Pro-Jamaat Social Media Accounts Spread Offensive Posts About the Liberation War
গণঅভ্যুত্থানের মাস জুলাই শুরু হওয়ার পর অনলাইনে শুরু হয়েছে বয়ানযুদ্ধ। একদিকে পতিত ও পলাতক আওয়ামী লীগের সমর্থক সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও এক্টিভিস্টরা। অন্যদিকে আছেন জুলাইপন্থী বিভিন্ন পক্ষের মানুষজন। তাদের মধ্যে আছেন সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, এক্টিভিস্ট এবং আরও অনেকে।
অনলাইন বাকযুদ্ধে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে যুক্তি/তর্কের পাশাপাশি স্ল্যাংয়ের ব্যবহারও চলছে সমানতালে। এর মধ্যে অন্যতম একটি স্ল্যাং হচ্ছে CDI শব্দের ব্যবহার।
গত এক সপ্তাহ ধরে CDI হ্যাশট্যাগ ব্যবহারে প্রথমে আওয়ামী লীগপন্থীরা এবং পরে এর জবাবে জুলাইপন্থীরা ক্যাম্পেইন শুরু করেন।
১ জুলাই আওয়ামীপন্থী সাংস্কৃতিক কর্মী মেহের আফরোজ শাওন জুলাই অভ্যুত্থানকে কটাক্ষ করে দীর্ঘ পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বহুবার জুলাই অভ্যুত্থান, আন্দোলন ও আন্দোলকারীদের উদ্দেশ্যে CDI শব্দটি ব্যবহার করেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে CDI শব্দের ব্যবহার করে রাজপথে গ্রাফিতি অংকন এবং স্লোগান দেন। যেমন, ‘শেখ হাসিনা CDI’, ‘আওয়ামী লীগ CDI’ ইত্যাদি। মূলত স্বৈরশাসক ও তার সহযোগীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে আন্দোলনকারীরা এমনটি করেছিলেন।
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর জুলাই বিরোধী অনলাইন ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগরারও একই শব্দের ব্যবহার শুরু করে।
মেহের আফরোজ শাওনের কটাক্ষমূলক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় গত ২ জুলাই গিয়াস উদ্দিন নামক একটি আইডি থেকে একটি ব্যানার পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘‘গত ৫৪ বছর ধরে অসংখ্য বার একটা শব্দ চোখে পড়ছে- বিশেষ করে গত ২ বছর ধরে সোস্যাল মিডিয়ায় ফেসবুকে প্রায়ই চোখে পড়েছে একাত্তর CDI #মুক্তিযুদ্ধCDI…আমার পরিচিত অনেকের লেখাতেই #71CDI শব্দটা দেখেছি। আবার অপরিচিত অনেকেও লিখেছে #71CDI. প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম #71CDI কোনো একটা ট্রেন্ড।...’’
শাওনের এমন পোস্টের বিপরীতে শুধু গিয়াস উদ্দিন নামক আইডি নয়; এমন আপত্তিমূলক হ্যাশট্যাগে ব্যবহার করে আরও অনেককেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ক্যাম্পেইন করতে দেখা গেছে।
দ্য ডিসেন্ট ফেসবুকে এই হ্যাশট্যাগ সার্চ করে দেখার চেষ্টা করেছে কারা এমন পোস্ট করছেন। কীই বা লিখছেন তারা।
৭১সিডিআই ক্যাম্পেইন করছে কারা?
