রংপুরে ৪ খুন: ‘মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি’ খবর দিয়ে যেভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে মিডিয়া
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় ২২ আগস্ট দিবাগত রাতেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর হত্যায় অভিযুক্তরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার আগে পরে ইয়াবা সেবনের স্বীকারোক্তি দেয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ২৩ আগস্ট রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে হত্যা করা হয় তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে।”
পুলিশের এ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, “হত্যার পর তারা দুজন গণপতির বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। পরে ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন।”
গ্রেপ্তারের অষ্টম দিনে গতকাল রোববার দুপুরে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের জন্য প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
আজ সোমবার দুপুরে চিকিৎসকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর রংপুর মহানগর ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তার দুই যুবকের ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি।
প্রস্রাবে মাদক সেবনের প্রমাণ থাকে সর্বোচ্চ ৭ দিন: চিকিৎসক
ডোপ টেস্টের ফলাফল প্রকাশের পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ইয়াবা বা এমফিটামিন মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত করতে সেবনকারীর প্রস্রাবের নমুনা অবশ্যই ৭ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে হবে। ৭ দিনের বেশি সেবনকারীর প্রস্রাবে মাদক সেবনের প্রমাণ থাকে না।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হক দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, “এমফিটামিন (স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজক বা স্টিমুলেন্ট ওষুধ যা ইয়াবা নামক মাদকে থাকে) অনেকদিন পর্যন্ত রক্তে বা মূত্রে থাকে না, প্রস্রাবে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন থাকে, এরপরে আর পাওয়া যায় না। বিধায় যেহেতু এরা সাত দিনের বেশি সময় ধরে আটক অবস্থায় আছে, তাই মাদক গ্রহণ করতে পারে নাই। বিধায় এই টেস্টটা নেগেটিভ আসছে। এটা আসাটাই স্বাভাবিক, কারণ সাত দিনের বেশি হলে এটা প্রস্রাবের ভেতরে পাওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “উচিত ছিল আটকের পরপরই নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা।”
ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী দ্য ডিসেন্টকে বলছেন, “এত দিন পর প্রস্রাব পরীক্ষায় আগে সেবন করা মাদকের উপস্থিতি সাধারণত শনাক্ত হয় না। ফলে পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, অভিযুক্তরা হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে মাদক সেবন করেননি।”
তিনি আরও জানান, প্রমাণ সংগ্রহের জন্য এবার অভিযুক্তদের চুল থেকে স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করা হবে।
মিডিয়ার রিপোর্টে এই ব্যাখ্যাটি নেই, তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি
রংপুরে পুলিশ ডোপ টেস্টের ফলাফল ঘোষণার পর আজ দেশের শীর্ষ স্থানীয় মিডিয়াগুলো এ নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে। তবে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রস্রাবে মাদকের উপস্থিতির প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসক ও পুলিশের দেয়া ব্যাখ্যাটুকু এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
কোন কোন মিডিয়ার রিপোর্টে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়ার বিষয়ের সাথে পুলিশের দেয়া আগের তথ্যের (অভিযুক্তরা মাদকাসক্ত) গরমিলের প্রমাণও খুঁজেছে।
যেমন ঢাকা ট্রিবিউন লিখেছে, “নেগেটিভ ডোপ টেস্ট রেজাল্ট এই হত্যাকান্ডের পিছনে পুলিশের বর্ণিত কারণকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।”
“রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুন: সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের ডোপ টেস্টে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি”
শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে একাত্তর টিভি। সংবাদমাধ্যমটি ফটোকার্ডে বা পোস্টের ক্যাপশনে বিস্তারিত কোনো কিছু লিখেনি।
একাত্তর টিভি ছাড়াও একাধিক সংবাদমাধ্যম ‘‘রংপুরে ৪ খুনে জড়িত সিদ্ধার্থ-মুগ্ধের ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি’’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। তবে সংবাদগুলোতে কোথাও ডোপটেস্ট নেগেটিভ আসার কারণ হিসেবে চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
সংবাদমাধ্যমগুলো হলো– ডেইলি স্টার, কালবেলা, কলের কণ্ঠ, মানবকণ্ঠ, একাত্তর, ডেইলি ক্যাম্পাস, দেশ রূপান্তর, বিডিনিউজ, ইত্তেফাক, ঢাকা মেইল, খুলনা গেজেট, সিলেট ভিউ, নিউজনাও, বাংলাদেশ জার্নাল, খবর সংযোগ, ঢাকা ট্রিবিউন, সমকাল, সময়ের আলো, এটিএন নিউজ, করতোয়া, ভোরের কাগজ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই মাত্র ও দ্য ওয়ালের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও কারণ লেখা হয়নি।
তবে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম শিরোনামে মাদকের উপস্থিতির প্রমাণ না পাওয়ার কারণটি না বললেও ভেতরে সেটি উল্লেখ করেছে। এমন কয়েকটি সংবাদমাধ্যম হলো, প্রথম আলো, বাংলা স্ট্রিম, আজকের পত্রিকা, ঢাকা পোস্ট, এখন টিভি, আমার দেশ ও একুশে টিভি।
সংবাদের সূত্রে সামাজিকমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর পোস্ট
সংবাদমাধ্যমগুলোতে আংশিক খবর প্রচারের পর ফেসবুকে অনেকে গ্রেফতার হওয়া দুজনের ঘটনাকেও ‘সাজানো নাটক’ ও ‘জুলুম’ বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের রংপুর জেলার কার্যকরি সদস্য Aninda Awual লিখেছেন, “ডোপ টেস্টে অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাস নেগেটিভ প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে গণপতি চক্রবর্তী স্যারের পরিবারে ০৪ খুনের ঘটনায় প্রকৃত আসামি কারা? কারা সেই প্রভাবশালী, ভূমিদস্যু, ক্ষমতাবান,কালো টাকার মালিক--দেশের মানূষ জানতে চায়। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়। বিরোধীপক্ষ অপেক্ষা করছে, সরকার যেনো ভূল করে। মানুষের দাবি-- গণপতি চক্রবর্তী স্যারের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের ধরে সরকার যেনো ন্যায় বিচার করেন।’’
দূর্বার ৭১ পেইজে একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘‘ডোপ টেস্টে যখন মাদকের কোনো উপস্থিতিই পাওয়া যায়নি, তবে পুলিশের সেই ইয়াবা-তত্ত্বের ভিত্তি কোথায়? যদি মাদক সেবনের গল্পই সত্য না হয়, তাহলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে আটক রাখার যৌক্তিকতা কী? বরং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এখানে কি ‘জজ মিয়া নাটক’-এর মতো কোনো সাজানো গল্প দাঁড় করানো হয়েছে? কারও ওপর দায় চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে!’’
Abu Ryhan Tanin এশিয়া পোস্টের খবর শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘‘রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এই দুইটা ছেলে ও তাদের পরিবারের সঙ্গে রাষ্ট্র চরম জুলুম করছে।’’
সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর বিডিনিউজের ফটোকার্ড শেয়ার করে লিখেছেন, ‘‘তাহলে পাবলিক যে বলছিল এটাও আর একটা জজ মিয়া নাটক, সেটাই সত্য? কিন্তু এই নাটক কার স্বার্থে?’’