তদন্তে ব্ল্যাকমেলের জেরে হত্যার অভিযোগ, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বয়ান

The Dissent Desk
লেখক
দ্য ডিসেন্ট ডেস্ক
১ অক্টোবর, ২০২৬

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ জেলার বেগুনবাড়ি এলাকায় স্বর্ণালংকারের কারিগর নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার হত্যাকাণ্ডকে ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হত্যা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, এবিপি আনন্দ ও টিভি৯ বাংলার প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডটিকে বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তাহীনতা ও সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গে তুলে ধরা হয়।

বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনও ফেসবুকে এ বিষয়ে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন। 

নিরঞ্জনকে ত্রিশালের বাসিন্দা ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “সব হিন্দুকে কি মেরে ফেলবে মুসলমানরা?” পোস্টে হিন্দুদের জমি দখল, অর্থ লুট ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেন, “কোনও সুস্থ ও সভ্য মানুষ তো ওই হিংস্র, বর্বর ও অসভ্য মুসলমানের দেশে বাস করতে পারবে না। সম্ভব নয়।”

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধরের হত্যাকাণ্ডের পেছনে সাম্প্রদায়িক কারণ থাকার দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পিবিআইয়ের বরাতে বলা হয়, শামীম নামের এক ব্যক্তিকে ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল ও টাকা দাবি করার জেরে নিরঞ্জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরঞ্জনের চারটি অটোরিকশা ছিল। সেগুলো খাগডহর এলাকার একটি গ্যারেজে রাখা হতো। ওই গ্যারেজের ব্যবস্থাপক ছিলেন শামীম। সেখান থেকেই দুজনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার শামীমের জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত বাসায় না থাকায় শামীম তার ভাড়া বাসায় নারী নিয়ে আসতেন। এক নারীর সঙ্গে তার একটি অন্তরঙ্গ ভিডিও নিরঞ্জন ধারণ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ভিডিও দেখিয়ে নিরঞ্জন প্রায়ই শামীমের কাছে টাকা দাবি করতেন। টাকা না দিলে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিতেন। এভাবে কয়েক দফায় প্রায় দুই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পিবিআইয়ের বরাতে একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শামীমের ভাড়া বাসায় গিয়ে নিরঞ্জন আবার টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে দুজনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শামীম শিল দিয়ে নিরঞ্জনের মাথায় আঘাত করেন বলে অভিযোগ।

পরে নিরঞ্জনের মুখে কাপড় গুঁজে বটি দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

পিবিআই বলছে, হত্যার পর মরদেহ চটের বস্তায় ভরে একটি বড় নীল রঙের চালের ড্রামে রাখা হয়। ড্রামটি সরাতে হানিফ মিয়া নামের এক ইজিবাইকচালককে ডেকে আনা হয়। বাসার মালামাল সরানোর কথা বলে ড্রামটি ইজিবাইকে তোলা হয়। পরদিন রাতে সেটি বেগুনবাড়ি স্লুইসগেটের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

পিবিআই ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই তারা ছায়া তদন্ত শুরু করেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান আসামি শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির সঙ্গে কাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল, সেই সূত্র মেলাতে গিয়ে হত্যার জট খোলে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা–ও তদন্ত চলছে।

এ ঘটনায় শামীম মিয়াকে (৩৮) গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুগান্তরের প্রতিবেদনেও পিবিআইয়ের বরাতে একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির স্ত্রী সবিতা রানী ধর ২৬ সেপ্টেম্বর বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য নিরঞ্জনকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হত্যা করা হয়েছে—এমন দাবি সমর্থন করে না।