RU Professor Threatened After Hasina-Critical Post

13 July 2026

পলাতক শেখ হাসিনাকে কটাক্ষ করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার জেরে অনলাইনে ‘আওয়ামী বটবাহিনীর’ সংঘবদ্ধ হুমকি ও অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন।

তার অভিযোগ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে তাকে ও তার পরিবারকে লক্ষ্য করে অপপ্রচার, কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা, এআই প্রযুক্তিতে বিকৃত ছবি তৈরি এবং প্রাণনাশ ও ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এছাড়া তারই এক সহকর্মীর কাছ থেকে কিছুদিন আগেই তিনি হত্যার হুমকির পেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। ওই শিক্ষক আওয়ামীপন্থী বলে জানালেও নাম জানাননি নিউটন।

দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে আলাপকালে অধ্যাপক নিউটন বলেন, বিষয়টিকে তিনি শুধু বিচ্ছিন্ন হুমকি হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক অনলাইন প্রচারণার অংশ।

সেলিম রেজা নিউটন ২০২৪ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২ আগস্ট ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা ও কালো টি-শার্ট পরিহিত দুইজন বন্দুকধারী আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থীকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। অধ্যাপক নিউটন সহ অনেকেই সেখানে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। 

জুলাই আন্দোলনে অধ্যাপক নিউটনের ভূমিকা গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।

অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই তিনি অনলাইনে আওয়ামীপন্থীদের হত্যার হুমকির শিকার হয়েছেন বিভিন্ন সময়। তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট করা হয়েছে। 

এবছর জুলাই মাস শুরু হওয়ার আগে থেকেই জুলাইকে কটাক্ষ করে ‘‘July cdi’’ লিখে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট করছেন আওয়ামী নেতাকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টরা। এছাড়া আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ১ জুলাইয়ে ‘জুলাই সিডিআই’ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেন। তাদের পোস্টের ‘কাউন্টার হিসেবে’ গত ২ জুলাই রাবি অধ্যাপক নিউটন তার প্রোফাইলে ‘‘HasinaChudina’’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে এবং এই লেখা সম্বলিত একটি ছবি পোস্ট করেন।

ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, Thank you, ChatGPT, for carefully following my instructions. I expect my Facebook friends to share it wholeheartedly. We all need to organize an awareness campaign against the Awami fascist "rape culture". I hope you all understand what I say. Please don't forget to use the campaign hashtag: #HasinaChudina.’’

এই পোস্টের পর থেকে অধ্যাপক নিউটনের মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়েও বিভিন্ন নোংরামিমূলক পোস্ট করছেন আওয়ামীপন্থীরা। এমনকি তার মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে এই অধ্যাপক দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন।


নিউটনকে টার্গেট করে আওয়ামীপন্থীদের প্রচারণার প্রমাণ পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট

সেলিম রেজা নিউটন ও তার পরিবারকে টার্গেট করে অনলাইনে আওয়ামীপন্থীদের সংঘবদ্ধ প্রচারণার প্রমাণ পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট। 

গত ৩ জুলাই খুলনা জেলা যুবলীগের সভাপতি এবং খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান চৌধুরী রায়হান ফরিদ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘‘বাবা যখন ধর্ষক! রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন একজন বিকৃত মানসিকতার মানুষ। যার বিরুদ্ধে তার নিজের মেয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছে। তিনি শেখ হাসিনাকে নিয়ে খুব নোংরা কথা বলেছেন। দুটি ঘটনায় স্পষ্ট, তার নৈতিক স্খলন ঘটেছে। আর নৈতিক স্খলন ঘটলে তার কি বিশ্ববিদ‍্যালয়ের শিক্ষক থাকার কোন অধিকার থাকে? এক সময় আরেকজন শিক্ষিকার সাথে লিভ টুগেদার করতো। এই নষ্ট লোক শিক্ষার্থীদের কি শিক্ষা দিবে। তাকে’তো প্রকাশ‍্যে জুতাপেটা করা উচিত, সে বেঁচে থাকলে একদিন হবে।’’

