নবী (সা.) এর ‘জুতা মোবারক’ বলে এআই ছবিতে সয়লাব ফেবসবুক

১৪ অক্টোবর, ২০২৬

সোনালি রঙের একটি বক্সের উপরে সবুজ চাদর। এর উপরে রাখা পুরোনো ও ছেঁড়া একজোড়া জুতো। যেখানে চুমো দিচ্ছেন এক তরুণ। এমন ছবি ফেসবুকে আপলোড করে লেখা হয়েছে, ‘নবীজির জুতা মোবারকে চুমু দিতে পারার তৃপ্তি, দুনিয়ার সব তৃপ্তির চেয়ে দামি।’

গত ৪ অক্টোবর আপলোড হওয়া ছবিটিতে ২ দিনে রিয়েক্ট দিয়েছেন ২ লক্ষ ৬৭ হাজার মানুষ। পোস্টে কমেন্ট পড়েছে সাড়ে ৩ হাজার। শেয়ার হয়েছে ৫ হাজার ৪শ বার। 

অথচ ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ‘জুতা মোবারক’ দাবি করে একের পর এক ছবি পোস্ট করা হচ্ছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে। 

দেড় মাসে ৫ শতাধিক পোস্ট

দ্য ডিসেন্ট নির্দিষ্ট কী ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের ১৪ তারিখ পর্যন্ত শুধু ফেসবুকেই অন্তত ৫ শতাধিক পোস্ট পেয়েছে। এসব ছবির কোনোটিই আসল নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত তোপকাপি জাদুঘরে সংরক্ষিত রাসুলের (সা.) জুতার আদলে (কিছু ছবি ব্যতিক্রমও রয়েছে) এসব ছবি তৈরি করা হচ্ছে।

তবে এই ট্রেন্ডটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। চলতি বছরের জুন মাস থেকেই এ ধরনের ছবি পোস্টের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। সম্প্রতি এ ধরনের পোস্টের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন বয়সী ব্যবহারকারীরা এসব ছবি শেয়ার করছেন। ফেসবুকের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামেও এমন পোস্টের হিড়িক পড়েছে।

ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোতে নানা আবেগী দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেশিরভাগ ছবিতে চবুজ চাদের উপরে রাখা জুতোয় চুমু খাওয়ার দৃশ্য বানানো হয়েছে। কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে, গাড়িতে করে বিশালাকার একটি জুতা বহন করা হচ্ছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে, রাস্তার মাঝে বা উন্মুক্ত স্থানে রাখা জুতাটিতে মানুষ ভক্তিভরে চুম্বন করছে। কোনো ছবিতে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছে একদল মানুষ, আবার কোথাও দলবদ্ধভাবে জুতাটিতে চুমু খাওয়ার দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।  

এআইয়ের সাহায্যে শুধু সাধারণ মানুষের ছবিই তৈরি হচ্ছে না, বরং দেশের জনপ্রিয় আলেম ও পরিচিত মুখদেরও এসব ভুয়া ছবির চরিত্র বানানো হচ্ছে। মিজানুর রহমান আজহারী, শায়খ আহমাদুল্লাহ এবং সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো ব্যক্তিদের অবয়ব ব্যবহার করে এমন দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছে, যেন তাঁরাও সেই জুতায় চুমু দিচ্ছেন।

ছবিগুলো সত্যিকারের বলে বিশ্বাস করছেন অনেকে

ধর্মীয় আবেগ জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষদের অনেকেই খুব সহজেই এসব ছবি বিশ্বাস করছেন। দ্য ডিসেন্ট ভাইরাল হওয়া এসব পোস্টের অন্তত ২ হাজার কমেন্ট বিশ্লেষণ করেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ছবিগুলোকে সত্যিকারের দৃশ্য বলে বিশ্বাস করেছেন এবং ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।

একটি পোস্টে Unus Sheikh নামক একজন লিখেছেন, “ও ভাই তোমার তো সুযোগ হয়েছে আমাদের সে কপালও নাই।”

আজিজুল ইসলাম নামক একজন লিখেছেন, “সুবহানাল্লাহ”। Jannat Afiya নামক একজন লিখেছেন, “মাশাআল্লাহ”

তবে কিছু সংখ্যক ব্যবহারকারী কমেন্ট বক্সে ছবিগুলোকে ‘এআই দিয়ে তৈরি’ বলে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন।

এমন ছবি তৈরি অনুচিত মনে করে পোস্ট করছেন কেউ কেউ

কেউ কেউ এই প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা পোস্ট দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এ আই দিয়ে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের নামে এমন কাল্পনিক ও ভুয়া ছবি তৈরি করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অনুচিত এবং অবমাননাকর। 

অনেকেই নিজেদের টাইমলাইন ও বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করে অন্যদের সতর্ক করছেন। তাদের মতে, সস্তা লাইক, শেয়ার ও রিচ পাওয়ার আশায় ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এ ধরনের এআই ছবি ছড়িয়ে দেওয়া এক ধরনের সাইবার প্রতারণা। তারা সাধারণ ব্যবহারকারীদের এসব পোস্টে আবেগতাড়িত না হয়ে, যেকোনো ছবি শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানাচ্ছেন। 

আপন মিয়া নামক একটি ফেসবুক একাউন্ট থেকে লেখা হয়েছে, “আমরা নবীজি সা. কে ভালোবাসি, তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান পোষণ করি। কিন্তু সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ কি যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো কিছুকে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন বলে বিশ্বাস করার মাধ্যমে হওয়া উচিত? ইসলাম আমাদের সত্যতা যাচাই করতে শেখায়। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু বিশ্বাস, প্রচার কিংবা শেয়ার করার আগে তার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা আমাদের দায়িত্ব।”

তানজিদ মাহমুদ তুষার নামক একজন লিখেছেন, “ধর্মের নামে ভিউয়ের ব্যবসা, নবীজির শানে বেয়াদবি! AI দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করা অপরাধ নয়; কিন্তু ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে যাচাইহীন দাবি ছড়িয়ে আমরা নিজেরাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করছি, যার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ আমাদের ধর্ম ও প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে কটূক্তি করার সাহস পাচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেককে বিভিন্ন অশালীন ও অকথ্য ভাষায় মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে। নাউজুবিল্লাহ! আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শানে এমন বেয়াদবি সত্যিই অত্যন্ত কষ্টদায়ক।”