ইউনূসকে হেনস্থার ঘটনাটি যাদের জন্য কৌতুক ও আনন্দের উপলক্ষ্য
৮৬ বছর বয়সী এক অধ্যাপক হুইল চেয়ারে করে হাজির হয়েছেন নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে। সেখানে কিছু যুবক ও মধ্যবয়সী লোক হুইল চেয়ারটির গতিরোধ করে তাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে গালাগালি শুরু করলেন। গালিদাতারা মারমুখী। যদিও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে উচ্চারিত গালিগুলো কৌতুককর হয়ে ওঠেছে, কিন্তু তাদের মারমুখী ভাব পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে। বয়োবৃদ্ধ অধ্যাপক হাসিমুখে গতি পরিবর্তন করে অন্যদিকে চলে গেলেন। তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশের জনগণ অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে চলে যান, তারপর দায়িত্ব নেয় ইউনূসের সরকার। গত ১২ অক্টোবর নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে হেনস্থা করেছেন আওয়ামী লীগের পদধারী কয়েকজন নেতা।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে, সহস্রাধিক বিক্ষোভকারীকে খুন করে পালানো শেখ হাসিনা, তার সহযোগীবৃন্দ এবং পতিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিষয়ে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেয় ড. ইউনূসের সরকার। এরমধ্যে রয়েছে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করা, শেখ হাসিনা ও সহযোগীদের বিচার শুরু করা এবং তাদের অনেকের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া।
এসব কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে পলাতক আওয়ামী লীগের নেত্রী ও নেতারা বিভিন্ন সময়ে ইউনূসের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। সাথে তাল মিলিয়ে আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও মানবাধিকারকর্মীরা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই অর্থনীতিবিদের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদেশে বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানপন্থী ব্যক্তিদেরকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন আওয়ামীপন্থীরা।
দ্য ডিসেন্টের একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও পর্তুগালে বনি আমিন, হাসনাত আব্দুল্লাহ, মো. আকতার হোসেন, আখতার হোসেন, মাহফুজ আলম ও আসিফ নজরুলসহ একাধিক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা ও হেনস্তার ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগও এসেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় ১২ অক্টোবর ড. ইউনূসকে বিমানবন্দরে হেনস্থা করা হয়। এই ঘটনা আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য এনে দিয়েছে এক ‘কৌতুককর’ ও ‘আনন্দঘন’ মূহুর্ত। তাদের অনেকে সরাসরি আবার অনেকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে ঘটনাটিকে উপলক্ষ্য হিসেবে নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন।
এদিকে কতিপয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টিংয়ে দেখা গেছে ঘটনাটিকে আওয়ামী লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপনের প্রবণতা। আওয়ামী লীগ কর্তৃক সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে হেনস্থার ঘটনাটিকে ‘প্রবাসীদের তোপের মুখে’, ‘বিক্ষোভ’ ইত্যাদি শব্দে ফ্রেইম করা হয়েছে। একইরকম ফ্রেইমিং দেখা গেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও।
‘লাথি মেরে’ হুইল চেয়ার থেকে ফেলতে চান ‘মানবাধিকারকর্মী’
নিজেকে মানবাধিকারকর্মী পরিচয় দেওয়া ট্রান্স নারী হোচেমিন ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে ড. ইউনূসকে হেনস্থার ভিডিও শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, “হারামজাদা টা হুইল চেয়ারে বসছে কেন? লাথি মেরে ওকে চেয়ার থেকে ফেলে দেওয়া উচিৎ।”

বিমানবন্দরের ভিডিও শেয়ার করে তার ফেসবুক পোস্টে এরকম আক্রমানাত্মক ভাষায় আওয়ামীপন্থী সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর লিখেছেন, “নির্লজ্জ ইউনূস, সঙ্গে বান্ধবী।” একই পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “বাটপার ইউনূস, তোমার কপালে এটাই লেখা আছে, এমনকি মৃত্যুর পরেও! পালাবে কোথায়।”

আরেক আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক সাংবাদিক জায়েদ আহসান পিন্টু– যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিক্ষোভকারীদেরকে হত্যায় শেখ হাসিনাকে উস্কানি দিয়েছেন– লিখেছেন, “ “নিউটনের সূত্র মনে হয় কখনো পাল্টে গিয়ে এমন দাঁড়াবে: ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই দ্বিগুণ ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া রয়েছে।”

সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, বিমানবন্দরে ইউনূসকে শুধু প্রশ্ন করা হয়েছে; তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়নি বা গালিগালাজও করা হয়নি। একই পোস্টে তিনি ইউনূসের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যা, মানুষকে কারাগারে পাঠানো ও গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন।

দস্তগীর জাহাঙ্গীরের আরেকটি ফেসবুক পোস্টে ইউনূসকে উদ্দেশ করে লেখা হয়, “Shouldn’t the Cockroaches and Desh Drohis who betray their own people be confronted with the same public indignation wherever they go?” পোস্টে আরও বলা হয়, “No red carpet for betrayal. No unquestioning respect for those who forfeit the people's trust. Let accountability follow them wherever they go.”
দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক আজাদ বেগ তার ফেসবুক পোস্টে কৌতুক করে লিখেছেন, “যা দিনকাল পড়ছে, কিছুদিন পর তো ‘দৈনিক প্রেসারের খবর’ নামে নতুন পত্রিকা বের করতে হবে!

