কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে ‘জয় বাংলা’ লিখে উল্লাস করছে কারা?

১৬ মে, ২০২৬
দীর্ঘদিন লিভার–সংক্রান্ত জটিলতায় ভোগার পর মৃত্যুবরণ করেছেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়ার পর শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কারিনার মৃত্যুর বিষয়টি তার বাবা জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কায়সার হামিদ এক ফেসবুক পোস্টে নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে কারিনার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই শোক প্রকাশ করছেন। তবে শোক প্রকাশের পাশাপাশি অনেককে উল্লাসেও মেতে উঠতে দেখা গেছে কারিনার মৃত্যুতে। ‘জয় বাংলা’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ সহ বিভিন্ন শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কারিনার মৃত্যু  উদযাপন করতে দেখা গেছে। এছাড়াও কারিনাকে উদ্দেশ্য করে ‘লুটপাটকারী’, ‘চোর’, ‘জুলাইজঙ্গী’ সহ বিভিন্ন প্রকাশ অযোগ্য শব্দে কটুক্তি করতেও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
উল্লাসকারীদের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, যারা এ ধরণের পোস্ট দিচ্ছেন অধিকাংশই আওয়ামীপন্থী। এসব প্রোফাইল থেকে নিয়মিত বর্তমান সরকারের বিপক্ষে এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের পক্ষে পোস্ট করা হয়। পোস্টকারীদের মধ্যে আওয়ামী অ্যাক্টিভিস্ট ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।
শামিম সওদাগর নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, “কারিনা কাওছার আর নেই। আলহামদুলিল্লাহ জয় বাংলা।”
নাজিম শেখ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, “প্রিয় কারিনা কাইসার তুমি কি জানো! তোমার মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তোমার মা কে বলে দিও, সেই দিনের গণভবনের ঘটনার জন্য যেন, ক্ষমা চেয়ে নেয় জাতির কাছে, না হয় মিনিমাম ৮ কোটি মানুষের অভিশাপ, তোমাকে পরকালেও শান্তিতে থাকতে দিবে না, দেখ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, দিল্লি না ঢাকা স্লোগান দিয়ে শান্তিপূর্ণ একটা দেশকে অশান্ত করে,আজ তুমি সেই দিল্লি থেকেই চির বিদায় নিলে,ভালো থেকো আবু ছায়েদ,হাদীর সাথে এবং  দেখা কর মনের দুঃখ শেয়ার কর ,ইউনুস তোমাদের খোঁজ খবর রাখবে টেনশন নিও না আর যা যা লাগে দাঁতল মোসাদ্দেক ও ডাক্তার যারা এর মাধ্যমে পাঠানো হবে কোন টেনশন নিও না। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।’’
Supporters of Bangladesh Awami League নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে হাম্মাদ আলী জোহান মল্লিক লিখেছেন, “গণভবনে লুটপাটকারী এই কারিনা কায়সার পিতা বিখ্যাত ফুটবলার কায়সার হামিদ এই মুহুর্তে লাইফ সাপোর্টে আছে। গনভবন লুটপাট করে সেদিন কারিনা উল্লাস করেছিল কিন্তু আজ যদি আওয়ামীলীগের সমর্থকরা কারিনা কায়সারের লাইফ সাপোর্ট নিয়ে উল্লাস করে তাহলে কি ভুল হবে? তারপরও সবাই উনার জন্য দোয়া করুন কারন ওনার সাথে হিসাব বাকী আছে। জয় বাংলা।”
রুবেল হোসেন নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “মারা গেছে ভারতে  হসপিটালে কারিনা। আলহামদুলিল্লাহ। চেনা যায়নি কারিনারে? নেত্রীকে অপমান করে এতো উল্লাস! কোথায় আজ আপনি অথচ আজও টিঁকে আছে আমার নেত্রী । জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু জয়তু শেখ হাসিনা।”
হাসিনা আমার মা নামে একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে লেখা হয়েছে, “আলহামদুলিল্লাহ। জুলাই জঙ্গি মুর্দাবাদ। কারিনা কায়সার মুর্দাবাদ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।”

এম.ডি বাবু নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে একটি কমেন্টে ৮২ বার আলহামদুল্লিাহ লেখা হয়েছে। 
এসটিএস চিশতি নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী একটি কমেন্টে লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ, দিল্লি না ঢাকা স্লোগান দেয়া মেয়ে টা আজকে দিল্লিতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।”
মোহাম্মদ পলাশ হোসেন নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী একটি কমেন্টে লিখেছেন, “দিল্লি না ঢাকা। অবশেষে দিল্লি গিয়ে পটল তুলতে হলো। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনা।”
