Ministry Notice Adds Confusion After Media Mistranslates Education Minister’s Remarks
গত তিন দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় রয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বাংলাদেশের কয়েক ডজন সংবাদমাধ্যম ১৪ জুন শিক্ষামন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে “দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার” শিরোনামে খবর প্রকাশ করে।
গত ১৪ জুন রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ইউনিসেফের (UNICEF) আয়োজনে “Validation Workshop on the Bangladesh Education Sector Analysis (ESA) 2026” শীর্ষক একটি কর্মশালায় বক্তব্য দেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বক্তব্যে তিনি গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর বক্তব্যের সূত্র ধরে বলেন, “Skill development is very important for us, we're addressing that also. Of course our advisor, ex-advisor, said that we are looking for the universities, universities, universities in every constituency. Well that's also true, we need universities as well as our primary school also…and the gap we're doing the mapping right now and I'll address that and no villages will be left without any primary school. That we're addressing right now.”
এর বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায়, “দক্ষতা উন্নয়ন আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা সেটিও দেখছি। অবশ্যই আমাদের উপদেষ্টা, সাবেক উপদেষ্টা বলেছেন যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দিচ্ছি। আচ্ছা, সেটিও সত্য, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দরকার... এবং যে ঘাটতি আছে, আমরা এখন সেটার ম্যাপিং করছি এবং আমি সেটি দেখব। আর কোনো গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া থাকবে না। সেটিই আমরা এখন দেখছি।”
Anm Ehsanul Hoque Milon এর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে পুরো বক্তব্যের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ভিডিওটির ১২ মিনিট এমন বক্তব্য বলতে শোনা যায়।
মিডিয়ার ভুল অনুবাদে বিভ্রান্তি
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম “দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার” শিরোনামে খবর প্রকাশ করে।
১৪ জুন এখন টিভির ওয়েবসাইটে “সব সংসদীয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার পরিকল্পনা সরকারের: শিক্ষামন্ত্রী” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, “দেশের প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায় কি না, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক ম্যাপিং করে প্রতিটি গ্রামে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছি, চিন্তা-ভাবনা চলছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রয়োজন। গ্রামভিত্তিক ম্যাপিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যাতে দেশের কোনো গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়বিহীন না থাকে।”
একই খবর ঠিকানা নিউজ, The Daily Campus, জাগো নিউজ, বাংলা অ্যাফেয়ার্স, এবং ডেলটা লেন্স হুবহু প্রকাশ করে।
NTV "সব সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের" শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশ করলেও পরবর্তীতে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলে।
RTV এবং দৈনিক ইত্তেফাক তাদের আগের শিরোনাম ও কন্টেন্ট সম্পূর্ণ বদলে ফেলে নতুন শিরোনাম দেয়: "দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী"। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা কোনো ধরণের সংশোধনী নোট দেয়নি।
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে সাবেক উপদেষ্টার কথার সূত্র ধরে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং কোনো গ্রাম যেন প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া না থাকে, সে বিষয়ে ম্যাপিংয়ের কথা বলেন।
কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলো বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অংশ বাদ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে সরাসরি উদ্ধৃত করে লিখেছে, “দেশের প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায় কি না, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক ম্যাপিং করে প্রতিটি গ্রামে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হবে।”
শিক্ষামন্ত্রী সাবেক উপদেষ্টার বক্তব্য উল্লেখ করে কথা বললেও সংবাদমাধ্যমগুলো সেই অংশ বাদ দিয়ে তার বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে, যা পরে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
১৪ জুন শেরাটন হোটেলে ইউনিসেফ আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর বক্তব্য দ্য ডিসেন্ট স্বতন্ত্র ভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এ ব্যাপারে রাশেদা কে চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডিসেন্ট কে জানান, “শিক্ষামন্ত্রী ঠিক যেভাবে বলেছেন, আমি সেভাবে বলিনি। আমি বলেছি, এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলছেন। আগের সরকার ও যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। আমি এটার বিরোধীতা করছিনা। কিন্তু আমি বলেছি ম্যাপিং করতে, যাচাই-বাছাই করে বিশ্ববিদ্যালয় করতে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় ট্যাক্সপেয়ারদের টাকায়, ফলে সঠিক ম্যাপিং টা জরুরী।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতেও ভুল তথ্য
