পিটিয়ে হত্যার পক্ষে ক্যাম্পেইনকারীরা এখন টঙ্গীর ঘটনায় ‘যাচাই বাছাই’ ও ‘আইন প্রয়োগের’ পক্ষে

২৩ অক্টোবর, ২০২৬

গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছরের শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে বুধবার পৌনে ১২ টার দিকে ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মুসলেউদ্দিনকে মারধর করেন শিশুটির বাবা ও স্থানীয় জনতা। পরে পুলিশ ওই শিক্ষককে গ্রেফতার করে।

ঘটনার পর আলেমদের অনেকেই অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

নারায়ণগঞ্জের  বাইতুন নূর পানাম সিটি বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব ও ইসলামী বক্তা হাফেজ মাওলানা ইসমাইল সিদ্দিকী এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেন, একটি শিশুকে চুমু এত বড় অপরাধ কিনা!

তিনি আরও প্রশ্ন তুলেন, ‘বিচার ছাড়া গণপিটুনি কেন?’ একই পোস্টে তিনি আলেমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান। 

দীর্ঘ এক ফেসবুক পোস্টে এই আলেম লিখেন, “হতে পারে, শিক্ষক শিশুটিকে স্নেহ করে চুমু দিয়েছেন। আবার এটাও হতে পারে, তাঁর আচরণটি অনুচিত ছিল। ভিডিওর পুরো ঘটনা ও প্রেক্ষাপট না জেনে কাউকে নির্দোষ কিংবা অপরাধী ঘোষণা করা আমাদের উচিত নয়। শিশুর বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে গণপিটুনি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলেও তার বিচার করার দায়িত্ব আইন ও আদালতের, উত্তেজিত জনতার নয়।”

মাওলানা ইসমাইল সিদ্দিকী নয় আরও অনেক আলেম টঙ্গীর ওই মাদরাসা শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। 

তবে এই আলেমদের অনেকেই আবার সম্প্রতি সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামক এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে সমর্থন করে পোস্ট দিয়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ শামীমকে হত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া কারী ফজলুল হক আমিনীকে ‘উম্মাহর বীর’, ‘প্রকৃত আশেকে রসুল’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তার মুক্তির দাবিতে নিয়মিত ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছেন।

শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ যাচাই বাছাইয়ের ধার না ধারলেও চুমু দেয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষককে মেয়েটির বাবা কর্তৃক মারধরের ঘটনায় অভিযোগের যাচাই বাছাইয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা। আইন লঙ্ঘন করে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সমর্থন জানালেও মাদ্রাসা শিক্ষকের বেলায় ‘আইন হাতে তুলে না নেয়া’ ও ‘আইনের আশ্রয়’ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

এরকম বেশ কয়েকজন আলেমের দুটি ঘটনায় দ্বিমুখী অবস্থানমূলক পোস্টের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

সাতক্ষীরায় পিটিয়ে হত্যায় সমর্থন, টঙ্গীতে ‘আইন প্রয়োগের’ পক্ষে

সম্প্রতি সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে  হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় পিটিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। তাকে হত্যার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন কারী ফজলুল হক আমিনী নামক এক ব্যক্তি। যিনি পেশায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক এবং সুযোগে ‘প্রক্সিতে ইমামতি’ করেন।  আমিনী শামীম মারা যাওয়ার পরও অনুতপ্ত না হয়ে বরং ‘গর্ব’ প্রকাশ করেছিলেন। 

যদিও শামীমের পরিবার জানিয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না এবং খুলনা ও ঢাকায় একাধিকবার মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।  

হত্যার নেতৃত্বদানকারী আমিনীও জানিয়েছিলেন, তিনি শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যাচাই বাছাই করেননি। 

তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “শামীম আসলেই এমন মন্তব্য করেছেন কিনা– তা কী যাচাই করেছিলেন?” আমিনী বলেছিলেন, “না ওইভাবে যাচাই আমি করার সুযোগ হয়নি, তবে যারা আমার কাছে এগুলো ইনফরমেশনগুলো দিছে তারা ওর একেবারে নিকটতম মানুষ।”

