Amini, Who Led the Killings, Says, “I Have No Regrets, I am proud”

15 October 2026

গত মঙ্গলবার সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় পিটিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। শামীমের পরিবার জানিয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না এবং খুলনা ও ঢাকায় একাধিকবার মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। 

হামলার ঘটনায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কারী ফজলুল হক আমিনী নামক এক ব্যক্তি। যিনি পেশায় ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক। তিনি জানান, সুযোগ পেলে ‘প্রক্সিতে ইমামতি’ও করেন।

শামীমকে হত্যার শপথ নিয়ে ফেসবুক লাইভ করেন আমিনি

শামীমকে হত্যার আগে ও পরে আমিনী তার ফেসবুক প্রোফাইলে বেশ কয়েকটি ভিডিও ও ছবি পোস্ট করেছেন। এসব ভিডিওর বক্তব্য ও ছবির ক্যাপশনে স্পষ্টভাবে তিনি শামীমকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার দুপুর ৩টা ৩১ মিনিটে শুরু করা একটি ফেসবুক লাইভে আমিনী বলেন, “ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই দিতে হবে। আল্লাহ, রাসুল, সাহাবি ও কোরআনকে নিয়ে যে অবমাননাকর উক্তি করেছে, তার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি শপথ গ্রহণ করলাম, তাকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই দুনিয়া থেকে বিদায় করার জন্য আমি সংকল্পবদ্ধ। আমার সঙ্গে যারা এই সংকল্পে অংশগ্রহণ করতে চান—আল্লাহ রব্বুল আলামিন, রাসুল, কোরআন, সাহাবি ও ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে যে বিষোদ্গার করেছে, তাকে অবশ্যই দুনিয়া থেকে বিদায় করার সংকল্প আমি গ্রহণ করলাম। আপনারাও আমার সঙ্গে শরিক থাকবেন।”

ভিডিওটিতে তিনি শামীমের বিরুদ্ধে আল্লাহ, নবী (সা.) ও সাহাবীদেরকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ তুলেন এবং ‘শামীমের বক্তব্য’ দাবি করে একটি ভিডিও শোনান। দ্য ডিসেন্ট ভিডিও সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

এরপর বিকাল ৫টা ৩১ মিনিটে স্থানীয় একজন চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আরেকটি লাইভ ভিডিওতে আমিনীকে বলতে দেখা যায়, “এখানে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। গতকাল সে আত্মহত্যা করার জন্য বিষপান করেছিল, বর্তমানে এই কুলিয়া সবুর ডাক্তার সাহেবের চেম্বারে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। আমি ফজলুল হক কামিনী বলছি, আপনারা সকলে সমবেত হন। যে আল্লাহকে নিয়ে, রাসূলকে নিয়ে, কোরআনকে নিয়ে, সাহাবীদেরকে ছাগলের সাথে তুলনা করেছে, আল্লাহকে তার অস্তিত্বের ব্যাপারে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় ইউজ করেছে, যেটা কখনো কোনো মুসলমান মেনে নিতে পারে না। তার কোনো ট্রিটমেন্ট এবং তাকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।’’

ওই ভিডিওতে তিনি উপস্থিত বেশ কিছু মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, “অবশ্যই আমরা তাকে স্বহস্তে তার এই শাস্তি প্রদান করব, ঠিক কিনা? কোন ছাড় নাই! আল্লাহকে নিয়ে, রাসূলকে নিয়ে এবং কোরআনের পাতা ছিড়ে ছিড়ে খুলুক করার মত ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ যে দেখিয়েছে, তার কোন ক্ষমা নাই। আর আমাদের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। প্রশাসনের হাতে দেওয়া মানে জামাই আদরে সে থাকবে, প্রশাসনের পিছু কাটা লাগাবে এবং সেখানে বসে বসে ভালোমন্দ খাইতে থাকবে।”

শামীমের বড় ভাই জলিল সানা দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। বিগত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ঢাকা ও খুলনার বিভিন্ন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি খুলনা ডাক্তার ধীরাজ মোহন বিশ্বাসের কাছেও চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জলিল জানিয়েছেন।

জলিল জানান, শামীমের মানসিক অবস্থা স্থীর থাকে না। কখনো স্বাভাবিক আচরণ করতেন আবার  কখনো অস্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেন। তার কিছু বক্তব্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সম্প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়।

সোমবার দিবাগত রাতে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয় শামীমের। ওই সময় স্থানীয় কিছু স্থানীয় ব্যক্তি তাদের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করেন। 

বড় ভাই জলিল বলেছেন, শামীমের বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই ওই হামলার চেষ্টা হয়। তবে অন্যদের হস্তক্ষেপে তখন হামলকারীরা নিভৃত হোন। ওইসময় শামীম বিষপান করলে পরদিন সকালে তাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়। ওই ডাক্তারের চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করেন ফজলুল হক আমিনী।

ওই লাইভ ভিডিওতেই দেখা যায়, আমিনি এবং আরও কিছু ব্যক্তি চেম্বারে ঢুকে ডাক্তারের কাছ থেকে শামীমকে জোর করে টেনে বের করার চেষ্টা করছেন। সেখানে তাকে মারধর করা হয় বলে জলিল জনিয়েছেন।

দ্য ডিসেন্ট এর সংগ্রহ করা আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ডাক্তারের চেম্বারের সামনে শামীমকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হচ্ছে। আমিনী এবং আরও অন্তত একজনকে দেখা গেছে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা শামীমের বুকে জুতাসহ পা দিয়ে বারবার সজোরে লাথি দিচ্ছেন।

