শেখ হাসিনা কর্তৃক মির্জা ফখরুল ইসলামের নামে ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দের দাবিটি ভুয়া
গতকাল ২২ আগস্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামীপন্থী কিছু একাউন্ট থেকে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাথে তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগমের ছবিসহ একটি ব্যাংক চেকের ছবি পোস্ট করা হচ্ছে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, পলাতক স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিল থেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য মির্জা ফখরুলকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল।
এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এবং এখানে।
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, ফেসবুকে পোস্ট করা চেকের ছবিটি এডিটেড। করোনাকালীন সময়ে আইনজীবী প্রণোদনা তহবিল থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে দেওয়া সোনালী ব্যাংকের একটি চেক এডিট করে আলোচ্য চেকটি তৈরি করা হয়েছে।
চেকটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে পোস্টের চেকটির অরিজিনাল ভার্সন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে "ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে ছয় কোটি সত্তর লক্ষ পনের হাজার আটশত পঁচাত্তর টাকার আইনজীবী প্রণোদনার চেক প্রদানের মাধ্যমে বার কাউন্সিল হতে প্রণোদনা অর্থ বিতরণ শুরু হল" শিরোনামে খুঁজে পাওয়া যায়।
চেকটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল হতে আইনজীবীদের করোনাকালে প্রণোদনার অংশ হিসেবে 'আইনজীবী প্রণোদনা তহবিল' নামের একটি একাউন্ট থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে প্রদান করা হয়।
যাচাইয়ে বাংলাদেশের আইন বিষয়ক অনলাইন পোর্টাল লইয়ার্সক্লাব বাংলাদেশ (lawyersclubbangladesh.com)-এ "৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রণোদনা পেল ঢাকা বারের আইনজীবীরা" শিরোনামে ২০২২ সালের ২৪ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও চেকটি খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, "করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত আইনজীবীদের সাহায্যার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বার কাউন্সিলের আইনজীবী প্রণোদনা তহবিলে দেওয়া ২০ কোটি টাকা আইনজীবীদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে। ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে ছয় কোটি সত্তর লক্ষ পনের হাজার আটশত পঁচাত্তর টাকার আইনজীবী প্রণোদনার চেক প্রদানের মাধ্যমে সোমবার (২৩ মে) বার কাউন্সিল হতে প্রণোদনা অর্থ বিতরণ শুরু হয়।"
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইট ও লইয়ার্সক্লাব বাংলাদেশের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত চেক ও ফেসবুকে ভাইরাল চেক দুটির মধ্যে অন্তত তিনটি স্থানে হুবহু মিল রয়েছে। চেকটির উপরে ডানপাশে উল্লেখিত চেক নম্বর (১), চেকে দুটি স্বাক্ষর (২) এবং চেকের নিচে ম্যাগনেটিক ইংক ক্যারেক্টার রিকগনিশন বা MICR কোড (৩) যেখানে বিশেষায়িত প্রযুক্তিতে চেক নম্বর, রাউটিং নম্বর ও সংশ্লিষ্ট একাউন্ট নম্বর পাশাপাশি একটু স্পেস দিয়ে উল্লেখ থাকে তাতে হুবহু মিল রয়েছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে দেয়া চেকটির অন্তত নয়টি স্থানে এডিট করে ফেসবুকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ভাইরাল চেকটি তৈরি করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের উক্ত চেকটির শাখার নাম (১), ইস্যু তারিখ (২), রাউটিং নম্বর (৩), প্রাপকের নাম (৪), টাকার পরিমাণ কথায় (৫), টাকার পরিমাণ অংকে (৬), একাউন্টের নাম (৭), একাউন্ট নম্বর (৮) ও দুটি স্বাক্ষরের নীচে দেওয়া সীল (৯), এই নয়টি স্থানে এডিট করে পরিবর্তন করা হয়েছে।
পোস্টের চেকে চেকটির মধ্যে কয়েকটি অসঙ্গতিও ধরা পড়েছে। ব্যাংকের চেকে চেক নম্বর, রাউটিং নম্বর ও একাউন্ট নম্বর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে উল্লেখ থাকে এবং চেকের নিচে ম্যাগনেটিক ইংক ক্যারেক্টার রিকগনিশন বা MICR কোডে বিশেষায়িত প্রযুক্তিতে এই তিনটি নম্বর পাশাপাশি একটু স্পেস দিয়ে পুনরায় উল্লেখ থাকে। এখানে দেখা যাচ্ছে, কেবল চেক নম্বরটি (নীল রংয়ে ব্লক করা) MICR কোডে মিল রয়েছে। এছাড়া, রাউটিং নম্বর ও একাউন্ট নম্বর দুটি ভিন্ন।
চেকের তথ্য অনুযায়ী চেকটি সোনালী ব্যাংকের তেজগাঁও ব্রাঞ্চের। কি-ওয়ার্ড সার্চ করে সোনালী ব্যাংকের 'তেজগাঁও ব্রাঞ্চ' নামের কোনো ব্রাঞ্চের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে 'তেজগাঁও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ব্রাঞ্চ' নামে সোনালী ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চ রয়েছে। ব্যাংকবিডি ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ব্রাঞ্চটির রাউটিং নম্বর 200264512 যদিও চেকের মধ্যে রাউটিং নম্বর উল্লেখ করা 200276678. এছাড়া, ভাইরাল চেকে উল্লেখিত এই রাউটিং নম্বরের সাথে মিল রয়েছে সোনালী ব্যাংকের কোনো ব্রাঞ্চ খুঁজে পাওয়া যায়নি।