শাওনের পোস্টের পর আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট Rashidul Hasan Rajon এক পোস্টে লিখেন, ‘‘আমরা যেমন বুক চিতিয়ে বলি julycdi, তোদের সাহস থাকলে বল 71cdi. ইনিয়ে বিনিয়ে না বলে সরাসরি বল। তারপর দেখ আমরা কি করি।’’ এই পোস্ট শেয়ার করে ক্যাপশনে অনেকে ‘71cdi’ হ্যাশট্যাগ দেন।
সেই পোস্টের স্ক্রিনশট শোয়র করে Zihad Arafat নামে একজন লিখেন, ‘‘একাত্তর CDI, স্ক্যাম CDI, ই'ন্ডিয়া CDI..... খিলিয়ার??’’।
জিহাদ আরাফাতের প্রোফাইলে থাকা তথ্য অনুযায়ী তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়েছেন এবং গত চাকসু নির্বাচনে জিএস প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সময়ে এই আইডি থেকে জামায়াত-শিবিরের পক্ষে পোস্ট দিতে দেখা গেছে। এবং আপ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কমিনিকেশন টিমের পোস্টারেও জিহাদ আরাফাতের নাম রয়েছে।
রাশিদুল হাসান রাজনের ওই পোস্ট শেয়ার করে আলী আহসান মুসা নামে একজন লিখেন, ‘‘তোদের ৭১ কে দিনে ১৪বার cdi, দম থাকে আরো ২বার cdi…’’। Saifuddin Mahmud Plabon নামক আইডি থেকে একজন লিখেন, ‘‘কমেন্ট বন্ধ করে রাখসে, তাই কমেন্ট করতে পারতেসিনা 71CDI’’। Nafeun Alam Bhuiyan লিখেন, ‘‘৭১ চুদি। লাউড এন্ড ক্লিয়ার’’।
এছাড়াও হ্যাশট্যাগ ও কী-ওয়ার্ড সার্চ করে অন্তত ৩৫টি আইডি পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট যারা তাদের পোস্টে নানা সময় 71CDI হ্যাশট্যাগে পোস্ট করেছেন।
এসব একাউন্টের এক্টিভিটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অল্প সংখ্যক আইডি আছে যেগুলোতে ব্যক্তির সত্যিকারের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি বেশিরভাগ আইডিতে ভুয়া একাউন্টের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
এরমধ্যে অন্তত ১২টি আইডি থেকে বিভিন্ন সময়ে জামায়াত-শিবিরের পক্ষে এবং ২টি থেকে এনসিপির পক্ষে পোস্ট দিতে দেখা গেছে। এছাড়া বাকি আইডির মধ্যে বেশ কয়েকটিতে বিএনপির বিপক্ষে পোস্ট পাওয়া গেছে। কিছু আইডিতে কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে সাম্প্রতিক কোন কন্টেন্ট পাওয়া যায়নি। তবে ধর্মীয় বা সামাজিক বিভিন্ন কন্টেন্ট শেয়ার বা পোস্ট করেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়াতে কে কী করে বোঝা মুশকিল। অনেকে ফেইক আইডি ব্যবহার করে এসব করে। এ নিয়ে মন্তব্য করা কঠিন। তবে জুলাই কিংবা একাত্তর–কোনোটা নিয়েই বাজে মন্তব্য করা যাবে না। একাত্তর আমাদের স্বাধীনতার অর্জন আর জুলাই আমাদের ফ্যাসিবাদ মুক্তির অর্জন। দুইটাকেই আমরা যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে চাই। দুইটাকেই ধারণ করি।’’
‘৭১CDI’ ক্যাম্পেইনের আহবান জানিয়ে পোস্ট
গত ৪ জুলাই শিবলী সাদিক নামক একাউন্ট থেকে একটি পোস্টে লেখা হয়, ‘‘#৭১CDI এই হ্যাসট্যাগ ১ মিলিয়ন করতে পারবেন কে কে?’’ উক্ত পোস্টে এ পর্যন্ত রিয়েক্ট পড়েছে ৪৭৫টি। কমেন্ট করেছেন ৬১৪জন।
এই পোস্টের কমেন্ট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেকে পোস্টের সাথে একমত হয়ে কমেন্টেই ‘৭১CDI’ লিখছেন। অনেকে এর বিপক্ষে ‘JulyCDI’ লিখছেন।
কিছু কমেন্টে এমন পোস্টের ব্যাপারে আপত্তিও জানিয়েছেন। Hasan Muhammad Fariduzzaman নামে একজন লিখেছেন, ‘‘৭১ এ সমস্যা কি! সমস্যা মুজিবে থাকতে পারে, ৭১ এ না।’’
Ruhul Amin নামে একজন লিখেছেন, ‘‘এমোন কিছু করে দেশে দাঙ্গা তৈরি করা থেকে বিরত থাকেন’’
Mosiur Rahman Mokim লিখেছেন, ‘‘৭১ কে ছোট করিয়েন না ভাই। ৭১ তো আওয়ামী লীগের না।’’
এর আগে ১ জুলাই একই আইডি থেকে একটি পোস্টে লেখা হয়, ‘‘৭১ বিরোধী জনশক্তিকে একত্রিত হতে হবে। আপনারা অনেকেই বিছিন্ন ভাবে আছেন আমরা একত্রিত হলে এই ট্যাবু ভেমগে দিয়ে দেশকে ভারতের কলোনি থেকে মুক্ত করতে পারব। কে কোন যায়গা থেকে আছেন কমেন্ট করুন।’’
আইডিটির এক্টিভিটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই আইডি থেকে নিয়মিতই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট দেওয়া হয়। গত ১৮ জুন এক পোস্টে লেখা হয়, ‘‘৭১ একটি জায়োনিস্ট প্রজেক্ট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে খেলাফতের ধ্বংসের পর পুনরায় ইসলাম ও মুসলমানের জন্য গড়ে উঠা রাষ্ট্র পাকিস্তান। এই জন্যই চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রে পাকিস্তান ভেঙে ফেলা হয় এবং পুর্ব পাকিস্তান কে মুশরিকের পেটে ঢুকিয়ে দেয়া হয়৷ আর পুর্ব পাকিস্তান নামে স্বাধীন বাংলাদেশ হলেও আদতে এই দেশের আদ্যোপান্ত সব কিছু ভারতের দখলেই ছিল৷ এক জিয়াউর রহমান ভারতকে পাশ কাটাতে গিয়ে নিজের জীবন হারাতে হয়। এবং তার দল সেটার বিচার ও করতে পারেনি৷’’
মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে নিয়মিত পোস্ট
দ্য ডিসেন্ট কী ওয়ার্ড সার্চ করে পাওয়া ৩৫টি একাউন্টের মধ্যে অন্তত ৭টি একাউন্ট পেয়েছে যারা নিয়মিতই মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে পোস্ট করেন। এরমধ্যে প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখিত আইডি Gias Uddin অন্যতম। এই আইডি থেকে গত ৪ জুলাই এক পোস্টে লিখা হয়, ‘‘যেমনি ৪৭এর ধারাবাহিকতায় একাত্তুর নয় তেমনি একাত্তরের ধারাবাহিকতায় চব্বিশ নয়। ৪৭এর বিরুদ্ধে একাত্তুর হয়েছে একাত্তরের বিরুদ্ধে চব্বিশ হয়েছে। চব্বিশ ধরে রাখতে একাত্তুর বিলুপ্ত করেই ধরে রাখতে হবে।’’
২ জুলাই এক পোস্টে লিখেন, ‘‘একাত্তুর বিরোধিতাই ভারত বিরোধিতা। যারা ভারত বিরোধী কিন্তু একাত্তুর বিরোধী নয় তারাই বাজ্ঞু।…’’
১ জুলাই উক্ত আইডি থেকে এক পোস্টে লিখা হয়, ‘‘চব্বিশ আসার পরে একাত্তুর বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন একাত্তরবাদীরা হাউকাউ করে কিছু চেতনা চর্চা রঠা চর্চা করে একাত্তুর টিকিয়ে রাখতে চাইছে…’’। একইদিন আরেক পোস্টে লিখা হয়েছে, ‘‘চব্বিশ এবং একাত্তুর দুটো ভিন্ন মেরুর সমীকরণ। আদর্শিক ভাবে একাত্তরের বিরোধী হলো চব্বিশ। একাত্তুরকে প্রাসঙ্গিক রেখে চব্বিশ কখনোই প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেনা। একাত্তুর প্রাসঙ্গিক থাকলে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে চব্বিশ হারিয়ে যাবে।’’
এই আইডিতে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর এক পোস্টে দেখা যায়, ক্যাপশনে ‘#৭১cdi’ লিখে সাথে বাংলাদেশের পতাকাকে নকল পতাকা সম্বোধন করে আরেকটি নতুন পতাকাকে বাংলাদেশের আসল পতাকা হিসেবে পোস্ট করা হয়েছে।
এই আইডির পরিচালনাকারীর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সময়ে সাদিক কায়েমের পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট ও মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদির ছবি আপলোড দিতে দেখা গেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, Towfique Mahdi নামে আরেকটি আইডি থেকে প্রায় সময় এমন পোস্ট দেওয়া হয়। গত ২৪ জুন একটি মিম শেয়ার করে তিনি ক্যাপশনে লিখেন, ‘#71cdi’।
গত ২ জুলাই এক পোস্টে লিখেন, ‘‘একাত্তরের সাথে চব্বিশকে কখনো মিলাবেন না। হ্যাঁ ঐ নাপাক দুর্গন্ধময় একাত্তরের সাথে আমার মহান চব্বিশের পবিত্র জুলাই জিহাদকে মিলাবেন না। একাত্তর হয়েছিল হিন্দুস্তানের সাহায্য নিয়ে, আর চব্বিশ হয়েছিল সেই হিন্দুস্তানি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। চব্বিশ ছিল মুসলমানদের জন্য জিহাদ, জুলাইয়ের ছত্তিশ দিন পুরো পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশ ছিল জিহাদের রণাঙ্গন।…’’
এছাড়াও Voice Against Shahbag, Expose 71, B Histori এবং Mojabbir Hossain Shihab সহ এমন বেশকিছু পেইজ ও আইডি রয়েছে যেগুলো থেকে নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে এবং বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তান উল্লেখ করে পোস্ট দেওয়া হয়।