‘ধর্ষণের শিকার’ শিশুকে ভিডিওতে দেখাল দৈনিক ইনকিলাব সহ একাধিক অনলাইন পোর্টাল
গত ২৬ আগস্ট ঢাকার সাভারে সাত বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিক্ষক ও ছয় ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভূক্তভোগীর বাবা। মামলায় এক শিক্ষক ও পাঁচ ছাত্রের বিরুদ্ধে ধর্ষণ; বাকিদের নামে ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ঘটনার পর বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। দেশের অধিকাংশ মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে কোথাও থানার ছবি, কোথাও প্রতিকী ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে দৈনিক ইনকিলাব, এখন টিভি বাংলা, ডেইলি সত্যপ্রকাশ, বিনিউজ২১ সহ একাধিক অনলাইন পোর্টালে সরাসরি ভূক্তভোগী শিশুর ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
ভিডিওতে শিশুটিকে নির্যাতনের বর্ণনা দিতে দেখা যায়। প্রায় পুরো ভিডিওজুড়েই বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুটির শরীর, মুখ, হাত ও পা দেখানো হয়। ভূক্তভোগী শিশুটির মেডিক্যাল রিপোর্টের কপিও দেখানো হয় এসব প্রতিবেদনে। এই ক্ষেত্রে সংমাধ্যমগুলো কোনো নীতিমালা অনুসরণ করেনি।
ইনকিলাবের অফিশিয়াল ফেসবুকে পেইজে গত ৩১ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৪ মিনিটে ভিডিওটি প্রথমবার পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “৭ বছরের মাদ্রাসাছাত্রকে ব’লা’ৎকারের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে।” এই ভিডিওটি বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নজরে আসে দ্য ডিসেন্টের।
তবে বিকেল বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে ভিডিওটি সম্পাদনা করে শিশুটির মুখ ব্লার করে রিপোস্ট করে ইনকিলাব। আগের ভিডিওটি ততক্ষণে ফেসবুকে ছড়িয়ে গেছে এবং অনেকেই সেটা ডাউনলোড করে রিপোস্ট করেছেন।
তবে দ্য ডিসেন্টের খুঁজে পাওয়া অন্য অনলাইন পোর্টলগুলোতে বিকেল ৫টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিও অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ, ভূক্তভোগী শিক্ষর্থীর চেহারা স্পষ্ট দেখানো অবস্থায়ই আছে প্রতিবেদনগুলোতে।
এর আগেও বিভিন্ন সময় দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম ভূক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করেছিল।
ধর্ষণের শিকার শিশুর পরিচয় প্রকাশ নিয়ে কী বলছে আইন?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, সংবাদ মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর পরিচয় প্রকাশের ব্যাপারে বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এই ধারা মতে, নির্যাতনে শিকার নারী বা শিশুর তথ্য, নাম, ঠিকানা, ছবি বা অন্য তথ্য সংবাদপত্র বা অন্য কোন সংবাদমাধ্যমে বা অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ করা যাবে না, যাতে ওই নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ পায়।
এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে দায়ী ব্যক্তিগণ প্রত্যেকে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ডে বা অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ ধারায় হত্যা বা মৃতদের বিষয়টি স্পষ্ট করা নেই বলে মনে করেন অনেকেই নাম, পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে৷ তবে ২০২১ সালের ৮ মার্চ উচ্চ আদালত এক রিটের আদেশে বলেছেন, ‘‘ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার কোনো নারী বা শিশু সে জীবিত বা মৃত হোক কোনো অবস্থায়ই তার ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না৷’’
এছাড়া বিচারাধীন কোনো শিশুর ছবি প্রকাশে বাঁধা আছে ২০১৩ সালের শিশু আইনেও। আইনটির ৮১ ধারা অনুযায়ী, বিচারাধীন কোন মামলা বা বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম অথবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোন শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী এমন কোন প্রতিবেদন, ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা যাইবে না, যার দ্বারা শিশুটিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়।
এই বিধান লঙ্ঘন করিলে দায়ী ব্যক্তি অনধিক ১ (এক) বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
কোন কোম্পানী, সমিতি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বিধান লঙ্ঘন করলে তাদের নিবন্ধন অনধিক ২ মাসের জন্য স্থগিত রাখাসহ অনধিক ২ লক্ষ টাকা জরিমানা আরোপ করা যাবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারায় ওই আইনের অধীন কোনো অপরাধের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ করে এমন তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভুক্তভোগীর ছবিও অন্তর্ভুক্ত।’
তিনি বলেন, ‘‘হাইকোর্টও ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির নাম, ছবি বা পরিচয় শনাক্ত করা যায় এমন কোনো তথ্য প্রকাশ না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।’’
“শুধু মুখমণ্ডল ব্লার করে দিলেই আইনসম্মত হয়ে যায় না। ছবিটি কিংবা ছবির সঙ্গে প্রকাশিত অন্য কোনো তথ্যের মাধ্যমে যদি ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে তা আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই সবচেয়ে নিরাপদ ও আইনসম্মত পদ্ধতি হলো ভুক্তভোগীর ছবি বা পরিচয় শনাক্তকারী কোনো তথ্যই প্রকাশ না করা।”
ব্যারিস্টার ইমরান আরও বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে মূল সমস্যা আইনের প্রয়োগ। আইনে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে এ ধরনের লঙ্ঘন ঘটছে। কোনো সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের তথ্য প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে প্রকাশিত উপাদান সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’’
এই জেষ্ঠ্য আইনজীবী আরও বলেন, ‘‘মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও নিজস্ব সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত, যাতে কোনো প্রতিবেদন বা ছবির মাধ্যমে ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার নারী কিংবা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।’’