ভিন্ন তরুণের ছবিকে অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্ত ‘ফাহাদ’ হিসেবে প্রচার করলো মিডিয়া

Mahbub A Rahman
লেখক
মাহবুব এ রহমান
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে আটক এক আসামির নাম ফাহাদ। পুরোনো এক ছবির জেরে মিনহাজুল ইসলাম ওরফে মাহিম নামের অন্য এক তরুণের ছবিকে ‘ফাহাদ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে ডেইলি ক্যাম্পাস ও দৈনিক ইত্তেফাকসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম।  এ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। 

ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফেসবুকে ভাইরাল হয় তাদের ফটোকার্ডটি। এতে মিনহাজুল ইসলাম ওরফে মাহিমকে বিষোদগার করেন নেটিজেনরা।

তবে দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে ভাইরাল হওয়া পুরোনো ওই ছবিতে থাকা তরুণটি ফাহাদ নন; তার নাম মিনহাজুল ইসলাম ওরফে মাহিম। তারা ভিন্ন ব্যক্তি।

দেড় বছর আগে অপ্রতিমের মায়ের হাতে আটক ব্যক্তি ফাহাদ নন

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস গতকাল “গাঁজাসহ দেড় বছর আগে আসামি ফাহাদকে আটক করেছিলেন অপ্রতিমের মা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর আজ দৈনিক ইত্তেফাক “দেড় বছর আগে অপ্রতিমের মায়ের হাতে গাঁজাসহ আটক হয়েছিল আসামি ফাহাদ” শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন করেছে। এর বাইরেও কয়েকটি পোর্টালে এরকম শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এমন আরও কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। 

এসব প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন চত্বর থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডির নিয়মিত অভিযানে গাঁজাসহ বহিরাগত ৭ তরুণকে আটক করা হয়েছিল। সে অভিযানে ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) ড. নাহিদা বেগম (অপ্রতিমে মা), সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহ ও মাহমুদুল হাসান। আটকরা কুমিল্লা ময়নামতি কারিগরি স্কুল ও কলেজ এবং শালবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। আটককৃতরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় সে সময় তাদের অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। 

প্রতিবেদনগুলোর দাবি, আটক ওই ৭ তরুণের মধ্যে অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্ত ফাহাদও ছিলেন।

প্রমাণ হিসেবে ওই সময়ে আটক তরুণদের একটি ছবিতে একজনকে ‘ফাহাদ’ হিসেবে গোল চিহ্নিত করে দেয়া হয়।

দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে ‘ফাহাদ’ হিসেবে লাল চিহ্নিত তরুণ ফাহাদ নন। এবং ওই ঘটনায় ড. নাহিদার নেতৃত্বে আটক তরুণদের ৭ জনের মধ্যে বর্তমানে অভিযুক্ত ফাহাদ ছিলেন না।

লাল চিহ্নিত তরুণের নাম মিনহাজুল ইসলাম মাহিম। 

দ্য ডিসেন্ট মাহিম এবং ফাহাদের একাধিক ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণে তাদেরকে ভিন্ন ব্যক্তি বলে চিহ্নিত করেছে। 

এছাড়া মাহিম ও তার মায়ের সাথে কথা বলা হয়েছে। তারা উভয়ে নিশ্চিত করেছেন মিডিয়ার প্রকাশ করা ছবিটিতে লাল চিহ্নিত করা তরুণটি মিনহাজুল ইসলাম মাহিম।

দ্য ডিসেন্ট মাহিমকে অনুরোধ করে তার ওই সময়ে আটক অবস্থায় পরিহিত পোশাকটি তার কাছে থাকলে সেটি পরে একটি ছবি তুলে পাঠাতে। মাহিম ওই সময় পরিহিত শার্ট এবং ট্রাউজার পরে একটি ছবি তুলে পাঠান।

মাহিমের পিতা-মাতার নাম ও ঠিকানা এবং ফাহাদের পিতা-মাতার নাম ও ঠিকানা ভিন্ন বলে তাদের এনআইডি কার্ডের তথ্য ও পুলিশের দেয়া তথ্য থেকে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট।

এছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহও সেই ছবি পোস্ট করে মাহিমকে ফাহাদ বলে দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার পোস্টটি এডিট করে ওই তরুণ ফাহাদ নন; মাহিম বলে উল্লেখ করেন। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসও তাদের প্রতিবেদন এডিট করে ওই তরুণ ফাহাদ নন; মাহিম বলে উল্লেখ করেছে।

মাহিমের মা দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘মাহিম ভার্সিটির একটি কনসার্ট দেখতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে বসে গিটার বাজাচ্ছিল। হঠাৎ সেখানকার লোকজন বিনা কারণেই ওদের আটকে রাখে। ছেলেদের কাছে সন্দেহজনক কিছু না পেলেও, ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করতে তারা আমাদের (অভিভাবকদের) ডেকে পাঠায়। আমি সেখানে গেলে একজন স্যার আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ছেলেদের মঙ্গলের জন্যই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তখন আমিও তাদের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছিলাম।’’

তিনি বলেন, ‘‘সেই ছবি নিয়া তারা যে আমার ছেলেকে ভাইরাল করলো, যদি আমার ছেলে সেটার সাথে জড়িত থাকতো, অন্যায় করত, তাইলে আমি সেটার বিচার অবশ্যই চাইতাম। এখন না করেও মান সম্মান নষ্ট আমার একমাত্র ছেলের। তাদের তো উচিৎ ছিল যাচাই বাছাই করার।’’

মাহিম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘আমি কেমনে ফাহাদ হই। ওদেরকে আমি চিনিও না। আমার ছবি দিয়ে দেহেন আমার একটা পুরা হ্যারেজমেন্ট করাইতেছে, আমার নিজের মান সম্মান হারাইতেছে, মানে কি কইতাম!’’