পরবর্তীতে ১৫ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিক সাক্ষরিত এক প্রেস রিলিজ এ জানানো হয়, “বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে উদ্ধৃত করে ‘‘প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের’’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। উক্ত সংবাদটি অসত্য, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। আলোচ্য অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, ‘‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ তাদের এলাকায় হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ নিয়ে আসেন। কিন্তু, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপারিশ করেন না।’’ এসময় তিনি আরও বলেন, ‘‘দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।’’
শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের এমন বিজ্ঞপ্তির পর মূলধারার একাধিক সংবাদমাধ্যম “প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনার সংবাদ অসত্য: শিক্ষা মন্ত্রণালয়” শিরোনামে খবর প্রকাশ করে। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতেও বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। ১৪ জুন ইউনিসেফের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর পুরো বক্তব্য বিশ্লেষণ করেও “মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ তাদের এলাকায় হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ নিয়ে আসেন। কিন্তু, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপারিশ করেন না” এমন বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে এমন কথা বলেছেন।”
শিক্ষামন্ত্রীর মূল বক্তব্য পড়ে শোনানো হলে এবং বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা শব্দগুলো মূল বক্তব্যে পাওয়া যায়নি জানালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “হ্যাঁ, মূল বক্তব্যে বলেননি। তবে ওই প্রোগ্রামেই তিনি ইনফরমালি এই কথা বলেছেন।”
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিকের সঙ্গেও যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। তিনি প্রচারিত বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিলেও তার কোনো বক্তব্য প্রকাশ করার অনুমতি দেননি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা
এ খবরের সূত্র ধরে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা দেখা যায়।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও প্রথম আলোর কলাম লেখক ড. নাদিম মাহমুদ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “প্রতিটি সংসদীয় আসনে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় করতে চায় বলে ‘শিক্ষামন্ত্রীর বরাত দিয়ে’ খবর দেখলাম। আমি বলি কি, জাতীয় সংসদটাকে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ হিসেবে ঘোষণা করে দিক। সেখানকার সংসদীয় প্রতিনিধিরাই হবেন উপাচার্য! এর ফলে সরকারের এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করা সম্ভব হবে।”
সরকারের এমন তথাকথিত ‘সিদ্ধান্তের’ সমালোচনা করে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নুরে আলম সিদ্দিকি এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আমাদের নীতি নির্ধারকরা কি জানে, বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিভাবে চলছে? বিশেষ করে নতুন প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অধিকাংশ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানারকম সমস্যায় জর্জরিত এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে উঠতে আরও অনেক সময়ের প্রয়োজন।”
কেউ কেউ আবার মজা করে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ‘অক্সফোর্ড’ স্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছেন সরকারকে। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে বিগত সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে ‘একটি বাড়ি একটি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রকল্প বলে মন্তব্য করেছেন।
শুধু হাস্যরস নয়, অনেকে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেও পোস্ট দিয়েছেন। ওরিয়েন্টাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইনস্ট্রাক্টর ইঞ্জিনিয়ার মো. খতিবুর রহমান নামে একজন সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে লিখেছেন, “শিক্ষাই একটি জাতির উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। যদি আমাদের দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে একটি করে মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাবে। এর ফলে শিক্ষার প্রসার ঘটবে, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।”
পোস্টের সঙ্গে তিনি একটি ফটোকার্ড যুক্ত করেন, যেখানে শিক্ষামন্ত্রীর ছবির সঙ্গে নিজের ছবি যুক্ত করে শিক্ষামন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন।