গত ১৭ বছরে বাপেক্স একটি গ্যাসকূপও খনন করেনি—প্রধানমন্ত্রীর এ দাবি সঠিক নয়

Sayed Hasan Al Manzur
লেখক
সৈয়দ হাসান আল মানজুর
১৭ আগস্ট, ২০২৬

গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের একটি ভিডিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফেসবুক পেজ PMO Bangladesh - প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-এ প্রকাশ করা হয়।

ভিডিওটির প্রায় ১২ মিনিটের মাথায় দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, বিগত ১৭ বছরে সরকারি সংস্থা বাপেক্স একটি নতুন গ্যাসকূপও খনন করেনি বা প্রতিষ্ঠানটিকে তা করতে দেওয়া হয়নি।

ভিডিওতে তারেক রহমান বলেন, “আমি জানি বিগত কিছু দিন যাবত সমগ্র বাংলাদেশে মানুষ গ্রামেগঞ্জে, সব জায়গায়, ক্ষেত্রবিশেষে মফস্বল শহরগুলোতেও বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছে। আমি জানি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ গ্যাসের কষ্ট পাচ্ছে। সিএনজি বলেন, এলপিজি বলেন, বিভিন্ন রকম গ্যাসের কষ্ট পাচ্ছে। প্রিয় ভাই-বোনেরা, গ্যাস বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল। বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশের নিজস্ব যে প্রাকৃতিক সম্পদ, যে গ্যাসকূপগুলো ছিল, স্বৈরাচাররা একটি গ্যাসকূপ নতুন করে খনন করেনি বা করতে দেয়নি সরকারি সংস্থা বাপেক্সকে। বরং তারা এই সেক্টরটিকে বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল।”

তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সরকার দেশের মাটিতে বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন দেখুন এখানে। 

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, বিগত ১৭ বছরে বাপেক্স একটি নতুন গ্যাসকূপও খনন করেনি—প্রধানমন্ত্রীর এই দাবিটি সত্য নয়।

বাপেক্সের সাম্প্রতিক বছরগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে অন্তত ৮টি গ্যাসকূপ খননের তথ্য পাওয়া যায়।

বাপেক্সের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অধীন সুন্দলপুর-৩ মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের অধীন কৈলাশটিলা-৮ অনুসন্ধান কূপে খনন ও পরীক্ষণ সম্পন্ন করা হয়। কূপ দুটি থেকে যথাক্রমে দৈনিক ৮ ও ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়।

একই অর্থবছরে বেগমগঞ্জ-৪ (ওয়েস্ট) মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপের খননকাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল। ১৪ জুলাই পর্যন্ত ৩ হাজার ১১৩ মিটার গভীরতায় খনন শেষ করা হয়। কূপটির দুটি নতুন স্তরসহ মোট তিনটি স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

বাপেক্সের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে টবগী-১ ও ইলিশা-১ অনুসন্ধান কূপ খননের তথ্য রয়েছে। বাপেক্সের নিজস্ব অর্থায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের মাধ্যমে কূপ দুটি খনন করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, টবগী-১ কূপ থেকে দৈনিক ২১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে ইলিশা-১ কূপ থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বাপেক্সের ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনেও গ্যাসকূপ খননের তথ্য পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলেটের জকিগঞ্জ-১ অনুসন্ধান কূপের খননকাজ শুরু হয় ২০২১ সালের ১ মার্চ। ওই বছরের ৮ মে কূপটির খনন সফলভাবে শেষ করা হয়। পরে পরীক্ষার মাধ্যমে সেখানে গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুত নিশ্চিত করা হয়।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের সিলেট-৯ কূপও বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ও জনবল দিয়ে খনন করা হয়। কূপটির খনন ২০২০ সালের ১ অক্টোবর শুরু হয়ে ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি শেষ হয়।

বাপেক্সের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব রিগ ও জনবল দিয়ে শ্রীকাইল ইস্ট-১ অনুসন্ধান কূপ খনন করে।

কূপটির খনন শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ ৩ হাজার ৪৮৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খননকাজ শেষ হয়। এর মাধ্যমে নতুন একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাপেক্সের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনেও সালদা নর্থ-১ ও কসবা-১ অনুসন্ধান কূপ খননের তথ্য রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালদা নর্থ-১ কূপে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ব্যবহার করে ২০১৮ সালের ১১ মে খনন শুরু হয়। একই বছরের ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ৮১৪ মিটার গভীরতায় খনন শেষ করা হয়।

কসবা-১ অনুসন্ধান কূপের খনন শুরু হয় ২০১৮ সালের ৪ মে। বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ও জনবল দিয়ে একই বছরের ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ৯৭৫ মিটার গভীরতায় খনন শেষ হয়।

বাপেক্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্যান্য বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনেও বিভিন্ন সময়ে গ্যাসকূপ খননের তথ্য পাওয়া যায়।

এ ছাড়া সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনেও নতুন গ্যাসকূপ খননের তথ্য পাওয়া যায়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জকিগঞ্জ ও ইলিশা—এই ছয়টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। একই প্রতিবেদনে শাহবাজপুর ইস্ট, টবগী-১, ইলিশা-১ ও ভোলা নর্থ-২ কূপের খননকাজ শেষ হওয়ার এবং সেগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাপেক্স, বিজিএফসিএল ও এসজিএফএলের অধীনে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪টি কূপের কাজ শেষ করে দৈনিক ১৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন নিশ্চিত করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে।

২০১৪ সালের ২২ আগস্ট বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাবনার সাঁথিয়ায় নতুন একটি গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু করেছিল বাপেক্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি বাপেক্স ওই কূপের খনন ও অনুসন্ধানের কাজ করছিল।

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে সিলেটের জকিগঞ্জে দেশের ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স।

২০২৩ সালের ৬ জুলাই প্রকাশিত একই প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে—এমন এলাকায় তখন পর্যন্ত ১৮টি অনুসন্ধান কূপ খনন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ১০টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হয়। সাতটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে নিয়মিত গ্যাস উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছিল বাপেক্স।

২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার অম্বরনগর গ্রামে বেগমগঞ্জ-৪ (ওয়েস্ট) মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপের খননকাজ শুরুর তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাপেক্স ওই কূপের খননকাজ শুরু করেছিল।

অর্থাৎ বাপেক্সের নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন সময়ের সংবাদমাধ্যমের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, বিগত ১৭ বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করেছে। এর মধ্যে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ও জনবল দিয়ে কূপ খননের উদাহরণও রয়েছে।