাংলাদেশে এবার খুন ব্যবসায়ী যুবক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘‘বাপ্পাদিত্য সাফ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের মদতেই সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে হিন্দু হলেই মেরে ফেলা হতে পারে। শরৎকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বাপ্পাদিত্য। তিনি জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীরা শরতের থেকে মোটা টাকা দাবি করছিল। বাংলাদেশে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল তাঁকে। 'জিজিয়া' দিতে বলা হয় শরৎকে। পুলিশের কাছে গেলে স্ত্রীকে অপহরণ করার হুমকিও দেওয়া হয়। বাপাদিত্য বলেন, "দুষ্কৃতীরা বলে, 'চুপচাপ টাকা দিয়ে দে। বেশি চিৎকার করিস না। তোর ভারত বা তোর বাবা নরেন্দ্র মোদি এলেও জিজিয়া আদায় করা আটকাতে পারবে না'।’’

‘জিজিয়া দিতে অস্বীকার করায় হত্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিন্দু ভয়েস নামক একটি ওয়েবপোর্টালও একই দাবি করেছে।

এ প্রতিবেদনেও বাপ্পাদিত্যবসুর বরাতে লিখা হয়, ‘‘সেখানে সে পরিবারের এক ঘনিষ্ঠজন, প্রতিশোধের ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগেই শরৎকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা তার কাছে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করে এবং স্পষ্টভাবে জানায় যে, বাংলাদেশে হিন্দু হিসেবে বেঁচে থাকতে চাইলে তাকে জিজিয়া দিতে হবে; ইতিহাসে যা অমুসলিমদের ওপর আরোপিত ধর্মীয় সুরক্ষা কর হিসেবে পরিচিত। হুমকিগুলো ছিল দ্ব্যর্থহীন। তিনি যদি পুলিশের কাছে যান, তার স্ত্রীকে অপহরণ করা হবে। তিনি যদি প্রতিরোধ করেন, তাকে হত্যা করা হবে।  শরৎ টাকা দিতে অস্বীকার করেন এবং তাকে হত্যা করা হয়।’’

প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে। 

এসব ছাড়াও এ ঘটনায় প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজ- এর সম্পাদক বিতর্কিত সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী তার এক্স একাউন্ট ও উইকলি ব্লিটজ- এ মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন ছাপিয়েছেন। 

তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও ভুয়া খবর ছড়ানোর অতীত ইতিহাস নিয়ে গত ৩০ নভেম্বর দুই যুগ পুরনো ভুয়া খবর নিয়ে হঠাৎ সরব ভারতীয় মিডিয়া শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ডিসেন্ট। 

তিনি সরাসরি এই ঘটনায় ‘উগ্র সশস্ত্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের’ দায়ি করে প্রতিবেদন করেছেন। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত এক্স একাউন্টে তিনি দাবি করেন, “ঘটনার দুই দিন আগে উগ্র ইসলামপন্থীরা শরৎ চক্রবর্তী মানির কাছে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে, তাকে জানায় যে বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে চাইলে তাকে জিজিয়া দিতে হবে।”

উইকলি ব্লিটজের প্রতিবেদন ও শোয়েব চৌধুরীর এক্স পোস্ট দেখুন যথাক্রমে এখানেএখানে। 

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে এসব দাবির কোনো সত্যতা নেই। 

নরসিংদীর পলাশ থানার ওসি শাহেদ আল মামুন বলেন, ‘‘তাকে গুলি করে হত্যার সিসিটিভি ফুটেজ আমরা পেয়েছি। এটা সাম্প্রদায়িক হামলার কোনো ঘটনায় নয়। মূলত জমি নিয়ে বিরোধ থেকেই এমনটি ঘটতে পারে বলে আমরা প্রাথমিক তদন্তে পেয়েছি।’’ 

এ ব্যাপারে নিহত শরৎ চক্রবর্তীর স্ত্রী অন্তরা মূখ্যার্জি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আমার স্বামীর কাছে কেউ কখনও চাঁদা বা ‘জিজিয়া কর’ এমন কোনোকিছু কখনই চায়নি। এসব মিথ্যা। আমাদের অনুমান, জমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই তাকে হত্যা করা হতে পারে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘যেখানে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে আমাদের জমি কেনা আছে। আমার স্বামী প্রথমে তার এক বন্ধুর সাথে মিলে জমি কিনে বিল্ডিং করেছেন। প্রথমে জায়গাটি আমার শ্বশুড়ের নামে ছিল। পরে তার বন্ধু না চাওয়ায় তা আমার স্বামী নিজের নামে করেন। এরপর সম্প্রতি আমার স্বামী পাশে আরেকটি জমি কিনেছেন। সেটার রেজিস্ট্রেশন আমার শশুড়ের নামে করেছেন। এই বিষয়টি আমার স্বামীর বন্ধুর পছন্দ ছিল না। আমাদের ধারণা এসব কোনো বিষয় থেকে তাকে হত্যা করা হতে পারে।’’

নিহত মনির ভাই রনি চক্রবর্তীও দ্য ডিসেন্টের কাছে চাঁদা বা জিজিয়া চাওয়া বা হিন্দু হিসেবে আক্রমণের কথা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার কাছে বা ভাইয়ের কাছে কেউ কখনও চাঁদা দাবি করেনি। ভাইয়ের সাথে সবারই বেশ ভালো সম্পর্ক। সবাই উনাকে পছন্দ করতো।’’

সুতরাং, ভারতীয় বিভিন্ন মিডিয়ায় ‘জিজিয়া কর’ না দেওয়ায় হত্যা করা হয়েছে বলে যে প্রচার হচ্ছে তা মিথ্যা।