ঢাবিতে ’হিজাব’ স্লোগান নিয়ে অসত্য তথ্য প্রচার করলো ভারতীয় মিডিয়া

Hasan Al Mahmud
লেখক
হাসান আল মাহমুদ
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

১০ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে। নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল- ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট বিপুল ব্যাবধানে জয় লাভ করে।

এ সময় ডাকসুর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য পদে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভানেত্রী সাবিকুন্নাহার তামান্নার নাম ঘোষণার সাথে সাথে ‘হিজাব’ ‘হিজাব’ ধ্বনিতে শ্লোগান তুলে সিনেট ভবনে উপস্থিত থাকা কয়েকশ’ শিক্ষার্থী।

ভিডিও টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় এবং এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখান নেটিজেনরা। ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিডিওতে স্পষ্ট না হওয়ায় অনেকে এটিকে নিজেদের মতো—কেউ ইতিবাচক আবার কেউ নেতিবাচকভাবে-- ব্যাখ্যা করেছেন।

ভিডিওটি কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং কিছু সামাজিক মাধ্যম একাউন্টে প্রকাশ করে এটিকে ‘ডাকসু নির্বাচনে জয়ের পর ছাত্রশিবির কর্তৃক ক্যাম্পাসে হিজাবকে বাধ্যতামূলক করার প্রয়াস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

India Tv “এবার বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাবের দাবি উঠেছে” শিরোনামের এক রিপোর্টে হিন্দি ভাষায় দাবি করেছে, “বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর উগ্রপন্থা প্রভাব বিস্তার করছে এবং এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাসরুমে মেয়েদের হিজাব বাধ্যতামূলক করার দাবি করছে।”

প্রতিবেদনটি পড়ুন এখানে । ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যাবে এখানে

ইন্ডিয়া টিভি বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট

কলকাতাভিত্তিক The News Bangla / The News বাংলা নামক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম করা হয়েছে, “নারীদের হিজাব বোরখায় ঢাকতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু”।

ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমে যেভাবে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে খবরটি


ইন্ডিয়া ব্লুমস নামের ওয়েবসাইটে একইভাবে হিজাব স্লোগানের ভিডিওটিকে ‘বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের উত্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীদের জন্য শিবিরের বিজয়ীদের দ্বারা হিজাবের দাবি’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। লিংক এখানে (আর্কাইভ)।

এছাড়া ‘হিন্দু ভয়েস’ নামে এক্স হ্যান্ডেল থেকে দাবি করা হয়েছে, নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করার এই দাবি হিন্দু শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সরাসরি একটি হুমকি। ‘হিন্দু ভয়েস’ এর পোস্টটি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১.৫ মিলিয়ন বার দেখা হয়েছে ৫ হাজারের বেশি রি-টুইট করা হয়েছে।

পোস্ট টি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

একই সাথে ভারত থেকে পরিচালিত কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী কিছু এক্স হ্যান্ডেল যেমন Kreately.in, Treeni, Megh Updates, Frontalforce, Sharmishta Sharma, HinduPost একই দাবি সহকারে ভিডিওটি পোস্ট করেছে।

এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে।

ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণার প্রথম দিন ২৬ আগস্ট, ২০২৫-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে দেয় একদল দুষ্কৃতকারী। এই সময়ে সাবিকুন্নাহার তামান্নার হিজাব পরিহিত ছবিতে ‘শয়তান এর শিং’ এঁকে ছবিটি বিকৃত করা হয়।

’হিজাব হিজাব’ স্লোগানের পেছনের ঘটনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করতে স্লোগান দেয়া হচ্ছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে তা সত্য নয়। বরং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনা একটি সাম্প্রতিক ঘটনার—যেটিকে অনেকে হিজাবফোবিয়ার উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন-- প্রতিবাদ স্বরূপ এই শ্লোগান দেওয়া হয়েছে।

এই ছবিটি তুলে শিবির সমর্থিত প্যানেল তাদের ফেসবুক পেইজে পোস্ট করলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। একজন হিজাবী নারীর ছবিতে ‘শয়তান এর শিং’ এঁকে দেয়াকে ‘হিজাবোফোবিয়া’ বলেও কেউ কেউ চিহ্নিত করেন।

সাকিবুন্নাহার তামান্নার ক্যাম্পেইন চলাকালে তার ছবি এভাবে বিকৃত করা হয়


১০ সেপ্টেম্বর সাবিকুন্নাহার তামান্না ডাকসুর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তার বিজয়কে ‘হিজাবোফোবিয়ার পরাজয়’ হিসেবে দেখেছেন এবং ‘হিজাব হিজাব’ বলে স্লোগান দিয়েছেন।

এ বিষয়ে ডাকসুর নবনির্বাচিত জিএস এস এম ফরহাদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, “স্লোগানটি 'হিজাবফোবিয়া' বিরোধী। এটি ছাত্রী নেত্রী সাবিকুন নাহার তামান্নার ছবি বিকৃত করার প্রতিক্রিয়ায় উঠেছে, যেখানে চারুকলা বিভাগে তার হিজাবে 'শিং এঁকে' অপমান করা হয়েছিল।”

ফরহাদ বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ে যিনি হিজাব পরতে চান তাকে আপনি পেছন থেকে এসে গোপনে ছবি বিকৃত করবেন, বিভাগে হেনস্তা করবেন, এই জিনিসগুলো চলা উচিত নয়।"