নারী রাজনীতিবিদকে ‘খাট কাঁপানো আপু’ বললেন দেশ রূপান্তরের সাংবাদিক
রাজনৈতিক প্লাটফরম অল্টারনেটিভস-এর সংগঠক ডা. তাজনূভা জাবীন গতকাল রোববার তার ফেসবুক আইডিতে লাইভে এসে চলমান ডেঙ্গু সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তার লাইভের নিচে আপত্তিকর কমেন্ট করে তাকে আক্রমণ করেন দেশ রূপান্তরের সাংবাদিক রমজান আলী। রমজান আলী ডা তাজনূভা জাবীনকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, “খাট কাপানো আপু।”
রমজান আলী বর্তমানে দৈনিক দেশ রূপান্তরে ব্যাংক বিটে কাজ করেন বলে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট। তবে রূপায়ণ গ্রুপ ও দেশ রূপান্তরের একাধিক সূত্র দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে রমজান আলী মূলত রূপায়ণ গ্রুপের হেড অফিসে সংযুক্ত।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, হেড অফিস থেকে পরিচালিত একটি ইনভেস্টিগেটিভ সেল রয়েছে এবং ওই সেলের সদস্য হিসেবে তিনি যেসব প্রতিবেদন করেন সেগুলো রূপায়ণ গ্রুপের মালিকানাধীন পত্রিকা দেশ রূপান্তরে ও এশিয়ান টিভিতে প্রকাশিত হয়।
রমজান আলী ইতিপূর্বে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার ফেসবুক আইডিতে লেখা রয়েছে তিনি ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক ছিলেন।
রমজান আলীর করা মন্তব্য নিয়ে অল্টারনেটিভসের সংগঠক ডা. তাজনূভা জাবীন ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আগে এ ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য বিভিন্ন ফেক আইডি থেকে আসতো। কিন্তু গত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে লক্ষ্য করছি এধরণের ভয়াবহ আপত্তিকর মন্তব্য অরজিনাল আইডি হোল্ডারদের থেকে আসছে। এই লোকটার ফেসবুক ঘাটলে দেখা যায় সে আওয়ামী লীগের একজন পদধারী নেতা বা কর্মী এবং একইসঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যমে কর্মরত একজন সাংবাদিক। জুলাই-পরবর্তী সময়ে এরকম একটি দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করার পরও যদি তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হয়, তবে তাদের এই ঔদ্ধত্য আরও বাড়বে। আমরা যারা এসব বিষয়ে সোচ্চার তারাই যদি এগুলা নিয়ে চুপচাপ থাকি তাহলে যারা জুলাইতে অংশ নিয়েছে কিন্তু এখন নীরব আছেন তাদের জন্য পরিস্থিতিটা খুবই ডিফিকাল্ট হয়ে যাবে।”
অভিযুক্ত রমজান আলীর শাস্তি দাবি করে এই নারী রাজনীতিবিদ আরও বলেন, “কোনো অপরিচিত আইডি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো কর্মীর মন্তব্য করা আর ঢাকায় বসে একটি স্বনামধন্য পত্রিকায় কাজ করা সাংবাদিকের এমন আচরণের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। দেশ রূপান্তর কতৃপক্ষ যদি এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয় তাহলে দেশ রূপান্তরের বিরুদ্ধে আমি আইনী ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো। আমাদের মতো রাজনীতিতে সক্রিয় মানুষদের পোস্টে এমন মন্তব্য করে তারা যদি পার পেয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে! অভিযুক্তকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। এই ঘটনার দায় অবশ্যই দেশ রূপান্তর কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।”
আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালান রমজান আলী
রমজান আলীর ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায় তিনি অব্যাহতভাবে পতিত আওয়ামী লীগের পক্ষে, জুলাই আন্দোলন, ড. ইউনূস ও বর্তমান সরকারের বিপক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। একাধিকবার অপতথ্য ছড়াতেও দেখা গেছে তাকে।
গত বছরের ১ জুলাই রমজান আলী তার ফেসবুকে লিখেছেন, “জুলাই নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক। জয় বাংলা।”
এ বছরের ১ জুলাই তিনি লিখেছেন,
“জুলাই মানে ষড়যন্ত্র গুজব আর ছু- মন্ত্র