গত ২ জুলাই এক পোস্টে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও বাঁশখালী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ নাঈম উদ্দিন মাহফুজ ফেসবুকে পোস্টে নিউটন ও তার মেয়ের ছবি যুক্ত করে লিখেছেন, ‘‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিউটন যার বিরুদ্ধে তার নিজ মেয়ে সুস্মিতা লাইভে এসে যৌন অত্যাচার করার অভিযোগ করেছিলো। যে লোক নিজের মেয়েকে যৌন অত্যাচার করতে পারে,তার পক্ষে এই নোংরামী কোন বিষয় না। ছবিতে নিউটন আর তার মেয়ে কমেন্টে তার নোংরামীর স্ট্যাটাসের স্কিনশর্ট দিয়েছি।’’ তবে পোস্টটির কমেন্টে সংশ্লিষ্ট কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একই ক্যাপশনে Mohammed Allauddin Melon নামে একটি আওয়ামীপন্থী একাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়। সেই পোস্ট আফজাল অরণ্য নামে একটি ফেসবুকে একাউন্ট থেকে শেয়ার করে একই ধরণের ক্যাপশন লেখা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ফেসবুক একাউন্ট থেকে এ ধরণের পোস্ট করা হয়েছে। দেখুন এখানেএখানে

নিউটনের ফেসবুক পোস্টের পর শাওনের চেয়ে নিউটনের অপরাধকে বড় করে দেখছেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর। নিউজ২৪ এর একটি টকশোতে তিনি বলেছেন, ‘‘শাওনের কাউন্টারে সেলিম রেজা নিউটন শাওন থেকে আরও বড় অপরাধ করেছে। সে শেখ হাসিনাকে দিয়ে সিডিআই এর বাংলা করে গালিগালাজ করেছে। এগুলো একেকটা ইতরামির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে।’’

সাংবাদিক আনিস আলমগীর জুলাই আন্দোলনকে বিএনপি-জামায়াতের নারকীয় সন্ত্রাস বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 

পরবর্তীতে গত ৪ জুলাই অবশ্য অধ্যাপক নিউটন সেই পোস্টের ব্যাখা দিয়ে আরেকটি পোস্ট করেন তিনি। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘‘“জুলাই CDI” প্রোপাগান্ডার মধ্যে যে স্পষ্ট ও আক্রমণাত্মক ধর্ষককামী সুর রয়েছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করতেই আমি অত্যন্ত সাবধানে এবং ধ্যানস্থ মনে এটি পোস্ট করেছি। এটি আমাদের বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সেই 'সিপি গ্যাং'-এর আগ্রাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার পোস্টে আসলে কোনো গালিগালাজ বা অশ্লীল শব্দ নেই। এটি একটি সোজাসাপ্টা রাজনৈতিক বিবৃতি। কেউ যদি এর সঠিক অনুবাদ করে, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে: “উই ডোন্ট গিভ এ ফাক অ্যাবাউট হাসিনা”। (এর অর্থ: আমরা হাসিনাকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না বা পাত্তা দিই না।) ব্যস, এটুকুই। একদম সিম্পল।’’

অধ্যাপক নিউটন ডিসেন্টকে যা জানিয়েছেন

হুমকির বিষয়ে জানতে অধ্যাপক নিউটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপকালে তিনি বলেন, ‘‘আমি বিষয়টিকে শুধু 'থ্রেট' বা হুমকি বলব না। জুলাইয়ের ঘটনাক্রম চলাকালীন এবং ৫ই আগস্টের পর থেকে আমার ফেসবুক প্রোফাইলকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত অনলাইন আক্রমণ শুরু হয়। বিশেষ করে আমি যখন জনসম্মুকে আসি, তখন থেকেই খুব জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ এবং নানান ধরনের আক্রমণের হুমকি আসতে থাকে। মেসেঞ্জার ইনবক্স ও কমেন্ট সেকশনে প্রতিনিয়ত এই হামলা চলছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, এই প্রথম আমি আমার কমেন্ট সেকশন অফ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।’’

