মির্জা ফখরুলকে নিয়ে আওয়ামী লীগের ভুয়া খবর ছড়িয়ে তোপের মুখে টকশো থেকে উঠে গেলেন সিনিয়র সাংবাদিক

The Dissent Desk
লেখক
দ্য ডিসেন্ট ডেস্ক
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বর্তমান রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনা ৫০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন এমন একটি ভুয়া দাবি গত মাসে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৩ আগস্ট দ্য ডিসেন্টের এক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দাবিটিকে ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

এরপরও একই দাবি একটি টকশোতে তুলে ধরেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব আজিজ। দাবিটি নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য আলোচকদের প্রতিবাদের একপর্যায়ে তিনি স্টুডিও থেকে উঠে চলে যান।

গত ৮ সেপ্টেম্বর চ্যানেল নাইনের ‘নাইন সংলাপ’ অনুষ্ঠানের ‘আবেগ না বিবেক?’ পর্বে আলোচনার একপর্যায়ে, ১ ঘণ্টা ৫ মিনিট ১০ সেকেন্ডে, মাহবুব আজিজ দাবি করেন, “শেখ হাসিনার অনেক দুষ্কৃতির কথা আমরা জানি। স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের আমরা প্রতিবাদ করি। কিন্তু ৫০ লক্ষ টাকা নিয়ে যে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর চিকিৎসার জন্য, সেই সংস্কৃতি তো ছিল।”

তার এই বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য আলোচকেরা প্রতিবাদ জানান। তারা দাবিটিকে মিথ্যা উল্লেখ করে মাহবুব আজিজকে বক্তব্যটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

এ সময় মাহবুব আজিজ উত্তেজিত হয়ে অন্যদের তার বক্তব্যে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানান। একপর্যায়ে তিনি স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দ্য ডিসেন্টকে মাহবুব আজিজ বলেন, টকশোতে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি দাবিটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না।

মাহবুব আজিজ বলেন, “আমি ওইখানে বসেই যখন দেখলাম এইটা সত্য নয়, তখন কিন্তু আমি সরিও বলে দিয়েছি যে এই তথ্যটা সত্য নয়।”

টকশো থেকে চলে যাওয়ার বিষয়ে মাহবুব আজিজ বলেন, তিনি আগে থেকেই জানিয়েছিলেন যে অন্য একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের আগেই তাকে স্টুডিও ছাড়তে হবে। 

অনুষ্ঠানের উপস্থাপকও তার আগে চলে যাওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করেছিলেন উল্লেখ করে বলেন, “উপস্থাপক তুষার সাহেব সেটা অনুষ্ঠানে ঘোষণাও করলেন যে উনি চলে যাবেন, শেষ একটু একটা কথা বলে উনি চলে যান।”

তবে টকশো থেকে চলে যাওয়ার ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন মাহবুব আজিজ। তিনি বলেন, “তারা তো কেটে নিয়ে বলছে ‘সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে টকশো থেকে পালালেন মাহবুব আজিজ’।”

মাহবুব আজিজ আরও বলেন, “আমি অনুষ্ঠানেই বলেছি, পুরো অনুষ্ঠান পাবেন ইউটিউবে আপনি।” 

তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে নানারকম তথ্য আছে। এটা তথ্যটা আমার কাছে একদম শিওর না থাকার কারণে আমি তৎক্ষণাৎ সরি বলেছি যে তথ্যটি নিশ্চয়ই আপনারা যখন সবাই ভুল বলছেন আমিও ভুল করছি।”

এ ছাড়া নিজের বক্তব্যকে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার প্রসঙ্গের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে মাহবুব আজিজ বলেন, “আমাদের মূল জায়গায় অসহিষ্ণুতা। আমি সেই জায়গাতেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি।”

তবে, চ্যানেল নাইন এ প্রচারিত পুরো টকশোটি শুনেও মাহবুব আজিজকে স্যরি বলতে শোনা যায়নি।

মাহবুব আজিজ অনুষ্ঠানে বক্তব্যটি প্রত্যাহার করে ‘সরি’ বলেছিলেন কি না জানতে চাইলে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আব্দুন নূর তুষার বলেন, তিনি তা শুনতে পাননি। তাঁর ভাষায়, “ওখান থেকে বলেনাই, ওখানে এতো চিৎকার হচ্ছিল আমি তো শুনতে পাই নাই, টেলিভিশনেও তো শুনতে পাচ্ছিল না।”

অনুষ্ঠানে হট্টগোলের পরিস্থিতি সম্পর্কে তুষার বলেন, “না ওখানে তো অনেক জোরে চিৎকার হচ্ছিল। কে যে কি বলতেছিল আমি কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, আমি সবাইকে থামানোর চেষ্টা করছিলাম।” পরে তিনি আরও বলেন, “অনেক চিৎকার সত্যিই হচ্ছিল।”

তুষারের বলেন, “আগেই ঘোষণা দিয়েছি যে ওনার একটা অনুষ্ঠান আছে উনি চলে যাবে। চলে যাওয়ার আগে উনি এক মিনিট একটু কথা বলবে।”

তিনি জানান, মাহবুব আজিজকে সংক্ষিপ্তভাবে বক্তব্য শেষ করতে বলা হলেও তিনি দীর্ঘ বক্তব্য শুরু করলে হট্টগোল তৈরি হয়।

তুষার বলেন, “আমি বলছি ওনাকে আমি এক মিনিটে এক লাইনে বলেন, এই কথা এক লাইনে না এক মিনিটে বলেন এভাবে আমি বলছিলাম আমার যতটুকু মনে পড়ে। তারপর উনি একটা লম্বা কথা বলতে শুরু করছে তখনই হট্টগোল হয়ে গেছে। উনি এটা বললে আমি কিভাবে বন্ধ করব মানে উনি তো বলে ফেলছে।”

এর আগে, গত ২৩ আগস্ট প্রকাশিত দ্য ডিসেন্টের ওই ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিল থেকে মির্জা ফখরুলকে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবিতে ছড়িয়ে পড়া চেকের ছবিটি সম্পাদিত। মূল চেকটি করোনাকালে আইনজীবীদের প্রণোদনা হিসেবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ‘আইনজীবী প্রণোদনা তহবিল’ থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে দেওয়া হয়েছিল।

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে চেকটির মূল সংস্করণ পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ২৪ মে লইয়ার্সক্লাব বাংলাদেশেও একই চেক নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

মূল চেক ও ভাইরাল চেকের তুলনা করে চেক নম্বর, দুটি স্বাক্ষর এবং নিচের এমআইসিআর (MICR) কোডসহ একাধিক জায়গায় হুবহু মিল পাওয়া যায়। অন্যদিকে, প্রাপকের নাম, টাকার পরিমাণ, ইস্যুর তারিখ, শাখার নাম, রাউটিং নম্বর এবং হিসাবের নাম ও নম্বরসহ অন্তত নয়টি তথ্য পরিবর্তন করে ভাইরাল হওয়া চেকটি তৈরি করা হয়।

এ ছাড়া চেকে উল্লেখ করা ‘সোনালী ব্যাংক তেজগাঁও ব্রাঞ্চ’ নামের কোনো শাখার অস্তিত্বও যাচাইয়ে পাওয়া যায়নি। চেকে থাকা রাউটিং নম্বরের সঙ্গেও সোনালী ব্যাংকের কোনো শাখার তথ্য মেলেনি।