বিজিবির দাবি ‘গোলাগুলির পর বিদেশি পিস্তল উদ্ধার’, পুলিশ বলছে ‘খেলনা পিস্তল’
গত ২৭ আগস্ট দেশের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে, “সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে গোলাগুলি, অস্ত্রসহ ভারতীয় আটক”, “মৌলভীবাজার সীমান্তে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র পর ভারতীয় নাগরিক আটক: বিজিবি”।
এসব খবর থেকে জানা যায়, ওই দিন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার কুমারশাইল সীমান্তে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড - বিজিবি এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করে। আটককৃত ব্যক্তির নাম বলাই নমসূত্র। আটকের আগে বলাইয়ের সাথে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ধরা পড়ার পর তার কাছ থেকে একটি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও ৫০০ পিস ইয়াবাও জব্দ হয়েছে বলে জানানো হয় বিজিবির পক্ষ থেকে। এরপর বলাইয়ের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে বড়লেখা থানায়।
তবে এই ঘটনার বর্ণনা এবং উদ্ধারকৃত জিনিসপত্রের বিষয়ে বিজিবির বক্তব্য, মামলার এজাহার এবং পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে।
বিজিবির দাবি ‘গোলাগুলির পর বিদেশি পিস্তল উদ্ধার’
গত ২৮ আগস্ট (শুক্রবার) রাত ৮টা ৩৭ মিনিটে Border Guard Bangladesh এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এ নিয়ে একটি পোস্ট করা হয়। যেখানে বলা হয়, ‘‘মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার কুমারশাইল সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে ভারতীয় চোরাকারবারীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বিজিবির বিশেষ অভিযানে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২ রাউন্ড .২২ বোরের গোলাবারুদ এবং ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ১ জন ভারতীয় চোরাকারবারীকে আটক করা হয়েছে।’’
পোস্টে আরও বলা হয়, ‘‘...প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ টহলদল রাত আনুমানিক ১০টার দিকে কুমারশাইল এলাকায় কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা কর। পরবর্তীতে চোরাকারবারী চক্রের সদস্যরা ওই এলাকায় আসলে বিজিবি সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করেন। এ সময় চোরাকারবারীরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। বিজিবি সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা ফায়ার করলে চোরাকারবারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা ধাওয়া করে একজন ভারতীয় চোরাকারবারীকে আটক করতে সক্ষম হন। এ সময় তার কাছ থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২ রাউন্ড .২২ বোরের গোলাবারুদ এবং ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।’’
বিজিবির এমন তথ্যের বরাতে বাংলাদেশের মূলধারার বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে।
মামলার এজাহারে লেখা RHINO ΤΟΥ Air Pistol উদ্ধার, গোলাগুলির উল্লেখ নেই
এ ঘটনায় বড়লেখা থানায় হওয়া মামলার এজাহারের একটি কপি সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট। এতে দেখা যায়, বিজিবির দেয়া বিবৃতির সাথে এজাহারে উল্লিখিত তথ্যের অমিল রয়েছে।
বিজিবির পোস্টে বলা হয়েছে, ‘‘বিজিবির বিশেষ অভিযানে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২ রাউন্ড .২২ বোরের গোলাবারুদ এবং ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ১ জন ভারতীয় চোরাকারবারীকে আটক করা হয়েছে।”