জুলাই মানে জ'ঙ্গি হা'ম'লা
মব আর মিথ্যা মামলা
জুলাই মানে ধোঁকাবাজি
মেটিকুলাস কারসাজি
জুলাই মানে গুপ্তহ'ত্যা
পাকিস্তানি প্রেতাত্মা
জুলাই মানে দেশ ধ্বংস
৭১ এর পরাজিত অংশ
জুলাই মানে পাকিস্তান
জঙ্গি বাহিনীর অভ্যুত্থান।”
গত ২০ ফেব্রুয়ারি লিখেছেন, “ইউনূস বাটপার দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। ওর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগরে জমা দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
গত ২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি যুক্ত করে তিনি পোস্ট করেছেন, “কে জানি বললো দেশে এখন বিচারবহির্ভূত হ*ত্যাকাণ্ড নেই। তবে ৫ মাসে এক হাজারের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড...।”
গত ৫ সেপ্টেম্বর পলাতক শেখ হাসিনার ছবি যুক্ত করে রমজান আলী লিখেছেন, “শেখ হাসিনা যেদিন দেশে ফিরবেন—সেদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঠেকানোর প্রস্তুতি নিলেও সরকার কিছুই করতে পারবেনা। কারণ সেদিন— • কৃষক লাঙল রেখে রাজপথে নেমে আসবে। • রিকশাচালক রিকশার প্যাডেল থামিয়ে মিছিলে যোগ দেবে। • বাস, টেম্পু, ট্যাক্সিচালক স্টিয়ারিং ছেড়ে নেমে আসবে। • শ্রমিক তার মেশিনের চাকা থামিয়ে দেবে। • ব্যবসায়ী তার বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পেতে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাবে। • দোকানিরা তাদের ব্যবসা সচল রাখতে দোকানের ঝাঁপ ফেলে রাস্তায় চলে আসবে। • শিক্ষক তার সম্মান পুনরুদ্ধারে ক্লাস ছেড়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াবে। • মুক্তিযোদ্ধারা অপমানের অশ্রুজল নিয়ে হুংকার দেবে।… তখন কাকে প্রতিহত করবেন? মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও অংশগ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।”
যা বলছে রূপায়ণ
রমজান আলীর করা মন্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে রূপায়ণ গ্রুপের পত্রিকা দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করেছে আমাদের তো সবসময় দেখার সুযোগ থাকে না। এই সাংবাদিক রমজান আলী দেশ রূপান্তরে সরাসরি কাজ করেন না, তবে আমরা তার কিছু কিছু রিপোর্ট ছাপাই। সে পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না। আমি এই ব্যাপারে বিব্রত, যেহেতু সে আমাদের পরিচয় ব্যবহার করে। আমি যেটা করতে পারি চেয়ারম্যান মহোদয়কে জানাতে পারি যে সে এই বিষয়টা করেছে।”
এই ব্যাপারে জানার জন্য তিনি রূপায়ণ গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুলের বক্তব্য জানার জন্য তার ব্যক্তিগত সহকারী মেহেদি হাসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি গ্রুপটির পক্ষ থেকে দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা এই ধরনের আচরণ কোনভাবেই সমর্থন করিনা। যেকেউ তার মত-দ্বিমত প্রকাশ করতে পারে, তাই বলে এধরণের মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এটা আমাদের পলিসির সাথে সাংঘর্ষিক। তার সাথে কথা হয়েছে, সে কমেন্টটা ডিলেট করেছে। তার ব্যাপারে আমাদের পলিসি ও আইন অনুসারে মানবসম্পদ বিভাগ থেকে শীগ্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের ম্যানেজমেন্ট এই ব্যাপারে একটা ডিসিশনে যাবে।”
মেহেদি হাসানের কাছে দ্য ডিসেন্ট জানতে চায় রমজান আলী কি রূপায়ণ গ্রুপের কর্মী নাকি দেশ রূপান্তরের কর্মী। তিনি দাবি করেন রমজান আলী রূপায়ণ গ্রুপ ও দেশ রূপান্তরের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করেন।
অভিযুক্ত রমজান আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে দ্য ডিসেন্ট। এক পর্যায়ে কল রিসিভ করলেও দ্য ডিসেন্টের পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কলটি কেটে দেন। পরবর্তীতে আবারও কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ না করে কেটে দেন।