ডেইলি স্টার প্রতিবেদনের তথ্য বিকৃত করে প্রকাশ করলো রোকেয়া কালেক্টিভ
নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংবাদমাধ্যম রোকেয়া কালেক্টিভ ২৫ অক্টোবর “জিম জোন্স থেকে পিনাকী: আনুগত্যের অ্যালগরিদম” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনটিতে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পত্রিকার অফিসে হামলার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সাংবাদিক নাজিয়া আফরিনের লেখা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, “ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম আলোতে হামলার পর রাত ১২টা ২০ মিনিটে পিনাকী ভট্টাচার্য পোস্ট দিয়ে সবাইকে ডেইলি স্টারের দিকে আসার ডাক দেন।”
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা, রোকেয়া কালেক্টিভ-এর এই দাবি অসত্য।
প্রকৃতপক্ষে, প্রথম আলোতে হামলার পর রাত ১২টা ২০ মিনিটে পোস্ট দিয়ে সবাইকে ডেইলি স্টারের দিকে আসার ডাক দেয়া ব্যক্তিটি পিনাকী ভট্টাচার্য নন। বরং প্রবাসী আরেক ইউটিউবার ও এক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসেন এই আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন।
ডেইলি স্টারের যে বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে রোকেয়ো কালেক্টিভ উপরের দাবিটি করেছে সেই বিশ্লেষণেও আলোচ্য আহ্বানের জন্য পিনাকী ভট্টচার্যকে নয়, ইলিয়াস হোসেনকে দায়ী করা হয়েছে।
তবে উল্লেখ্য যে, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে হামলার আগে প্রবাসী দুই ইনফ্লুয়েন্সার পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেন দীর্ঘদিন ধরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বিষয়ে প্রচার চালিয়েছেন। ২০২৫ এর মার্চ মাসে প্রথম আলোর অফিসের সামনে জিয়াফত কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছিল যেটির পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছিলেন পিনাকী ভট্টাচার্য। তখন অবশ্য সেখানে কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
যা বলা হয়েছে ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে
২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ডেইলি স্টার এবং তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ডিসমিসল্যাব এক যৌথ প্রতিবেদনে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার অফিসে হামলার উসকানিমুলক বিভিন্ন পোস্ট ও ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করেছে।
ডিসমিসল্যাব ও ডেইলি স্টারের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “প্রথম আলোর ওপর হামলা শুরুর ১৫ মিনিট পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশি ইনফ্লুয়েন্সার ইলিয়াস হোসাইন সেই রাতে প্রথম সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানান। মধ্যরাতে তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘সবাই প্রথম আলোয় আসেন। অর্ধেক কাজ শেষ বাকিটা আপনারা করেন’। মাত্র এক ঘণ্টায় পোস্টটিতে প্রায় ৭৭ হাজার প্রতিক্রিয়া আসে।
একসময়ের সাংবাদিক ইলিয়াস পাঁচ মিনিট পর আরেকটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘প্রথম আলোর একটা ইটও যেন না থাকে।’
একই সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মব প্রথম আলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এর পাঁচ মিনিট পর আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘প্রথম আলোকে বাঁচাতে ওদের অফিসের সামনে সেনাবাহিনী আসলে ওদেরকে উচিত জবাব দেওয়ার অনুরোধ থাকল।’ এই পোস্টটি আগের প্রতিটি পোস্টের চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পায়।
১৯ ডিসেম্বর রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি পোস্ট করেন, ‘প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসেন।’
ওই পোস্টের চার মিনিটের মধ্যে দ্য ডেইলি স্টারের কর্মীরা ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে নিচে নামেন। কিন্তু ততক্ষণে মব জড়ো হয়ে ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছিল। ডেইলি স্টারের কর্মীরা দ্রুত আবার ওপরে উঠে ছাদে আশ্রয় নেন। প্রচণ্ড ধোঁয়ার মধ্যে তাঁরা ভোররাত ৪টা পর্যন্ত আটকে ছিলেন।”
ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, “পিনাকী ভট্টাচার্য একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সে অবস্থান করছেন এবং ফেসবুকে তার অনুসারী সংখ্যা ৩১ লাখ। তিনি ওই গ্রুপের অ্যাডমিন নন। সহিংসতার সময় কোনো উসকানিমূলক পোস্টও তিনি করেননি। যদিও দীর্ঘদিন ধরে তিনি দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কড়া সমালোচক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে দুটি পত্রিকাকেই ভারতপন্থী আখ্যা দিয়ে আসছেন।”
প্রতিবেদন দেখুন এখানে:
দ্য ডিসেন্ট প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এর অফিসে হামলার আগে বা ওই সময়ে সরাসরি হামলার আহ্বান জানিয়ে করা কোন পোস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের প্রোফাইলে পায়নি।
তবে হামলা চলাকালীন রাত ১২টা ১২ মিনিটে পিনাকী এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “ফ্যাসিস্টের আস্তানা বাংলাদেশে রাখব না।”
এর ৫ মিনিট পর রাত ১২টা ১৭ মিনিটে তিনি আরেক পোস্টে লেখেন, “শোককে শক্তিতে পরিণত করুন। ধ্বংস নয়, ধৈর্য ধরুন। শান্ত থাকুন। হাদির মরদেহ এখনো আসেনি দেশে। সারা দেশের মানুষ শোকাহত। আমরা ফ্যাসিস্টদের আস্তানা রাখব না বাংলাদেশে—এইটা একটা দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই। বিজয়ের লক্ষ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিন। সেটাই হবে হাদির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”
রাত ১২টা ৫৩ মিনিটে এক ভিডিও বার্তায় তিনি ডেইলি স্টারে আটকা পড়া সাংবাদিকদের উদ্ধার করতে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার অনুরোধ করেন। তিনি লেখেন, “ডেইলি স্টার ভবনে অনেক সাংবাদিক আটকা পড়েছেন। সেনাবাহিনীকে সবাইকে উদ্ধার করতে দিন। সবাই শান্ত থাকুন। সকল প্রকার হঠকারী কাজ থেকে বিরত থাকুন। আমাদের রাজনৈতিক লড়াই দীর্ঘ।”
রাত ১টা ১১ মিনিটে আরেক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “দিল্লি স্টার আমাদের আদর্শিক শত্রু। এসব গুজব ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে আমাদের আদর্শিক ফাইট জারি থাকবে। কিন্তু ভবন ও কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা হঠকারী কাজ। সাংবাদিক জায়মা ইসলাম ভেতরে আটকা পড়ে আছে। সবাইকে অনুরোধ, যেন তাকে দ্রুত উদ্ধার করতে সহযোগিতা করা হয়।”
১৯ ডিসেম্বর রাত ১টা ৩৪ মিনিটে তিনি আরেক পোস্টে সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ করেন।
প্রসঙ্গত, রোকেয়া কালেক্টিভ নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি নিউ মিডিয়া, যেটির চেয়ারম্যান শেখ সাবিহা আলম বর্তমানে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির ঢাকা ব্যুরো চিফ।