কিন্তু মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “উপস্থিত সাক্ষীদের মোকাবিলায় তাহার দেহ তল্লাশিকালে পরিহিত লুঙ্গির কোমরের পিছনে গোজা অবস্থায় ০১টি পিস্তল সদৃশ্য ইয়ারগান, যাহার গায়ে ইংরেজিতে RHINO ΤΟΥ Air Pistol লেখা আছে ও ০২রাউন্ড শিশা গুলি, অস্ত্রগুলির মূল্য অনুমান ১০,০০০/- টাকা উদ্ধার করিয়া ২৭/০৮/২০২৬খ্রি. তারিখ রাত ২২.৩০ ঘটিকার সময় জব্দ তালিকামূলে জব্দ করি এবং তাহার পরিহিত গেঞ্জির বাম পকেট হইতে বায়ু রোধী পলিথিনে মোড়ানো ৫০০ (পাঁচশত) পিছ গোলাপি রঙ্গের ইয়াবা ট্যাবলেট, যাহার মোট ওজন (৫০০x.১)=৫০ গ্রাম, মূল্য অনুমান (৫০০X৩০০)=১,৫০,০০০/-(এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা) উদ্ধারপূর্বক পর্যাপ্ত টর্চ লাইটের আলো ব্যবহার করিয়া একই তারিখ রাত ২২.৩৫ ঘটিকার সময় জব্দ তালিকামূলে জব্দ করি।’’
অর্থাৎ, বিজিবি তাদের বিবৃতিতে উদ্ধারকৃত অস্ত্রটিকে ‘বিদেশি পিস্তল’ এবং গুলিগুলোকে ‘২ রাউন্ড .২২ বোরের গোলাবারুদ’ বলে উল্লেখ করলেও মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি RHINO ΤΟΥ Air Pistol (বা খেলনা পিস্তল, যা মারণাস্ত্র নয়)। আর গুলির বিবরণে এজাহারে লেখা হয়েছে, ‘২ রাউন্ড শিশা গুলি’।
অন্যদিকে, বিজিবি দাবি করেছে আটক হওয়ার আগে আটক ব্যক্তি ও তার সহযোগীদের সাথে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এজাহারে গোলাগুলির উল্লেখ নেই।
বিজিবির পোস্টে বলা হয়েছে, ‘‘প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ টহলদল রাত আনুমানিক ১০টার দিকে কুমারশাইল এলাকায় কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। পরবর্তীতে চোরাকারবারী চক্রের সদস্যরা ওই এলাকায় আসলে বিজিবি সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করেন। এ সময় চোরাকারবারীরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। বিজিবি সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা ফায়ার করলে চোরাকারবারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা ধাওয়া করে একজন ভারতীয় চোরাকারবারীকে আটক করতে সক্ষম হন।’’
আর এজাহারে লেখা হয়েছে, ‘‘গত ২৭/০৮/২০২৬ ইং তারিখ রাত অনুমান ২১,০০ ঘটিকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানিতে পারি যে, দুইজন দুষ্কৃতিকারী ভারতীয় সীমানা অতিক্রম করে দুর্গম ও জঙ্গলাকৃর্ন পথ বেয়ে পায়ে হেটে বাংলাদেশের অভ্যান্তরে প্রবেশ করিতেছে। আমি তৎক্ষনাত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে সংবাদটি অবগত করিয়া সংবাদের সত্যতা যাচাই ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে বড়লেখা থানাধীন কুমারশাইল সীমান্ত এলাকায় মেইন পিলার ১৩৬৬/৫এস হতে অনুমান ৩০০ মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এম্বুস স্থাপন করিয়া অবস্থান করি। একই তারিখ রাত অনুমান ২২.২০ ঘটিকার সময় দুইজন ব্যক্তি দুর্গম ও জঙ্গলাকূর্ন পথে পায়ে হেটে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে আমার অভিযানিক টিমের সদস্য টর্চ লাইটের আলো জালাইলে আমাদের উপস্থিতি টের পাইয়া দৌড়ায়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করিলে ০১জনকে আটক করি এবং অপরজন দৌড়াইয়া পালিয়ে যায়। আটকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে উপরে উল্লেখিত নাম ঠিকানা প্রকাশ করে।’’
পাশাপাশি মামলা দায়ের করা হয়েছে যে দুটি ধারায় (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনে) তার মধ্যে অস্ত্র আইনের কোন ধারার উল্লেখ নেই।
যা বলছে বিজিবি ও পুলিশ
এ ব্যাপারে মামলার বাদী বিজিবি ৫২ ব্যাটলিয়ন হাবিলদার মং থোয়াই চিং মারমার সাথে যোগাযোগ করেছে দ্য ডিসেন্ট। তাকে প্রশ্ন করা হয়, অস্ত্র যদি পাওয়া গিয়ে থাকে তাহলে অস্ত্র মামলা দেয়া হলো না কেন?
উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘এটাতে নাকি অস্ত্র মামলা হয় না। এটাতে শুধু মাদক মামলা হবে। সাথে অস্ত্রটা একটা জিডি হবে।’’
জিডি করেছেন কিনা প্রশ্ন করলে তিনি জিডি করেছেন বলে জানান। জিডির কপি চাইলে বলেন, ‘‘জিডি কপি তো আমার ব্যাটালিয়নে চলে গেছে। আমি বিস্তারিত আপনাকে জানাচ্ছি একটু পরে।’’
তবে বড়লেখা থানার ওসি এবং বিজিবি-৫২ এর অধিনায়ক দু’জনই আলাদা জিডি হয়নি বলে জানিয়েছেন।
এজাহার এবং বিজিবির দেয়া তথ্যের গরমিলের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বড়লেখা থানার ওসি মনিরুজ্জামান খান বলেন, এজাহারে থাকা তথ্যই সঠিক।
পিস্তলের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘এটা হচ্ছে টয়, এয়ার পিস্তল। এবং এটা অস্ত্র না। মানে অস্ত্রের যে গোলাকারুদ, ফায়ার আর্ম যেটা, সেটা এটা না। এটা খেলনা হিসেবে ইউজ করে, এই যে বেলুন ফোটায়, পাখি মারার জন্য অনেক সময় ইউজ করে। এই সমস্ত ওই যে এয়ার গান আছে না, এটা সেরকম একটা এয়ার গান।”
উদ্ধার হওয়া দুটি গুলির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘উদ্ধার হওয়া গুলি পয়েন্ট ২২ বোর না।’’
বিজিবি যে পয়েন্ট ২২ বোর বললো— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘বিজিবি ব্যাখ্যা দিবে তাদের বক্তব্যের। আমি যেটা পাইছি সেটা তাদের এজাহার অনুযায়ী এবং আমরা যে আলামত পেয়েছি সেটার মিল আছে। তারা বলছে শিশা গুলি, তারপরে বলছে যে টয়, এয়ার পিস্তল। এটা আমি পাইছি যেভাবে, সেভাবেই রিসিভ করছি।’’
অভিযানে গোলাগুলির ব্যাপারে বলেন, ‘‘তারা বলছে গোলাগুলি হইছে কিন্তু আমাদের এজাহারে বলে নাই। পরে যখন জিজ্ঞেস করছি যে, ঘটনা কী? তখন এসিস্ট্যান্ট কমান্ডার আমাকে ফোন করে বললেন যে, বর্ডারে একটা গুলির শব্দ শুনছি, পরে দুইটা ফাঁকা ফায়ার করছি। এটা বলছে।’’
অন্যদিকে এজাহারে থাকা তথ্যের চেয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়নের (বিয়ানীবাজার) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান।
তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিজিবির দেয়া তথ্যের সাথে এজাহারের তথ্যের গরমিল কেন? তিনি বলেন, ‘‘এজাহার তো জাস্ট একটা দায়ের করা, বাট ইনভেস্টিগেশন তো এখনো শেষ হয়নি এবং আমরা যেই সোর্সের ইনফরমেশনে বলছি বা যেটা বলছি এটা ফরেনসিকে যাবে। এটা একটা পিস্তল, পিস্তলের গায়ে কী লেখা আছে দ্যাট ডাজন্ট ম্যাটার। ইনভেস্টিগেশন হওয়ার পরে এটা কি আদৌ প্রাণঘাতী কিনা সেটা বোঝা যাবে। কারণ এটার সাথে আমরা যেই এমুনিশন পেয়েছি, দ্যাট ইজ এ লিথাল এমুনিশন, এটা প্রাণঘাতী। তো এটাকে আমরা যতটুকু দেখতে পেয়েছি এটা মডিফাইড। বাট অবশ্যই এটা বিদেশী পিস্তল বিকজ আপনার মানে এটা তো আর আমাদের দেশি যে লোকাল গান আছে বা লোকাল মেইড আছে এরকম কোন কিছু না।’’
এজাহারে উদ্ধার হওয়া গুলিকে শিশা গুলি বলা হয়েছে কিন্তু বিজিবির তথ্য অনুযায়ী গুলি পয়েন্ট ২২ বোর— এমন অমিল কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান জানান, এজাহারে এমন গুলির কথা উল্লেখ আছে।
তখন তাকে এজাহারে থাকা গুলির বিবরণের তথ্য পড়ে শোনালে তিনি উত্তরে বলেন, ‘‘আচ্ছা পয়েন্ট ২২ বোর লেখা থাকতে হবে। আই অলরেডি সেন্ট মাই স্টাফ টু দি ওসি এন্ড হি ইজ অলসো টকিং টু দি ওসি বিকজ ওইদিন রাতে তো আপনার হচ্ছে এজাহারটা তো দায়ের করে পুলিশ এবং এটা নিয়েও আমরা কাজ করছি।’’
তাকে আবার প্রশ্ন করা হয়, এজাহারে ঘটনাস্থলে কোন ধরনের সংঘর্ষ কিংবা গোলাগুলির ব্যাপার উল্লেখ নাই কেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘অবশ্যই থাকতে হবে। এটা তো না থাকার কোন অপশন নাই।’’
প্রাথমিকভাবে অস্ত্র পেয়েছেন, তাইলে ওই সময় কেন অস্ত্র মামলা হইলো না?--- এমন প্রশ্নের উত্তরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান বলেন, “এটা তদন্তের পরে যুক্ত হতে পারে।”
RHINO ΤΟΥ Air Pistol কী
Rhino Toy Air Pistol হলো মূলত বিনোদন এবং নিশানা অনুশীলনের (টার্গেট প্র্যাকটিস) কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো আসল আগ্নেয়াস্ত্র নয়, তাই এটি কেনা বা ব্যবহারের জন্য কোনো আইনি লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না।
এই পিস্তলটি বাংলাদেশে এবং ভারতের বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রি হতে দেখা যায়।