একটি মার্কিন C130J বিমান ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন আওয়ামী লীগাররা

২৩ অক্টোবর, ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তাকে একবারও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও অনুষ্ঠানে তিনি ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়েছেন, তবে কোথাও তার চেহারা দেখা যায়নি।

এর মধ্যেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকরা পুরোনো ও সম্পাদিত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে বারবার তাকে 'প্রকাশ্যে' আনার বা তার দেশে ফেরার দাবি প্রচার করে আসছেন।

এবার আওয়ামী লীগপন্থী ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজগুলোতে প্রচার করা হচ্ছে, মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান C-130J-তে করে নেভি সিল কমান্ডোদের প্রহরায় বাংলাদেশে ফিরতে চলেছেন শেখ হাসিনা। একই প্রচারণায় দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে ২০২৭ সালের জুনে দেশে ফেরার অনুরোধ জানিয়েছেন।

তবে দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব দাবি ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত ভিডিওগুলোর বক্তারাই তাদের বক্তব্যকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং ‘সম্ভবত’ বলে উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু অনিশ্চিত এসব দাবি– যেগুলো অনলাইনে আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন প্রোপাগান্ডামূলক একাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে– সেগুলোকে বিশ্বাস করে মন্তব্য এবং শেয়ার করছেন সাধারণ আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। পাঁচ শতাধিক এমন মন্তব্য এবং পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশিরভাগই মার্কিন C-130J বিমানে করে শেখ হাসিনার দেশের ফেরার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং তারা একে ঘিরে স্বপ্ন দেখছেন।

খবরটির সূত্র হচ্ছে 'সম্ভবত'

গত ২১ অক্টোবর ‘Tania Farzana’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে “সম্ভবত মার্কিন C130 J বিমানে মার্কিন সিল প্রহরায় দেশে অবতরণ করতে পারেন দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের মানবকন‍্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা” ক্যাপশনে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। 

ওই ভিডিতে বলা হয়েছে, “শেখ হাসিনা কিন্তু নিজেই বলেছেন যে আমি অবতরণ করা মাত্রই আমাকে গুলি করে হত্যা করা হতে পারে। অবতরণ কথাটার অর্থ কি বুঝেন? আকাশ থেকে যখন কিছু পড়ে সেটাকে বলা হয় অবতরণ। যেহেতু অবতরণ বলেছে সেহেতু তো একটা বাই ফ্লাই এরকম কিছু একটা বোঝা যায়।”

ওই বিমানে মার্কিন নেভি সিলের পাশাপাশি ভারতীয় ফোর্সও থাকবে দাবি করে তিনি বলেন, “সেই C130 বিমানটি নেভি সিল থাকবে। তার পেটের মধ্যে অসংখ্য সেনাবাহিনী থাকবে এবং ইন্ডিয়ান ফোর্স তো সাথে আছেই। ধরে নেন শেখ হাসিনা এই বিমানটিতেই দিল্লি থেকে বাংলাদেশে অবতরণ করবেন। ছাড়তে হতে পারে আবারও আপনাদেরও বাড়িঘর। মাইন্ড ইট।” 

তবে বক্তব্যের শুরুতে তিনি নিজেই বলেন, “সম্ভবত, আমি কিন্তু বলিনি আই এম ড্যাম শিওর বা হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর বা গ্যারান্টি দিয়েছি, এরকম না।”

একই দিন 'আপন বয়ান' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রায় একই ক্যাপশনে আরেকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়।

ভিডিওতে তরুণ ঘোষ নামক এক ভারতীয় সাংবাদিক দাবি করেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের এক গোপন বৈঠকে শেখ হাসিনাকে মার্কিন প্রহরায় বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। 

তিনি বলেন, “সম্ভবত একটা কথা হয়েছে যে ইউএস এয়ারফোর্সের C-one thirty সেই প্লেনটা আসবে আমাদের এই বিমানবন্দরে। সেখানে বেশ কিছু নেভি সিল থাকবে। পেটের মধ্যে প্রচুর সৈন্য থাকবে এবং প্লেনটা তো দোতলা তিনতলা প্লেন তো। ওর একটাতে executive কামরা আছে। সম্ভবত শেখ হাসিনা সেখানেই থাকবেন।”

তিনি কোন সুনির্দিষ্ট সূত্র বা প্রমাণ না দিয়ে ‘সম্ভবত’ এর উপর ভিত্তি করে এসব কথা বলেছেন।

মার্কিন কমান্ডো ও ভারতীয় বাহিনীর ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের বিরোধী পক্ষকে পালানোর হুমকি দিয়ে তরুণ ঘোষ আরও বলেন, “নেভি সিল কিন্তু বেশ কিছু সময়ের জন্য থাকবে। তারপরে তো ইন্ডিয়ান ফোর্স তো আছেই। ব্যাগপত্র গোছাও, এখনও সময় রয়েছে। কারণ চূড়ান্ত খেলা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে।”