হেনস্থার ঘটনাটিকে ‘প্রতিদান’ হিসেবে দেখেছেন সাংবাদিক আবদুন নূর তুষার। তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “প্রেসার গ্রুপ? রিসেট বাটন? কতো কিছুই শিখিয়ে তিনি আজ নিজেই প্রেসারে...”।

একই পোস্টে তিনি নোবেলজয়ীদের প্রসঙ্গ টেনে লেখেন, “নোবেল বিজয়ীর ছবিতে একদিকে কালি, আরেক নোবেল বিজয়ীর চেয়ারে গালি!! কবিগুরু বলেছিলেন, যাদের করেছো অপমান, অপমানে হতে হবে তাদের সমান!”
প্রথম আলোর কলামিস্ট নাদিম মাহমুদ ঘটনাটি নিয়ে লিখতে গিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘প্রেসার গ্রুপ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিবের একটি মন্তব্যের জের ধরে।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক ইউনূসও ছাড় পেলেন না। আজ তিনি জেএফকে বিমানবন্দরে আওয়ামীলীগের প্রেসারের গ্রুপের খপ্পরে পড়লেন।”
একই পোস্টে তিনি ঘটনাটিকে ‘মব কালচারের এক্সটেনশন’ হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন, “বিষয়টি নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে অত্যন্ত লজ্জার।” প্রটোকল ছাড়া চলাফেরা করলে ভবিষ্যতে ইউনূসকে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের দায় আড়াল করে পদধারী আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’ হিসেবে ফ্রেইম করেছেন। পাশাপাশি ওই পোস্টের কমেন্টে তিনি লিখেছেন, “অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে যত শাসক এসেছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে অপদার্থ এবং কেউ কেউ বলেন মেটিকুলাসলি ক্ষতিকর ছিলেন ইউনূস। কী দুঃখজনক!”
পরে সামাজিক মাধ্যমে তার পোস্ট ও মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে পোস্টটি ডিলিট করে দেন আনিসুল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাংবাদিক রিপন দে তার ফেসবুক পোস্টে ইউনূসের সহকারী লামিয়া মোরশেদকে উদ্দেশ করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি লেখেন, “প্রেমিকের অপমানে যদি না কাঁদে তোর মন, বহুগামী তুই (লামিয়া), প্রেমিকের (ইউনুসের) দুশমন।”

ইউনূসকে হেনস্থার ঘটনায় যারা তার প্রতি সহানূভূতি জানিয়েছেন তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না লিখেছেন, “ইউনুসের দালালগুলোও ইউনুসের মত নির্লজ্জ। মীর জাফরটার প্রতি ভালোবাসা দেখি উথলে উঠছে অনেকের”।
অভিনেত্রী ও আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত রোকেয়া প্রাচী তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “শিশু ও পুলিশ হত্যাকারী ড. ইউনূসকে নিউইয়র্কে আটক করলেন প্রবাসীরা! দেশ ধ্বংসকারীদের স্থান এই পৃথিবীর কোথাও হবে না!”
কতিপয় মিডিয়ায় আওয়ামীপন্থী ফ্রেইমিং
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হেনস্তার ঘটনাটি বাংলাদেশের কতিপয় মিডিয়ায় ‘যৌক্তিক বিক্ষোভ’ আকারে উপস্থাপিত হয়েছে। ঘটনার বিবরণে হেনস্তাকারী আওয়ামী লীগারদের বক্তব্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
দৈনিক কালের কণ্ঠ, ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি সান, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও মাছরাঙা টিভি শিরোনামে ‘তোপের মুখে’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে। চ্যানেল আই, বাংলানিউজ২৪, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, বিডি টুডে ও দৈনিক শিক্ষাও একই ধরনের শিরোনামে খবর প্রকাশ করেছে।
এর মধ্যে কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজে একই ঘটনার ভিডিও ও ফটোকার্ড সাতবার প্রকাশ করা হয়েছে।
পোস্টগুলোতে ইউনূসকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করার পাশাপাশি ‘তোপের মুখে ইউনূস’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।
এসব শিরোনামে হেনস্তায় জড়িত ব্যক্তিদের আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।
বিপরীতে, ইনকিলাব, ঢাকা ডায়েরি ও টাইমস টুডে শিরোনামে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের পরিচয় এবং ‘হেনস্তা’ শব্দটি স্পষ্ট করেছে।