মোবাইল চোর সন্দেহে শিশুকে নির্মম মারধর, চাকরিচ্যুত হয়ে হাসপাতালে সেই সিকিউরিটি গার্ড
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন সিকিউরিটি গার্ড একজন মেয়ে শিশুকে নির্মমভাবে মারধর করছেন। ভিডিওটি শেয়ার করে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘‘এক টুকরো রুটি চুরি করে খাওয়ার অপরাধে মিরপুর এলাকার কোন এক মার্কেটের নিরাপত্তা কর্মী।’’
শাহনেওয়াজ খান নামক একটি আইডি থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘‘মিরপুর-১ এই শিশু বাচ্চাটি এক পিচ রুটি চু/রি করে খেয়েছিলো তার কারণে মা'রছে। কিন্তু বিষয় হচ্ছে কত মানুষ কত কি করে তাদের কোন বি'চার হয় না। আর সাধারণ একপিচ রুটির জন্য এভাবে মা*রলো!’’
এরকম দাবি সম্বলিত আরো কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে।
দ্য ডিসেন্ট ভিডিওটিকে মিরপুর শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্স এলাকায় জিওলোকেট করেছে। এরপর সেখানে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কথা বলে জানা গেছে, মূলত মোবাইল চুরির অভিযোগে মেয়ে শিশুটিকে মারধর করা হয়েছিল। পথশিশু ওই মেয়েকে কেউ চেনে না এবং মারধরের শিকার হওয়ার পর তাকে ওই এলাকায় দেখা যায়নি।

শিশুটিকে মারধরের ঘটনাস্থল
মারধরে অভিযুক্ত সিকিউরিটি গার্ডের নাম রিপন মিয়া। শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন। তার সহকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চাকরিচ্যুত করেছে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটি কোম্পানি। এরপর রিপন গতকাল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি বিএম সিকিউরিটি কোম্পানির অধীনে চাকরিতে ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনাটি ঘটেছিলো গত ৩ অক্টোবর রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে। শিশুটিকে একজন পথচারী মহিলার আইফোন চুরির অভিযোগে আটক করা হয়। পরে মারধরকারী সিকিউরিটি গার্ড রিপন মিয়া সেখানে উপস্থিত হন। ওই শিশুটি রিপন মিয়ার চুরি হওয়া ফোনও চুরি করেছে সন্দেহ করে তাকে মারধর করেন।
ঘটনাস্থলের ঠিক সামনেই অবস্থিত ভাই ভাই স্যানিটারি হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. ফিরোজের কাছে ঘটনাটির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘ওইদিন দেখলাম মেয়েটিকে মারছে ওই মার্কেটের দারোয়ান। সবাই বলাবলি করছিল যে মোবাইল চুরি করেছে মেয়েটি।’’
পাশের আল্লাহর দান হার্ডওয়ারের দুই কর্মচারী শফিকুল ইসলাম ও মো রাসেল বলেন, ‘‘ওই দিন ঘটনাস্থলে আমরা ছিলাম। শুনছি আইফোন চুরি করছে মেয়েটি। দেড় লাখ টাকা দামের ফোন। ঘটনা ঘটছে শনিবার রাত আটটা থেকে নয়টার দিকে। মেয়েটা নাকি একজন মহিলার আইফোন চুরি করে আরেকজনকে দিয়ে দিছে।”
শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড ইনচার্জ মো. আব্দুর রশিদ বলেন, “ওই গার্ডের মোবাইল চুরি হয়েছিল। সে সন্দেহ করেছে এই মেয়েটি মোবাইল চুরি করেছে। এজন্য ধরে মারধর করেছে। পরে কোম্পানি তাকে ওইদিনই চাকরিচ্যুত করেছে।”

মারধরকারী রিপন মিয়া এই মার্কেটের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করতেন
এ বিষয়ে বিএম সিকিউরিটি কোম্পানির এমডি বরুণ হালদার আকাশ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “রিপন মিয়া ১৫/২০ দিন হবে আমাদের কোম্পানির অধীনে কাজ করে৷ ওর বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জে। ওইদিনের ঘটনাটা আমাকে মার্কেট কর্তৃপক্ষ জানাইছে। আমি ভিডিওটি দেখেছি। পরে ওই গার্ডকে চাকরিচ্যুত করেছি আমরা। শুনেছি এখন অসুস্থ। হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।”
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রিপন মিয়া
সিকিউরিটি গার্ড রিপন মিয়া গতকাল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের লিফট অপারেটর মো. শাওন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ও মেয়েটারে মোবাইল চুরির অভিযোগে পিঠাইছে। আমি ওরে জিজ্ঞেস করছি যে কেন মারছো মেয়েটারে। তুমি কি দেখছো যে সে মোবাইল চুরি করছে? পরে কালকে দেখি সে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পরে তাকে পাশের একটা হাসপাতালে নেওয়া হইছে। পরে তাকে ডাক্তার সোহরাওয়ার্দীতে নিতে বলে। এখন সে সেখানে ভর্তি আছে।”
আরেক ব্যবসায়ী, নিউ মাসুদ চুমকি মেলার স্বত্বাধিকারী মো. মাসুদ বলেন, “ওই গার্ডের একটু মানসিক সমস্যা আছে। একটু এবনরমাল টাইপ আরকি৷ কালকে নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ছে শুনছি। হার্টে ব্লক নাকি কী হইছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে।”
সেই গার্ড রিপন মিয়ার বাবা নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘‘ওর মিনি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে৷ আমরা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে আছি। অনেক টেস্ট দিছে ডাক্তার সেগুলো করাচ্ছি।”