কালের কণ্ঠের টকশোতে উপস্থাপিকা ও দুই অতিথি মিলে ভুয়া খবরের উৎসব
গত ৭ জুলাই ২০২৬ কালের কণ্ঠের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে “রাজনীতি কি রাজনীতিবিদদের হাতে?” শিরোনামের একটি টকশো প্রচার করা হয়। ৪৬ মিনিটের টকশোতে অন্তত তিনটি অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করা সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মওলা রনি, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল এবং উপস্থাপক জেনিসিয়া বর্ণা।
টকশোর ৩০ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের দিকে মাসুদ কামাল দাবি করেন, গত ৬ জুলাই সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার ঘটনায় আটক দুই ব্যক্তি এনসিপির লোক।
তিনি ওই টকশোতে এনসিপির সমাবেশে হামলার প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘‘সর্বশেষ আজকে সকালে দেখলাম যে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দুইজনকে নাকি আটক করা হয়েছে। এবং দুইজনই নাকি এনসিপির লোক। এটা ওখানকার ওসি বলছে।’’
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, এনসিপির সমাবেশে হামলার ঘটনায় আটক দুই ব্যক্তি এনসিপির নয়; দুজনই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগের সাথে যুক্ত।
ওই দুই ব্যক্তিকে আটকের পর একাধিক সংবাদমাধ্যমে তার রাজনৈতিক পরিচয়সহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী দুই ব্যক্তির নাম মো. নূরুল ইসলাম ও মো. সজিব এবং দুজনই যুবলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। গত ৭ জুলাই যুগান্তরে প্রকশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘গ্রেফতার দুইজন হলেন- মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও একই ইউনিয়নের আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও অপরজন যুবলীগ কর্মী।’’
এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে মাসুদ কামালের ফোন নম্বরে কল করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্য়াপে কল গেলেও রিসিভ হয়নি। মেসেজ দেওয়া হলে সেটিও সিন হয়নি।
টকশোটির ৩৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের পর উপস্থাপিকা জেনিসিয়া বর্ণা মাসুদ কামালকে প্রশ্ন করেন, “ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচনের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন জনগণের মধ্যে সিগারেট বিতরণ করছেন। সিগারেট একটি মাদকব্য আমরা যতদূর জানি। তাহলে একজন জামায়াত নেতা আসলে কিভাবে সেটি বিলি করেন এমন প্রশ্ন জনগণের মনে উঠেছে। আপনার কাছে এর উত্তর জানতে চাই।”
জবাবে মাসুদ কামাল বলেন, “আমি তো মনে করি সিগারেট যেটা বিলি করছেন, সিগারেট ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এটা তো একটা নেশা। এটা তো আপনি বিলি করতে পারেন না। কিন্তু এটা করছেন। এই ধরনের স্ববিরোধিতা।
জামায়াতের আমিরের যুক্তরাষ্ট্রকে প্রশংসা ও ধন্যবাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে মাসুদ কামাল আরো বলেন, “এখন উনি যদি এটা করতে পারেন (যুক্তরাষ্ট্রকে প্রশংসা ও ধন্যবাদ দেওয়া) মেয়র পদপ্রার্থী সিগারেট বিলাইছে ভাই সমস্যাটা কী? গাঞ্জা বিলাইলে সমস্যাটা কী। উনি যদি জানেন সিগারেট বিলাইলে ইলেকশনে দুইটা ভোট বেশি পাব ওরা তাই করবে। এটাকে ইসলাম সমর্থন করে কি করে না, নৈতিকতা সমর্থন করে কি করে না, এটা উনার দেখার ব্যাপার না। উনার দেখার ব্যাপার হল আমার দুইটা ভোট বাড়তি পাইতে হবে। এগুলি ঠিক না।”
কিন্তু দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, উপস্থাপিকা এবং মাসুদ কামালের দাবি সত্য নয়। ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সিগারেট বিতরণ করেননি। মূলত এগুলো ছিলো সিগারেটের প্যাকেটের আদলে তৈরি মাদকবিরোধী সচেতনামূলক আহ্বান সম্বলিত লিফলেটের প্যাকেট।
এই বিষয়ে জানতে উপস্থাপিকা জেনিসিয়া বর্ণার ফোনে কল করা হলে প্রথমে কলটি রিসিভ হয়নি। পরে তিনি কল ব্যাক করেন এবং দ্য ডিসেন্টের পরিচয় শুনে কল কেটে দেন। পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা হলেও সিন করেননি এবং এবং ভিন্ন আরেকটি নম্বর থেকে কল করা হলে সেটিও রিসিভ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ১৪ মার্চ ২০২৫ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে লাইভ সম্প্রচারের সময় এখন টিভির নিউজরুমের একটি অফ-এয়ার কথোপকথন সম্প্রচারে চলে আসে। ভিডিওতে মাগুরায় গণধর্ষনের শিকার শিশু আছিয়ার জানাজায় হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমের যাওয়ার প্রসঙ্গে এক নারী কণ্ঠকে বলতে শোনা যায়, “শুয়োরগুলো গেলেই কী, না গেলেই কী।" পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ছড়িয়ে পড়ে, ওই কণ্ঠটি এখন টিভির নিউজরুম এডিটর ও উপস্থাপিকা জেনিসিয়া বর্ণার। দ্য ডিসেন্ট এখন টিভির একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে, এ ঘটনার পর জেনিসিয়া বর্ণাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিলো।
এছাড়াও টকশোটির ৪৭মিনিট ৩০ সেকেন্ডের দিকে উপস্থাপিকা গোলাম মওলা রনিকে প্রশ্ন করেন, “আমরা জানতে পারলাম বা এমন তথ্য উঠে এসেছে যে জুলাই আন্দোলনের সময় অনেক রোহিঙ্গাও কিন্তু ঢাকায় এসেছিলেন এ বিষয়ে আপনার কাছ থেকে একটু জানতে চাই এমন একটি প্রতিবেদন কিন্তু আসলে আমরা দেখেছি যদি ভুল না করি কানাডার একজন এমপি সেই প্রতিবেদনটি করেছেন।”
উত্তরে গোলাম মাওলা রনি বলেন, “যখন একটা আন্দোলন হয়। এরকম একটা বড় ১৭ বছর একটা মানে অথরিটির পতন হয়, তখন অন্যান্য সরকারগুলো চিন্তিত থাকে যে এটা কেন হলো। ওখান থেকে নিয়ে কিন্তু গবেষণা হয়। তো সেই গবেষণায় অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, কানাডিয়ান একজন আমাকে আজকেই জানালো খুব একটা রিজনেবল লোক জানালেন যে, কানাডার একজন সাবেক সংসদ সদস্য এ কথা বলছিলেন যে, কানাডিয়ান গভর্মেন্টের একটা ইন্টারনাল রিপোর্ট যে, এই সময়টিতে অর্থাৎ ট্রাক ভরে ভরে কক্সবাজার থেকে এই রোহিঙ্গাদেরকে আনা হয়েছে। সত্য-মিথ্যা জানিনা।”
বক্তব্যের বিষয়ে গোলাম মওলা রনিকে কল করা হলে তিনি বলেন, “এটা আমাকে কেউ সরাসরি বলেনি। আমি শুনেছি, একজন সাবেক কানাডিয়ান এমপি এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। তবে সেটি সত্য না মিথ্যা, আই ডোন্ট নো।”
রিপোর্টটি কোথায় জমা দেওয়া হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি তা জানি না। সেখানকার একজন পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, একজন সাবেক কানাডিয়ান এমপি এটা নিয়ে কাজ করেছেন এবং এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছেন। এভাবে আরকি আমাকে বললো। আমি টকশোতেও বলেছি, বিষয়টি সত্য না মিথ্যা, আই ডোন্ট নো। তবে এ ধরনের কথাবার্তা বা গুজব দেশের বাইরে হচ্ছে, যেটা আমরা বাংলাদেশে বসে সবসময় জানতে বা বুঝতে পারি না।”
অধিকতর যাচাইয়ে জন্য যে পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট তাকে এই তথ্যটি দিয়েছেন তার নাম এবং সেই কানাডিয়ান সাবেক এমপির নাম জানতে চাইলে রনি বলেন, “ওটা তো এভাবে বলা যাবে না। আপনি অফিসে আসেন, আগে আপনার পরিচয় নিশ্চিত করি, তারপর আমি তাঁর নাম-ঠিকানা দেব।”
প্রতিবেদক নিজের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পুনরায় দিলে তিনি বলেন, “কেউ যখন আমাকে একটা কথা বলে, তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে তার নাম, নম্বর বা অন্যান্য তথ্য আপনাকে বলে দিতে পারি না।”
তবে সংশ্লিষ্ট কী-ওয়ার্ড সার্চ করে কানাডা সরকারের ওয়েবসাইট, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কিংবা বাংলাদেশের কোনো সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।