এই ধরণের আক্রমণ কারা চালায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি যেভাবে দেখছি, এটি একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা প্রজেক্ট। তারা ‘জুলাই সিডিআই’ (July CDI) নামে একটি প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি সরাসরি আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জুলাইয়ের যে গণহত্যা, তাকে যেভাবেই হোক নস্যাৎ করা এবং মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা। এখানে প্রচুর মানুষকে ভাড়া করে বা ‘বট বাহিনী’ ব্যবহার করে ফেসবুকে এই ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।’’

অধ্যাপক নিউটন বলেন, ‘‘তারা আমার কন্যার ছবি বিকৃত করেছে। আমার পরিবারের নারী সদস্যদের ইনবক্সে এআই (AI) দিয়ে বানানো বিকৃত ছবি পাঠানো হচ্ছে। এমনকি সেখানে ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। আমার চেনাজানা এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই যার ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে এরা নোংরামি করেনি। এসব কিছুই করা হচ্ছে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার জন্য।’’

কীভাবে হুমকির শিকার হয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘মাস কয়েক আগে আমারই এক সহকর্মী, যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ওই আদর্শের (আওয়ামীলীগ) অনুসারী, তিনি ফোনে আমাকে প্রায় ১০-১৫ মিনিট ধরে লাইফ থ্রেট বা প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। কীভাবে মেরে ফেলা হবে, তার বর্ণনা দিয়েছেন। যদিও ব্যক্তিগত স্নেহের জায়গা থেকে আমি তখন তার নামে অভিযোগ করিনি, তবে আমি বুঝতে পারছি এটি কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়; তারা একটি নির্দিষ্ট সার্কেলের মধ্যে এসব পরিকল্পনা করে। এছাড়া অজ্ঞাত নাম্বার থেকে নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ কল ও মেসেজ তো আসছেই।’’

অধ্যাপক নিউটন বলেন, ‘‘আমি একটি কাউন্টার স্লোগান হিসেবে পোস্টটি দিয়েছিলাম। সেটা কোনো গালি ছিল না। আমার স্লোগানের মূল অর্থ ছিল ‘ফাক অফ হাসিনা’, যার মাধ্যমে আমি বোঝাতে চেয়েছি আমরা হাসিনার এই প্রোপাগান্ডাকে আর গুরুত্ব দিই না, তার এসব ষড়যন্ত্রকে আমরা গুনায় ধরি না। আমার চোখের সামনে আমার ছোট ছোট ছাত্র-ছাত্রীরা মারা গেছে, এটা আমার কাছে কোনো পলিটিক্যাল ইস্যু নয়, এটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও কষ্টের ইস্যু। সেই তাড়না থেকেই আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি।’’

আইনী পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘অনেকেই আমাকে জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করার পরামর্শ দিয়েছেন। যেহেতু পুরো বিষয়টি এখন পরিকল্পিত রূপ নিয়েছে, তাই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে আমি পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে এখন হাসপাতালের দৌড়ঝাঁপে আছি। একটু স্থির হয়েই আমি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে আইনি ব্যবস্থা নেব। তবে আমার মনে হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে জনস্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়েও তদন্ত করতে পারে, কারণ বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট।’’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা পাচ্ছেন কি-না জানতে চাইলে নিউটন বলেন, ‘‘আমার বিভাগ ও সহকর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিচ্ছেন। বিভাগের চেয়ারম্যান আজকেও ফোন করেছিলেন। আমি যখন জিডি করব, তখন তার কপি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও দেব। তবে আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় একটি গণহত্যাকে অস্বীকার করার জন্য যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রোপাগান্ডা চলছে, সেটাকে রুখে দেওয়া।’’

অধ্যাপক নিউটন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে, তাই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি খুব একটা ভীত নই। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশে মতপ্রকাশের কারণে যখন একজন শিক্ষকের পরিবারকে এমন জঘন্য আক্রমণের শিকার হতে হয়, তখন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। জুলাইয়ের রক্ত যেন প্রোপাগান্ডার নিচে চাপা না পড়ে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া।’’