টকশোতে এমপির ছড়ানো ভুয়া খবর ফেসবুকে ছড়ালেন চিকিৎসক-লেখক জাকির তালুকদার

Azaharul Islam
লেখক
আজহারুল ইসলাম
২৩ আগস্ট, ২০২৬

গত ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল ডিবিসি টেলিভিশনের একটি টকশোতে দাবি করেছে, ‘‘নওগাঁ জেলায় ১২ জনের এইচআইভি পজিটিভ এবং প্রত্যেকে মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকেন।’’

তিনি বলেছেন, ‘‘আমার জেলায় ১২ জন এইচআইভি পজিটিভ মিলেছে। স্বাস্থ্যের ডেটা বলছি আমি। আমি নিজে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পদাধিকার উপদেষ্টা। যখন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বললাম এদের হিস্ট্রি কী? তারা বলে, ১২ জনই মাদ্রাসার ছাত্র ১২ জনই হোস্টেলে থাকে।’’

এদিকে টকশোতে দেওয়া ফজলে হুদা বাবুলের বক্তব্যকে যাচাই না করে ফেসবুকে এই তথ্য ছড়িয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেছেন চিকিৎসক ও লেখক জাকির তালুকদার

দীর্ঘ পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘‘ছবির এই ভদ্রলোক বর্তমান সরকারদলীয় একজন এমপি। টকশো-তে তিনি জানাচ্ছেন তার জেলায় ১২ জন এইচআইভি পজিটিভ। সেই ১২ জনই মাদ্রাসার ছাত্র। এবং তারা মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকে।’’

‘‘আমাদের সবারই অন্তত একটি কারণে ফেসবুক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। মাদ্রাসাগুলিতে যুগ যুগ ধরে ছাত্র বলাৎকারের ঘটনা ঘটে আসছে। এমনও আছে, এখন যিনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন এবং ছাত্র বলাৎকার করছেন, তিনি নিজেও হয়তো ছাত্রজীবনে ওস্তাদের দ্বারা বলাৎকারের শিকার হয়েছেন।’’

‘‘মূলধারার কোনো গণমাধ্যম কোনোদিন এই বিষয়ে একটি শব্দও ছাপেনি গত একশো বছরে। গত ৬০ বছরে টেলিভিশন কখনোই এই সংক্রান্ত সংবাদ প্রচার করেনি। তারা সকলেই বংশ পরম্পরায় এই পাপকর্মের অপ্রত্যক্ষ সহযোগী এবং অপরাধী। তাদের পাপের মুখোশ খুলে দিয়েছে ফেসবুক।’’

‘‘এইসব মাদ্রাসার শিক্ষক, হেফাজতি মওলানা, চরমোনাই, জামায়াত, পেশাদার ওয়িজিরা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের গণহারে বেশ্যা বলেছে। তাদেরকে সামাজিকভাবে হেয় করার উস্কানি দিয়েছে।’’

‘‘মহাত্মা ফরহাদ মজহার বলাৎকারের শিকার মাদ্রাসাছাত্রদের বিপ্লবী মনে করতেন। বলতেনও সেকথা। যে অসহায় ছাত্ররা নিজেদের গুহ্যদ্বারের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না, তারাই আবার কালচারাল এবং সোশ্যাল মব সৃষ্টির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই মবই ফরহাদ মজহারের বিপ্লব।’’

একই ধরণের প্রচারণা করতে দেখা গেছে ফেসবুকে বিভিন্ন একাউন্টেও। দেখুন এখানে, এখানে, এখানেএখানে

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে নওগাঁয় ১২ জন মাদ্রাসাছাত্রের এইচআইভি শনাক্তের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম ও বদলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানা।

বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। কথা বলেছেন দ্য ডিসেন্টের এই প্রতিবেদকের সঙ্গেও।

আমিনুল ইসলাম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘‘নওগাঁয় ১২ মাদরাসা শিক্ষার্থীর এইচআইভি পজিটিভ দাবি ভিত্তিহীন। জেলায় গত এক বছরে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মাত্র তিনজন। তারা এখন সিভিল সার্জন অফিসের তত্ত্বাবধায়নে আছে এবং ভালো আছেন। সর্বশেষ ১ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছিল সেটাও ৬ মাস আগে।’’

তিনি আরও জানান, “ গত জুলাই মাসে নওগাঁয় ১২ জন ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষা করতে এসে এইচআইভি টেস্ট করেছেন। তবে তাদের কারো মধ্যে এইচআইভি শনাক্ত হয়নি।’’

বদলগাছি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানা সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘‘গত জুলাই মাসে উপজেলার ১২ জন ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষার পাশাপাশি এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছিল। তবে তাদের সবার এইচআইভি রিপোর্ট নেগেটিভ পাওয়া যায়।’’

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন এখানেএখানে

এ বিষয়ে নওগাঁ জেলার সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দ্য ডিসেন্টেকে তিনি বলেন, ‘‘বদলগাছি উপজেলায় একমাসে ১২ জন এইচআইভি পরীক্ষা করেছিল। তাদের সবার রিপোর্ট নেগেটিভি এসেছে। অর্থাৎ এইচআইভি হয়নি তাদের। এর সঙ্গে মাদ্রাসা ছাত্রদের বিষয়টিরও সম্পৃক্ততা নেই। বিভিন্ন এলাকা থেকে র‌্যান্ডমলি ১২ জন এইচআইভি পরীক্ষা করেছেন।’’ এসময় তিনি বদলগাছি উপজেলা সাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করতে বলেন।

বদলগাছি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানা দ্য ডিসেন্টক বলেন, ‘‘ব্যাপারটা যেভাবে ছড়িয়েছে আসলে এমন নয়। বিভিন্ন সময়ে যারা রক্ত দিতে আসে, আমরা তাদের রক্ত পরীক্ষা করে থাকি। সেই পরীক্ষার অংশ হিসেবে ব্লাডে এইচআইভি আছে কি-না পরীক্ষা করতে হয়। গত মাসেও আমাদের এখানে ১২ জন ব্লাড দিতে এসেছিল। তাদের রক্ত পরীক্ষায় এ ধরণর কিছু পাওয়া যায়নি। আর ব্লাড পরীক্ষার বিষয়টা আামদের নিয়মিত কাজের অংশ।’’