কেরানীগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার ১৬
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি একতলা মাদ্রাসা ভবনে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মাদ্রাসা ভবনটির দুটি দেয়াল উড়ে যায় এবং নারী-শিশুসহ ৪ জন আহত হয়৷ পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৯টি তাজা বোমা, গ্যালন ভর্তি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, এসিটোন ও নাইট্রিক এসিডসহ ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, বোমা তৈরির পাউডার, শর্টগানের গুলিসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
এ ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে গত ৩ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অন্তত ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়ার পর কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এন্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তবে এই কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি৷ এটিইউ’র বাইরে আরেকটি গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্রও দ্য ডিসেন্ট-কে এসব গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল নামের যে মাদ্রাসা ভবনটিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে সেটি পরিচালনা করতেন শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। বোমা বিস্ফোরণের পরপরই আল-আমিন তার আহত দুই শিশু সন্তান ও স্ত্রী আছিয়া খানমকে নিয়ে প্রথমে আদ-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে পালিয়ে যান। সেই থেকে আল-আমিন পলাতক থাকলেও ঘটনার পরপরই আল-আমিনের স্ত্রী আছিয়া ও আরও দুই নারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
পরে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কদমতলীতে অভিযান চালিয়ে আল-আমিনকেও গ্রেফতার করে পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিট। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে তুলে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তাকে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
আল-আমিন আইএস মতাদর্শী ‘নিউ-জেএমবি’র সাথে যুক্ত বলে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে সন্ত্রাস দমন নিয়ে কাজ করা পুলিশের একাধিক সংস্থার সূত্র। ইতোপূর্বে আল-আমিনের নামে সন্ত্রাসবিরোধী ধারাসহ ৭টি মামলা ছিল। এবং সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতারও করা হয়।
কেরানীগঞ্জে বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজহার থেকে জানা যায়, আল-আমিনের স্ত্রীসহ গ্রেফতারকৃত অন্য দুই নারীর দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমে শাহীন ওরফে আবু বকর ওরফে ডিবা সুলতান (৩২) নামে একজনকে গ্রেফতার করে।
আবু বকরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ‘নিউ-জেএমবি’র বোমা বানানোর মূল কারিগর ছিলেন।
তাকে জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত ছিলেন একাধিক সংস্থার অন্তত ৩জন কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো। এই লক্ষ্যে আল-আমিন ও আবু বকর মোট ৮৫টি বোমা তৈরি করেন ও বিতরণ করেন।
আবু বকরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় আরও বেশ কয়েকজনকে। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে নিউ জেএমবির সামরিক কমান্ডার হিসেবে হাফিজ নামে একজনের ব্যাপারে জানতে পারে পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিট। হাফিজ এখনও পলাতক থাকলেও তার শ্বশুর আব্দুর রহমানকে ইতিমধ্যে যশোর থেকে গ্রেফতার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। হাফিজের গাড়ি চালক রায়হান নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গত ৩১ জানুয়ারি ৪টি পিস্তল, ৩৯ রাউন্ড গুলি, ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড ও ২টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কেরানীগঞ্জে উদ্ধারকৃত তরল রাসায়নিক ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে কী ধরনের বিস্ফোরক তৈরি করা হচ্ছিল সে সম্পর্কে এটিইউ'র বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের কাছে জানতে চাইলে কেউই স্বনামে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এটিইউ'র একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, এসব উপাদান দিয়ে মূলত টিএটিপি (ট্রাইএসিটোন ট্রাইপারক্সাইড) তৈরি করা হচ্ছিল। আত্মঘাতী হামলার জন্য সাধারণত এ ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। এ কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন টিএটিপি প্রবলভাবে বিস্ফারিত হয় তবে কোন দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে না এলে সাধারণত আগুন তৈরি করেনা।
উল্লেখ্য, কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণে মাদ্রাসা ভবনের দেয়াল উড়ে গেলেও আগুন তৈরির ঘটনা ঘটেনি৷ বিস্ফোরণের সিসিটিভি ফুটেজেও আগুনের কোন উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়নি।
কেরানীগঞ্জে বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তার সকলেই নিউজেএমবি'র সদস্য কিনা তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট।