Awami League Campaigns Pulak Chatterjee’s Death as ‘Murder,’ Claims ‘Hindu Genocide’

12 September 2026

গতকাল শুক্রবার জাতীয় দৈনিক সমকালের বরিশালের সাবেক ব্যুরো প্রধান ও বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ সমকালের বরিশাল ব্যুরো অফিস থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। 

মরদেহ উদ্ধারের সময় পাঁচটি সুইসাইডও নোট পাওয়া যায়। যেখানে তিনি মৃত্যুর পূর্বে পুলিশ, তার পরিবার এবং সাবেক সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিষয়ে লিখেন।  পুলিশের প্রাথমিক ধারণা পুলক চ্যাটার্জি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। 

তবে এই মৃত্যুর ঘটনাকে ‘সরাসরি হত্যা’ আখ্যা দিয়ে ‘পরিকল্পিত সংখ্যালঘু হত্যা’ এবং ‘হিন্দু নিধন’ বলে  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পেইন করছেন আওয়ামীপন্থীরা। তাদের দাবি, পুলক চ্যাটার্জি খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে এক পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘‘প্রবীণ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জীর হত্যা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর একের পর এক নিপীড়ন—এই ব্যর্থ সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারেরই প্রমাণ। …অফিসে ভেতর থেকে আটকানো অবস্থায় তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার এবং রহস্যময় পরিস্থিতি কোনো সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। এটা সরাসরি হত্যা।’’

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সাবেক এসাইনমেন্ট অফিসার ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সঞ্জিত চন্দ্র দাস পুলক চ্যাটার্জির একটি ঝুলন্ত ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘‘অপেক্ষায় আর কত বিভুরঞ্জন? হায় বাক-স্বাধীনতা! হায় মুক্ত গণমাধ্যম! চলছে সংখ্যালঘু হ/ত্যা..’’

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নুরুল আজিম রনি লিখেছেন, ‘‘আরেকটি সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ড, আরেকজন সাংবাদিক হত্যা। বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সমকাল পত্রিকার সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার। দুই বছর আগে সংখ্যালঘু এই সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। আজ তাকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হলো।’’

আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট কাজী মামুন লিখেছেন, ‘‘হিন্দুনি/ ধন চলছে। কীভাবে মৃ ত্যু হলো সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জীর? বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জীকে সমকাল কার্যালয়ে মৃ ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।’’

শাহীন আরা সুলতানা নামে একজন লিখেছেন, ‘‘আরেকটি সংখ্যালঘু হ*ত্যাকাণ্ড, আরেকজন সাংবাদিক হ*ত্যা। বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সমকাল পত্রিকার সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার। দুই বছর আগে সংখ্যালঘু এই সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। আজ তাকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হলো।’’

ফেসবুকের পাশাপাশি এক্সেও এ ঘটনাকে ‘হিন্দু নিধন’ উল্লেখ করে চালানো হচ্ছে ক্যাম্পেইন। 

Tapas K. Baul নামক একটি একাউন্টে লেখা হয়েছে, ‘‘হায়রে বাক-স্বাধীনতা! হায়রে মুক্ত গণমাধ্যম!!  চলছে সংখ্যালঘু হ/ত্যা.. বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জীকে সমকাল কার্যালয়ে মৃ*ত অবস্থায় পাওয়া গেছে!’’

ভারত থেকে পরিচালিত Rinita Mazumdar Ph.D নামক একটি একাউন্ট থেকে লেখা হয়েছে, ‘‘সমকাল পত্রিকার বরিশাল জেলার সাবেক ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি'র ঝু"লন্ত লা"শ উদ্ধার!..

বাংলাদেশে পরি"কল্পিত ভাবে হিন্দু নি'ধন চলছে!..’’

Niru K Nahar নামক আরেকটি একাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘‘বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সমকাল পত্রিকার সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার। দুই বছর আগে #সংখ্যালঘু এই সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। আজ তাকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হলো।’’

তবে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যে পুলক চ্যাটার্জীর আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

যেভাবে পাওয়া যায় পুলক চ্যাটার্জীর লাশ 

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন মতে শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরের প্যারারা রোডের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত দৈনিক সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পুলক চ্যাটার্জির লাশ উদ্ধার করা হয়।

সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরী জানান, সন্ধ্যায় তিনি সমকাল অফিসে এসে দেখেন, অফিসের দরজা ভেতর থেকে আটকানো। দরজার ফাঁক দিয়ে পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর দ্রুত ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা যুগান্তরের ব্যুরো প্রধানকে বিষয়টি জানান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলকের মরদেহ উদ্ধার করে।  

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদি হাসান বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে খবর পেয়ে তাঁরা প্যারারা রোডের ওই ভবনে যান। সেখানে সমকাল কার্যালয়ে রশি দিয়ে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পুলক চ্যাটার্জির লাশ পাওয়া যায়।

পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি সাংবাদিকদের বলেন, চাকরি হারানোর পর থেকে তাঁর স্বামী হতাশায় ভুগছিলেন। তবে এ কারণে তিনি আত্মহত্যা করবেন, তা পরিবারের কেউ ভাবেননি। একই ভাষ্য পুলক চ্যাটার্জির ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক চ্যাটার্জির।

পরিবার সূত্রে প্রথম আলো লিখেছে, পুলক চ্যাটার্জি শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে নগরের শ্রীনাথ চ্যাটার্জী লেনের বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলেও ধরছিলেন না। বিষয়টি তাঁর স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি সুমন চৌধুরীকে ফোন করে জানান।

সুইসাইড নোটে যা ছিল

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী মৃত্যুর পূর্বে পুলক চ্যাটার্জি পাঁচটি সুইসাইড নোট লিখেছিলেন। যার একটি ছিল প্রশাসনের উদ্দেশ্যে। বাকিগুলো ছিল স্ত্রী প্রিয়াংকা, মেয়ে প্রকৃতি, ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জি ও তার স্ত্রী ইতি, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন এবং দীর্ঘদিনের সহকর্মী সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরীর উদ্দেশ্যে।

প্রশাসনের উদ্দেশ্যে লেখা নোটে শারীরিক অসুস্থতা ও দীর্ঘদিনের চিকিৎসার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেন, ‘‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ভারতের ভেলোর পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছিল। শরীরের যন্ত্রণার সময়ে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনও প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’’

স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘‘আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াংকা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হওয়ার নয়। তারপরও কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সঙ্গে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে।’’

ভাই দীপক ও তার স্ত্রী ইতির উদ্দেশে পুলক লিখেছেন, ‘‘বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে দেবাশীষের সঙ্গে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।’’

সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরীর উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘‘সুমন, বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসঙ্গে প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছি। কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো, সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।’’

বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে পুলক চ্যাটার্জি লিখেছেন, ‘‘বিদায়। তোমার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করো। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম, তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নেই। পারলে তোমার বউদি ও প্রকৃতির মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।’’

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ জানান, ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে পুলিশ।