মনির হোসেন নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী কারিনাকে ‘জুলাই সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে ভিডিও পোস্ট করেছেন। তিনি প্রোফাইলে নিজেকে ৩ নং ভুলইন উত্তর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ক্যাপশনে লিখেছেন, “মারা গিয়েছে জুলাই সন্ত্রাসী কারিনা কায়সার। আলহামদুলিল্লাহ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।”
মুনিয়া মোস্তারী প্রিয়া নামে একজন ‘‘আলহামদুলিল্লাহ ও ঈদ মোবারক” হ্যাসট্যাগ দিয়ে ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “লাল বাংলাদেশ ২.০ তে ঈশ্বর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে  অতিদ্রুত রায় দেন। যেহেতু তুমি বানিয়ে, চালু করে এখন নিজে earn করেছো। Here you go Karina, RIP (Rot In Piss)”
এমসি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেওয়া তেলেন্ত কান্তি দাস ফেসবুকে কারিনার ছবি যুক্ত করো মোট ছয়টি পোস্ট করেছেন। একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘‘হাদির সাথে দেখা করতে চান্দে গমন করলেন কারিনা কায়সার। আল্লাহর মাল আল্লাহয় নিসে তাতে আমাদের কি।’’ 
এদিকে এই ধরণের উল্লাসকে ‘‘অধিকার’’ মনে করছেন আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট সুশান্ত দাস গুপ্ত। কারিনার মৃত্যুর পর এই এক্টিভিস্ট তার ফেসবুক প্রোফাইলে ‘‘Gone” লিখে একটি পোস্ট করেন। সেখানে কমেন্টে কারিনার বাবার পোস্ট সংযুক্ত করেন এই অ্যাক্টিভিস্ট আরো তিনটি স্ট্যাস্টাস দেন। 
একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, “কোন জুলাই সন্ত্রাসী মারা গেলে আনন্দিত হওয়াটা আমাদের অধিকার। কারো যদি এতো পীরিত থাকে জুলাই সন্ত্রাসীর জন্য, তাহলে সে চুপ থাকলেই পারে। আমাদের আনন্দে লেকচার দেওয়ার তো দরকার নাই। ভুলে গেলে চলবে না এটা যুদ্ধ। যুদ্ধে শত্রুপক্ষের কলিজায় আঘাত করতে হয়। চোখে আংগুল দিয়ে দেখাতে হয়, তারা কতোটা ঘৃনিত। তাদের মৃত্যুও মানুষ আনন্দে উদযাপন করে।”
ডাক্তার আইজুদ্দিন নামে আওয়ামী অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুক পোস্টে একটি সংবাদের স্ক্রিনশট যুক্ত করে লিখেছেন, “সময় ছিল হা হা দিয়া আসলাম। হা হা কম দেখি।”
অ্যাক্টিভিস্ট নিঝুম মজুমদার ফেসবুকে লিখেছেন, “আমাদের কারো মৃত্যু হবার পর পাইকারি হারে আলহামদুলিল্লাহ বলে জিকির করেছো। সারাটাদিন এইসব নোংরামি করে তুমি এখন যুধিষ্ঠির হয়েছো। এখন আমাকেই শিখাচ্ছো একটা চোরের মৃত্যুতে আমি হাসবো নাকি কাদবো? তোমার এইসব আবেগে আমার ছ্যাড় ছ্যাড় করে মুতে দেয়া উচিত ছিলো, কিন্তু আশ্চর্য! তোমাদের মত অমানুষ হতে পারলামই না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রক্তে, নিষ্ঠুর পিশাচ হতে চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না।”
এর আগে দ্য ডিসেন্ট-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কারিনার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আওয়ামীপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা তার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালিয়েছেন। এমনকি শত শত পোস্টের মাধ্যমে তার মৃত্যু কামনাও করা হয়েছে। 
কারিনা কায়সার ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ছিলেন। মাঠপর্যায়ে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। তার এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই বর্তমানে তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন আইডি ও পেজ থেকে অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়ানো হয়েছে।
এছাড়াও দ্য ডিসেন্ট-এ প্রকাশিত অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কারিনা চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার পর ভিসা বাতিলের দাবিতে হিদুত্ববাদীরাও প্রচারণা চালিয়েছিল। এসব পোস্টে কারিনাকে ‘ভারতবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট’, ‘পাকিস্তানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার’, ‘পাকিস্তানের চর’, ‘আইএসআইয়ের সদস্য’ এবং ‘আমেরিকার ডিপ স্টেটের অংশ’—ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তার ভিসা বাতিল এবং তাকে ভারত থেকে বের করে দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছিল।