Ashraf Kaiser: “Being Called a Senior Journalist Is Now an Insult”
একসময় সাংবাদিকতা করেছেন এবং বর্তমানে ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ হিসেবে টেলিভিশন টকশোতে অংশ নেন, এমন অনেককেই ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় শো গুলোতে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিচয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোতে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই পরিচয় নিয়ে হাস্যরস করছেন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা।
এমন পরিস্থিতিতে স্বনামধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে আজ বৃহস্পতিবার এক পোস্টে লিখেছেন, “আমি সিনিয়র সাংবাদিক নই”।
এর আগে গত সোমবার জিটিভির ‘টাইমলাইন বাংলাদেশ’ টকশোতে অংশ নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপক কাজী জেসিন তাকে প্রশ্ন করেন, “আশরাফ কায়সার, আমি যখন আপনাদের সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, তখন আমার একটু সমস্যা হচ্ছে। কারণ আপনি জানেন, ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ পরিচয়টি ইতিমধ্যে একটি গালিতে পরিণত হয়েছে। আপনাদের দুজনের (আশরাফ কায়সার এবং এম এ আজিজের) কোনো খারাপ লাগছে কি না? কোনো অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে কি না?”
জবাবে আশরাফ কায়সার বলেন, “আপনাকে তো আমি বন্ধু বলেই জানতাম। কিন্তু আপনি যখন আমাকে এটা বলেন, তখন আমার অপমানে ও লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। কেন বলি, ইদানিং এটি একটি গালি। আপনি ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া খুললে দেখবেন, ছবি দিয়ে দিয়ে সিনিয়র সাংবাদিকদের তালিকা করে প্রচার করা হচ্ছে। যারা কোনো তথ্যের ধার ধারে না, যাদের কোনো কাজ নেই এবং যারা পতিত, পলাতক গণহত্যাকারীদের পক্ষ অবলম্বন করে, কুযুক্তি বা অপযুক্তি দিয়ে… এরা আসলে সমাজে এখন হাসির পাত্র।”
তিনি আরও বলেন, “আমি প্রায়ই বলি, আমি লেখক কিংবা একজন নাগরিক হিসেবে উপস্থাপিত হতে চাই, কিন্তু সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে নয়।”
‘তকমাটি মুছে ফেলতে চাই’
উপস্থাপক আরও জানতে চান, জনাব আশরাফ কায়সার তার নামের সঙ্গে যুক্ত এই পরিচয় মুছে ফেলতে চান কিনা?
জবাবে তিনি বলেন, “আমি মুছে ফেলতে চাই। দেখুন, কখনো যখন তকমা লেগে যায়, যখন এটি ট্যাবু হয়ে যায়, তখন সেটি বাদ দেওয়াটা জরুরি। আসলে সাংবাদিক বললেই হয়। আমি আপনাকে একটি কথা বলি, আমি দেখেছি সারা পৃথিবীতে জার্নালিস্ট মানেই জার্নালিস্ট। সেখানে সিনিয়র বা জুনিয়র এভাবে বলার দরকার নেই।”
এরপর উপস্থাপক কাজী জেসিন বলেন, “কিন্তু যে যুক্তিতে আমরা বলছি, ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ শব্দটি আমরা পরিহার করতে চাচ্ছি, সেই যুক্তি যদি মাথায় রাখি, তাহলে তো সাংবাদিকদেরও গালি দেওয়ার মতো উপাদান আছে এবং সেই গালিটাও দেওয়া হয়। সেটি যদি আরও বেড়ে গিয়ে এখন ‘সিনিয়র সাংবাদিক’-এর জায়গা নিয়ে নেয়, তখন কি সেই পরিচয়টিও মুছে যাবে?”
জবাবে আশরাফ কায়সার বলেন, “একজন সাংবাদিকের সাংবাদিক পরিচয় ছাড়া আর কোনো পরিচয় জরুরি বলে আমার মনে হয় না। আর ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ মানে কী জানেন? বেকার, কর্মহীন, টকশোতে হাজির হন, কিছু টাকা গুঁজে নিয়ে বাড়িতে যান এবং বিভিন্ন মহলের হয়ে কুযুক্তি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন।”
তিনি বলেন, “এসব বিষয় বছরের পর বছর ধরে মানুষের পর্যবেক্ষণে চলে এসেছে। কেউ কেউ গায়ের জোরে কথা বলেন, কেউ কেউ দৃশ্য তৈরি করার চেষ্টা করেন, আবার কেউ কেউ ঘোষণা দেন, ‘আপাতত বিরতি নিচ্ছি।’ এটি এখন অন্যরকম একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে।”
আশরাফ কায়সারের এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টে সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আরশাদ মাহমুদ মন্তব্য করেন, “আমিও না। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব এম্বারাসিং লাগে।”
‘কতদিন সাংবাদিকতা করলে সিনিয়র?’
আরেক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান মামুনও নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ পরিচয় ব্যবহারের বিরোধিতা করে লিখেছেন, “‘সিনিয়র সাংবাদিক’ কথাটার বিরোধিতা করেছি কার্যক্ষেত্রে; অর্থাৎ টকশোয় নামের সঙ্গে পরিচিতি জুড়ে দেওয়ার সময়টায়, একাধিক টেলিভিশনে। কেউ পরামর্শ গ্রহণ করেছেন, কেউ করেননি। সেটা তাদের বিষয়, তাদের দায়।”
তিনি লিখেছেন, “আমার যুক্তি ছিল, ‘সিনিয়র’ বলা বা লিখে দেওয়ার তো দরকার নেই। সাংবাদিক বললেই হয়। সিনিয়র না জুনিয়র, সেটা কীভাবে নির্ধারিত হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে, কতদিন সাংবাদিকতা করলে সিনিয়র? নাকি টকশোয় এলেই একজন সিনিয়র সাংবাদিক হয়ে যেতে পারেন?”
“এক টিভিতে এমনও বলেছিলাম, কর্মরত সাংবাদিকদের ‘সংবাদকর্মী’ বলেও পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। সংবিধানে যেমন সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। কেউ ‘কর্মকর্তা’ নয়। যদিও আমরা হাইফেন দিয়ে লিখতে অভ্যস্ত, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারী’”, লিখেছেন তিনি।
হাসান মামুনের পোস্টটি শুধু তার ফেসবুক বন্ধুদের জন্য দৃশ্যমান রেখেছেন। এই প্রতিবেদন তৈরির সময় তার এই পোস্টের বক্তব্য প্রকাশের অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক মঞ্চেও সমালোচনা
‘সিনিয়র সাংবাদিক’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চেও সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, “কিছু আওয়ামী দলদাস, সেবাদাস সাংবাদিক, প্রচুর বেকার জ্যেষ্ঠ বা সিনিয়র সাংবাদিক দেখবেন ইদানীং। কোনো কাজ নেই। খালি টকশোতেই শুনি, তিনি সিনিয়র সাংবাদিক। যখন জিজ্ঞেস করি, কোথায় কাজ করেন? বলেন, বেকার। এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই।”
ফেসবুকে হাস্যরস
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান টকশোতে যাওয়া বক্তাদের বক্তব্যে দেয়া বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা যাচাই শুরু করেছে। এতে দেখা গেছে, ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ পরিচয়ে আলোচক হিসেবে অংশ নেয়া বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে ভুয়া খবর ছড়িয়ে থাকেন।
এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে হাস্যরস করেন। এমনকি ‘সিনিয়র সাংবাদিকদের’ ব্যঙ্গ করে জনপ্রিয় ফেসবুক পেজও গড়ে উঠেছে। ‘ছিনিয়র সাংবাদিক খোকন’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রায় ৪৬ হাজার অনুসারী রয়েছেন। সেখানে প্রায়ই ইচ্ছাকৃত ভুল বানানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিকদের ব্যঙ্গ করে পোস্ট দেওয়া হয়।
পেজটির বায়োতে পরিচয় হিসেবে লেখা রয়েছে, “একমাএ পেশা ও নিশা সাংবাদিকতা।”
ফেসবুক ব্যবহারকারীরা ‘সিনিয়র সাংবাদিক’-এর বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক নাম ব্যবহার করেছেন। ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ ইস্যুতে বিভিন্ন পোস্টে কয়েকশত মন্তব্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে এসব মন্তব্যের ভাষা কখনো কৌতুকপূর্ণ, কখনো আক্রমণাত্মক ও অশালীন।