ঘটনাস্থল থেকে তাকে পুলিশ উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। 

রাত ৯টার দিকে আমিনীর নেতৃত্বে সদর হাসপাতালে জড়ো হোন বেশ কিছু মানুষ। এক পর্যায়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে শামীমকে পেটানো হয়। 

দ্য ডিসেন্টকে আমিনী নিজেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, “ওখানে (ডাক্তারের চেম্বারে) যখন জনগণ ওর উপরে হামলা করলো তখন ওখান থেকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে গেছিল। কিন্তু জনগণ চাইছে যে ওর কোন ট্রিটমেন্ট দেওয়া ঠিক হবে না, যেহেতু আল্লাহকে নিয়ে রাসূলকে নিয়ে কোরআনকে নিয়ে এত কুরুচিপূর্ণ কথা বলছে তার তো ট্রিটমেন্ট হওয়া ঠিক না আমাদের বিশেষ করে আমাদের হাসপাতালে। যদি তারে সাতক্ষীরার দিকে নিয়ে যেত তাহলে আর এটা হতো না, মানুষ এত উত্তেজিত হতো না, কিন্তু ওকে নিয়ে আসছে একেবারে সেই জায়গায়, যেখানে মানুষ উত্তেজিত ছিল।”

আমিনী জানান, দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঢুকে শামীমকে বারান্দায় পাওয়া যায় এবং সেখানেই তাকে মারধর করা হয়।

ফজলুল হক আমিনী তার ফেসবুক প্রোফাইলে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন ‘প্রিয় সাতক্ষীরা’ নামক একটি পেইজ থেকে। ওই পেইজে রাত ৯টার পর আপলোড করা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে শতাধিক লোক মিছিল করছেন এবং তাদের সামনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমিনি।

হত্যার পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উদযাপন

গণপিটুনিতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যু হলে তা উদযাপনও করেন কারী ফজলুল হক আমিনী। তিনি মঙ্গলবার রাত ১১ টা ১১ তে এক পোস্টে লিখেন, “মুরতাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম, কই মাছের জান তোর”।

ওইদিন রাত ১২ টা ৮ মিনিটে আরেক পোস্টে শামীমের লাশের ছবি পোস্ট লিখেন, “আলহামদুলিল্লাহ, তিনি মারা গেছেন, আল্লাহকে নিয়ে কটুক্তি, রাসুলকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, কোরআন কে নিয়ে অশালীন বক্তব্য প্রদানকারী অহিদুজ্জামান শামিম মুরতাদ মারা গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ”।

‘গর্বিত’ আমিনী বললেন, ‘অনুতপ্ত নই’

এ ঘটনায় আজ সকালে কারী ফজলুল হক আমিনীর সাথে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তিনি বলেছেন তিনি এ ঘটনায় অনুতপ্ত নন, কোনো ভয়ও পাচ্ছেন না। ঘটনার পর তার কোনো সমস্যাও হচ্ছে না বলে জানালেন আমিনী।

ফজলুল হক আমিনী বলেন, “আল্লাহ আমায় সৃষ্টি করেছে, সেই আল্লাহকে নিয়ে যে কুরুচিপূর্ণ কথা বলবে, যেই নবী আমার সুপারিশকারী, রসূলের মিল্লাতে আমায় কবর রাখবে বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিল্লাহ, তা আমি রসূলের নিয়ে যদি রসূলকে বেইজন্মা বলবে আর আমি সেই রসূলের উম্মত হয়ে আমি কিছু করতে পারব না, এটা আমার জন্য ব্যর্থতা না? আমি মুমিন হিসেবে পরিচয় দিব কিভাবে? কোরআনের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ছিঁড়ে সে কুলুক করার কথা বলছে আর তাকে কিছু করা যাবে না? আমি অনুতপ্ত হব? না না না, কোন অনুতপ্ত না আমি।”

আমিনী জানান, তিনি এই ঘটনায় গর্বিত। তিনি বলেন, “আমাকে এরেস্ট করবে বিভিন্নভাবে ইয়ে চলতেছে সমস্যা কি, আমি আছি স্বাভাবিক আছি, কোন সমস্যা নেই। নিয়ে গেলে আমি সাথে সাথে লাব্বাইক বলে সাড়া দেব। তবে ওদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত থানায় কোন মামলা রুজু করেনি।”

“শামীম আসলেই এমন মন্তব্য করেছেন কিনা– তা কী যাচাই করেছিলেন?” প্রশ্ন করলে আমিনী বলেন, “না ওইভাবে যাচাই আমি করার সুযোগ হয়নি, তবে যারা আমার কাছে এগুলো ইনফরমেশনগুলো দিছে তারা ওর একেবারে নিকটতম মানুষ।”

“পরিবারের দাবি শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ, তা জানতেন?” প্রশ্ন করা হলে আমিনী বলেন, “যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় সে আসলে অসুস্থ ছিল তাহলে তো ভিন্ন কথা। আমি অপরাধী। তার জন্য যে শাস্তি আছে অবশ্যই মাথা পেতে নেবো আমি। কিন্তু আমার কথা ওর আদ্যোপান্ত সমস্ত কথাগুলো শুনে একটাও তাকে পাগল হিসেবে বা মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তি হিসেবে মনে হয়নি। আপনারও মনে হবে না আপনি একটু শোনেন না তার বক্তব্যগুলো।”

দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি। পরিবার এখনও মামলা করেনি। উনারা থানায় আসতেছে, পথে আছে। যাকে (ফজলুল হক আমিনী) নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে সে গা-ঢাকা দিয়েছে। আমরা তার অবস্থান সনাক্ত করার চেষ্টা করছি।”