মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভুয়া খবর ছড়ালেন ছদ্মলেখক মহিউদ্দিন
‘আধুনিক গরুর রচনা সমগ্র’ বইয়ের ছদ্মলেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ গত ১১ সেপ্টেম্বর একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন। ফটোকার্ডে লেখা ছিল, ‘‘১ বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন এইডস রোগী ৪৬৮ জনের ৩৭৪ জনই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে অনেকের।’’
ফটোকার্ডে Chittagong Mirror এর একটি লোগো এবং “chittagongmirror.com’’ নামে একটি ওয়েবসাইটের নাম ছিল।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘‘এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়ানো জরুরী। সেদিন একজন সংসদ সদস্য লাইভ টকশোতে জানিয়েছেন, তার জেলায় (নওগাঁ) সিভিল সার্জন কর্তৃক দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী এইডস রোগীদের প্রায় সবাই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী।’’
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ ফেসবুক একাউন্ট থেকে দুইটি অসত্য তথ্য ছড়িয়েছেন। প্রথমত, ‘‘এক বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন এইডস রোগী ৪৬৮ জনের ৩৭৪ জনই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী।’’
দ্বিতীয়ত, এক সংসদ সদস্যের বরাতে লিখেছেন, ‘‘সেদিন একজন সংসদ সদস্য লাইভ টকশোতে জানিয়েছেন, তার জেলায় (নওগাঁ) সিভিল সার্জন কর্তৃক দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী এইডস রোগীদের প্রায় সবাই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী।’’
একই ফটোকার্ড ও তথ্যের বরাতে Monira Talks নামে একটি ফেসবুক একাউন্ট থেকে একটি সমালোচনামূলক ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। আরও কিছু ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে ও এখানে।
এক বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন এইডস রোগী সনাক্তের সংখ্যাটি ভুয়া
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ দাবি করেছেন, ‘‘এক বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন এইডস রোগী ৪৬৮ জনের ৩৭৪ জনই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী।’’
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস বা এসটিডি কন্ট্রোলের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে মোট এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৩০ জন। অর্থাৎ, গত এক বছরের মোট এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এটি।
আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮৩ জন।
এ বিষয়ে দপ্তরটির পরিচালক ডা. খায়রুজ্জামান দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘আমাদের প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে ফেসবুকে দাবি করা তথ্যের কোনো মিল নেই। ফেসবুকে প্রচারিত তথ্যগুলো সঠিক নয়।’’
সুনির্দিষ্ট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা সকল শিক্ষার্থীর সংখ্যা (মাস্টার্স পর্যন্ত) এক ক্যাটাগরিতেই রাখি। মাদ্রাসা-জেনারেল আলাদা ক্যাটাগরি থাকে না।’’
এদিকে প্রতিবছরের পহেলা ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসে বিগত এক বছরের তথ্য (নভেম্বর থেকে অক্টোবর) প্রচার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস বা এসটিডি কন্ট্রোল বিভাগ।
তাদের প্রচারিত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৮৯১ জন। যার মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত ছিল ৩৭৬ জন।
দপ্তরটির ওয়েবসাইটে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের ডাটার বিশ্লেষণ সংরক্ষিত আছে।
সীমান্ত জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ বেশি, পার্বত্য চট্টগ্রামে কম কেন’’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ মূলধারার জনগোষ্ঠী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা আর বাকি অংশ সাধারণ জনগণ। লিঙ্গ অনুযায়ী—পুরুষ ৮১ শতাংশ, নারী ১৮ শতাংশ এবং হিজড়া ১ শতাংশ। এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে সুচের মাধ্যমে মাদক নেওয়া ব্যক্তি, সমকামী, প্রবাসী কর্মী—এসব গোষ্ঠীই ছিল বেশি।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এর মতামত প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। তিনি মনে করেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা বেশি হওয়ার একটি কারণ এখানে টেস্ট বেশি হয়। চিকিৎসার জন্য এই দুই বিভাগের বড় শহরে সাধারণত মানুষ আসে। আবার এখানে মাদক, সমকামীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। আবার এই দুই বিভাগে প্রবাসী কর্মীর সংখ্যাও অনেক বেশি। এসব কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার বেশি।

ছবি: সারা বাংলাদেশে বছরভিত্তিক নতুন এইডস রোগীর সংখ্যা (সূত্র: জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল
সংসদ সদস্যের বরাতে ছড়ানো তথ্যটিও ভুয়া
নওগাঁয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এইডস রোগীর সংখ্যা নিয়ে সংসদ সদস্যের দাবি করা ভুয়া তথ্যের বরাতেও অসত্য ছড়িয়েছেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ।
গত ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল ডিবিসি টেলিভিশনের একটি টকশোতে দাবি করেছিলেন, ‘‘নওগাঁ জেলায় ১২ জনের এইচআইভি পজিটিভ এবং প্রত্যেকে মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকেন।’’
গত ২৩ আগস্ট দ্য ডিসেন্ট এই তথ্য অসত্য বলে ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছিলেন নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম ও বদলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানাও।
অস্তিত্ব নেই Chittagong Mirror এর
প্রচারিত ভুয়া ফটোকার্ডটিতে লোগো হিসেবে Chittagong Mirror ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ফটোকার্ডের chittagongmirror.com নামে কোনো ওয়েবসাইট উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যাচাইয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নামে একাউন্ট কিংবা ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া চ্যাটজিপিটি দিয়ে তৈরি ছবি শনাক্তকারী টুল ওপেন এআই ভেরিফাই ছবিটি চ্যাটজিপিটি দ্বারা তৈরি বলে চিহ্নিত করেছে।

আগেও ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছিলেন মহিউদ্দিন
গত ১৪ জুন অক্সফোর্ড ইউনিয়ন “ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান এবং বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে বক্তা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম, কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সহ অন্যরা প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।
এই অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে অসত্য দাবি করা হয়েছিল ‘মহিউদ্দিন মোহাম্মদ’ নামীয় ফেসবুক একাউন্ট থেকে। দাবি করা হয়েছিল, এনসিপি এবং জামায়াত-শিবিরের লোকজন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলরুম ভাড়া নিয়ে নিজেরাই ওই অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, এই অনুষ্ঠানটি অক্সফোর্ড ইউনিয়নই আয়োজন করেছিল। সেক্ষেত্রে তারা অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতা নিয়েছিল।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ তার পোস্টে প্রমাণ হিসেবে পোস্টের কমেন্টে একটি স্ক্রিনশট যুক্ত করে দাবি করেছেন, ‘‘অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ডিবেটিং চেম্বার আগামী ১৩ আগস্ট ২০২৬ বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত 'Mohiuddin Mohammad Fan Club UK' ২০৪৮ পাউন্ড ফী'র বিনিময়ে ৩৮ হাজার টাকা)। অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া রিজার্ভেশন নাম্বার R19721053’’
স্ক্রিনশটে দেখা গিয়েছেল, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মোট ৪ ঘন্টার জন্য ডিবেটিং চেম্বার বরাদ্দ নিয়েছেন মহিউদ্দিন।
তবে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের রুম ভাড়া নেওয়ার অপশনে গিয়ে দেখা গেছে, ওইদিন দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত (মোট ১ ঘন্টা) সময় ছাড়া বাকি সব সময়ই বুকিংয়ের জন্য ফাঁকা রয়েছে। অর্থাৎ মহিউদ্দিনের উল্লেখিত ভাড়া নেওয়ার সময়সীমা বুকিং এর জন্য ফাঁকাই ছিল।
এই নিয়ে দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদন দেখুন এখানে।