“পরিবারের দাবি শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ, তা জানতেন?” প্রশ্ন করা হলে আমিনী বলেছিলেন, “যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় সে আসলে অসুস্থ ছিল তাহলে তো ভিন্ন কথা। আমি অপরাধী। তার জন্য যে শাস্তি আছে অবশ্যই মাথা পেতে নেবো আমি। কিন্তু আমার কথা ওর আদ্যোপান্ত সমস্ত কথাগুলো শুনে একটাও তাকে পাগল হিসেবে বা মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তি হিসেবে মনে হয়নি। আপনারও মনে হবে না আপনি একটু শোনেন না তার বক্তব্যগুলো।”

শামীমকে হত্যার পর অনেকেই শামীমকে ‘শাতেম’ আখ্যা দিয়ে হত্যার নেতৃত্বদানকারী আমিনীকে ‘উম্মাহর বীর’, ‘মুসলিম বঙ্গের ইলমুদ্দীন’, ‘বাংলার সিংহ পুরুষ’ ও ‘দ্বীনের মুজাহিদ’ আখ্যা দিয়ে তার দ্রুত মুক্তির দাবিতে ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে।

তবে এই আলেমদের অনেকেই টঙ্গীতে মাদরাসা শিক্ষক কর্তৃক শিশু শিক্ষার্থীকে চুমুর ঘটনায় ‘যাচাই বাছাই’ করে ‘আইন প্রয়োগের’ পক্ষে। 

আজিজুল হক আল হাবিবী নামক এক আলেম এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, “একটা আলেমকে কোনরকম তদন্ত ছাড়া এভাবে মারধর করা এটা কোন দেশের আইন”

তবে সাতক্ষীরায় শামীমকে হত্যার নেতৃত্বদানকারী আমিনীর মুক্তি চেয়ে একাধিক পোস্ট রয়েছে তার টাইমলাইনে। এসব পোস্টের কোথাও শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত দাবি করেননি। বরং তদন্ত ছাড়াই আমিনীর মুক্তি চান তিনি। 

Mazharul Islam নামের আরেকটি আইডি থেকে টঙ্গীর ঘটনায় মারধরকারীদের বিপক্ষে বেশ সরব থাকতে দেখা যায়। ওই শিশু শিক্ষার্থীর বাবার বিপক্ষে কয়েকটি পোস্ট রয়েছে তার টাইমলাইনে। তবে এই আইডি ঘেটে দেখা যায়, সাতক্ষীরার শামীমের হত্যার নেতৃত্বদানকারীর মুক্তির দাবিতে পোস্ট রয়েছে। এক্ষেত্রে তিনিও যাচাই-বাছাই কিংবা তদন্ত চাননি।

সাইফুল ইসলাম নামক আরেকটি আইডি থেকে টঙ্গীর ঘটনায় লিখেছেন, “এটার তদন্ত হওয়া উচিত। হুজুরের বিচার এভাবে অভিভাবকরা প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে করতে পারেন কী না সেটাও আলাপে আসা উচিত।”

কিন্তু সাতক্ষীরার ঘটনায় আমিনীকে ‘ইলমুদ্দীন’ আখ্যা দিয়ে তাকে নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে তিনিও শামীমকে হত্যার ঘটনায় তদন্ত দাবি করেননি।

আবদুল হাফিজ হারুনী নামক আরেক ব্যক্তি টঙ্গীর ঘটনায় লিখেন, “কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি যাচাই-বাছাই করে আইনসম্মতভাবে ব্যবস্থা নেওয়াই উচিত। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে এভাবে একজন শিক্ষককে দলবল নিয়ে মারধর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

যদিও পোস্টটি তার টাইমলাইনে এখন নেই। 

তবে আমিনীর মুক্তির দাবিতে তিনিও সরব। মুক্তির দাবিতে কর্মসূচির ঘোষণা দিতে চাইলেও ওই ঘটনার তদন্ত চাননি হারুনীও।