তারেক রহমানের 'অনুরোধ'

পরদিন ২২ অক্টোবর ‘দাদা ভাই’ নামের একটি পেজ থেকে “২৭ সালের জুনে আসুন বলে শেখ হাসিনার কাছে তারেকের অনুরোধ” শীর্ষক ক্যাপশনে আরেকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। 

তিনি দাবি করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে আগামী ২০২৭ সালের জুনে বাংলাদেশে এসে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন, যা সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

ভিডিওগুলো বিভিন্ন আওয়ামীপন্থী অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা হয়েছে। 

এমন কিছু পোস্ট দেখুন  এখানে, এখানে, এখানে।

এছাড়ও অন্যান্য আওয়ামী পন্থী একাউন্ট থেকেও পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে “মার্কিন #C130J বিমানে সিল প্রহরায় দেশে ফিরতে চলেছেন”।

দেখুন এখানে, এখানে, এখানে। 

অর্থাৎ, যে দাবিটি মূল বক্তারাই নিশ্চিত নয় বলে স্বীকার করেছিলেন, সেটিই শেয়ার করছেন বিভিন্ন আওয়ামী সমর্থকরা।

বিশ্বাস করে স্বপ্ন বুনছেন সাধারণ আওয়ামী লীগাররা

ভিডিওর এসব বক্তব্য বিশ্বাস করছেন সাধারণ আওয়ামী লীগাররাও। Tania Farzana আইডি থেকে পোস্ট করা ভিডিওতে সাহান ইবনে করিম নামক একজন কমেন্ট করেছেন, “আলাহ্ যেন সহায় হোন।”

Murad Hussain নামক একজন কমেন্ট করেছেন, “আমাদের মাননীয় নেত্রী যত শীঘ্রই দেশে আসবেন সেটা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য মঙ্গলজনক কিছু মূর্খ আছে এটা বোঝেনা আপু আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই শুভকামনা আপনার জন্য।”

Mizan Khan নামক একজন কমেন্ট করেছেন, “সেই প্রতীক্ষায় রইলাম।” Sakil Ahmed লিখেছেন, “ইনশাআল্লাহ”

শেখ হাসিনাকে ‘প্রকাশ্যে’ আনার পুরনো প্রবণতা

শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়া কিংবা তাঁর দেশে ফেরার দাবি প্রচারের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। 

এর আগে গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে ছয়টি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের (রিউমার স্ক্যানার, বুম বাংলা, ফ্যাক্টওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, এএফপি ও দ্য ডিসেন্ট) প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পুরোনো ও সম্পাদিত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার দাবি অন্তত ৭৯ বার প্রচার করা হয়েছে।

এসব দাবির মধ্যে ছিল তাঁকে ভারতে দেখা যাওয়া, গাড়িবহর নিয়ে ঘোরাফেরা, বাংলাদেশে ফেরা, সীমান্তে উপস্থিতি, বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি। 

ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাইয়ে এসব দাবির পক্ষে প্রচারিত অনেক ছবি ও ভিডিও পুরোনো, সম্পাদিত কিংবা শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে শনাক্ত হয়েছিল।

আগের এসব প্রচারণার মতো বর্তমান দাবিগুলোর ক্ষেত্রেও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বক্তব্য ও ভিডিওকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। 

তবে আলোচ্য ভিডিওগুলোর বক্তারা নিজেরাই তাঁদের দাবিকে অনিশ্চিত বলে উল্লেখ করেছেন। 

C-130J আসলে কী ধরনের বিমান

মার্কিন বিমানবাহিনীর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সি-১৩০জে হলো সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবারের সবচেয়ে নতুন সংস্করণ। এর মূল কাজ যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি স্বল্প দূরত্বে মালামাল ও সৈন্য পরিবহন। কাঁচা বা মাটির রানওয়েতেও বিমানটি ওঠানামা করতে পারে। শত্রু এলাকায় প্যারাস্যুটে সৈন্য ও সরঞ্জাম নামানোর প্রধান বাহনও এটি।

বিমানটির পেছনে একটি বড় র‍্যাম্প বা ঢালু দরজা আছে। মার্কিন এয়ার মোবিলিটি কমান্ডের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই র‍্যাম্পের কারণে বিমানটিতে নানা ধরনের মালামাল তোলা যায়। এর মধ্যে আছে হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান, প্যালেটে সাজানো মালামাল।

এর মালামাল রাখার অংশ বা কার্গো কম্পার্টমেন্ট একটিই। 

মার্কিন এয়ার ন্যাশনাল গার্ডের ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, এর দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট (১২.৫ মিটার) এবং উচ্চতা ৯ ফুট (২.৭৪ মিটার)।