How a Times of Bangladesh Journalist Tried to Cast Doubt on Miraj Sheikh’s Enforced Disappearance
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নামে এক জেলেকে গুম করার অভিযোগ বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আন্তার্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর প্রতিবেদন এবং দ্য ডিসেন্ট, বিবিসি বাংলা সহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের খবর মতে, গত ১০ এপ্রিল মিরাজকে কোস্টগার্ডের দুই সদস্য কর্তৃক জোরপূর্বক নৌকায় উঠিয়ে যেতে দেখেছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনাটি সর্বপ্রথম সামনে নিয়ে আসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
এরপর গত ১১ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শেখের পরিবারের তিন সদস্যকে (মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলাম, স্ত্রী মুক্তা খানম এবং মা তাসলিমা বেগম) মোংলা থানায় ডেকে নেয় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। থানায় কোস্টগার্ডের দুজন সদস্য এবং পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জবানবন্দি নেওয়ার সময় কোস্টগার্ডের যে দুজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন তাদের একজনের নাম লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সহিদ আল আহসান, নির্বাহী কর্মকর্তা, কোস্টগার্ড বেস মোংলা। অন্যজনের নাম জানা যায়নি। তবে তিনি কোস্টগার্ডের ইউনিফর্মে ছিলেন না বলে জানিয়েছেন লিজা ইসলাম।
লিজা দাবি করেছেন, এই নাম না জানা কর্মকর্তা গত ১১ জুন মিরাজ শেখের পরিবার মোংলায় তার খোঁজ চেয়ে মানববন্ধন করলে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তির একটি ছবিও দ্য ডিসেন্টকে শেয়ার করেছেন লিজা।
১১ আগস্ট থানায় পরিবারের সদস্যদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় লিজা ইসলাম সাত পাতার একটি জবানবন্দি লিখে দেন। তার মা ও ভাবী লিখতে না পারায় কোস্টগার্ড সদস্যরা তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং উত্তরগুলো লিপিবদ্ধ করেন।
লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমার মা এবং ভাবী লিখতে জানেন না। কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাদের প্রশ্ন করেছেন এবং উত্তর লিপিবদ্ধ করেছেন। কোস্টগার্ড শুধু উত্তরগুলো লিখছিল, প্রশ্নগুলো লেখেনি। এমনকি কোন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে কোন উত্তর, সেটাও লেখা হয়নি। জবানবন্দি নেওয়া হলে তারা আমাদের স্বাক্ষর নেন। এরপর আমাদের জবানবন্দির একটি কপি অথবা ছবি তুলতে চাইলে আমাদেরকে সেই সুযোগ দেয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “কোস্টগার্ড প্রশ্নগুলো না লিখে শুধু উত্তর লেখায় আমাদের আশঙ্কা হয়েছিল, এই জবানবন্দি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে পারে। ফলে আমরা একটি অফিশিয়াল কপি চেয়েছিলাম।”
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ পত্রিকার সাংবাদিকের ‘বড় হাত’
মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরা তাদের দেয়া জবানবন্দির কোন কপি কোস্টগার্ড ও পুলিশের কাছে চেয়ে না পেলেও ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ এর হয়ে কাজ করা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী তার ‘বড় হাত’ দিয়ে ওই জবানবন্দির কপি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
গত ৯ সেপ্টেম্বর “মিরাজ শেখ: গুম নাকি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন?” শিরোনামে টাইমস অব বাংলাদেশে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দেখুন এখানে এবং এখানে।
প্রতিবেদনগুলোতে মিরাজ শেখের গুমের ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
টাইমস অব বাংলাদেশ এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মিরাজের পরিবার অসত্য এবং পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে আর ‘মানবাধিকার কর্মীরা ভিত্তিহীন দাবি করেছেন’।
এর আগে গত ২৬ আগস্ট ঢাকার অন্য দুটি সংবাদমাধ্যম (এখন টিভি ও নাগরিক প্রতিদিন) সংঘবদ্ধভাবে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে মিরাজের গুমের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। দ্য ডিসেন্ট এক অনুসন্ধানে দেখিয়েছে, ওই দুটি প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী চারজন সংবাদকর্মীকে ঢাকা থেকে কোস্টগার্ডের খরচে বাহেরগাটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে বাহিনীর নৌযানে চড়ে তারা ঘটনাস্থলে যাতায়াত করেন।
লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, ২৮ আগস্ট টাইমস অফ বাংলাদেশ পত্রিকার সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী তাকে ফোন করেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটনের রেফারেন্স দিয়ে তিনি লিজার সঙ্গে কথা বলেন।
লিজার ভাষ্য অনুযায়ী, কামরান তাকে বলেছিলেন, “নুর খান লিটন আমাকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। আমি তার কাছ থেকে আপনার নম্বর নিয়েছি।”
লিজা বলেন, “আমরা ১১ আগস্ট যে জবানবন্দি দিয়েছিলাম, কামরান রেজা সেটি পেয়েছেন। সেখানকার উত্তরগুলো ধরে তিনি আমাকে প্রশ্ন করছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা আপনি কোথায় পেয়েছেন?’ তখন কামরান রেজা বললেন, ‘আপনি জানেন আমার হাত কত বড়?’ আমার প্রশ্ন হলো, যে জবানবন্দির কপি আমাদেরই দেওয়া হয়নি, সেটা কামরান রেজা চৌধুরীর হাতে কীভাবে গেল?”
কামরান রেজা চৌধুরীর সঙ্গে নিজের কথোপকথনের একটি রেকর্ড দ্য ডিসেন্টকে দিয়েছেন লিজা ইসলাম। অন্য একটি ফোন দিয়ে তিনি কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করেন।
রেকর্ডে কামরান রেজা চৌধুরীকে শোনা যায় বারবার প্রশ্ন করছেন মিরাজ শেখ স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন কিনা কিংবা কোস্টগার্ড ছাড়া অন্য কোনো পক্ষ তার নিখোঁজে জড়িত কিনা। প্রশ্ন করার সময় তিনি একাধিকবার মিরাজের পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দিতে কী লেখা আছে সেসবের সূত্র ধরে কথা বলতে শোনা গেছে।
একপর্যায়ে কামরান বলেন, “আপনার ভাই তো হারিয়ে গেছে। মূল বিষয় হচ্ছে, আপনার ভাই হারিয়ে গেছে। তাকে বের করতে হবে। আপনারা বারবার অন্য কোনো অপশনের দিকে (কোস্টগার্ডকে দায়ী করা ছাড়া) যাচ্ছেন না কেন? থার্ড পার্টিও তো করতে পারে।”
তাকে আরও বলতে শোনা যায়, “আপনি আমার সম্পর্কে জানেন না। নুর খান লিটনকে বলেন, নুর খান লিটনকে জিজ্ঞাসা করেন আমি কে।”
‘আমার নামে মিথ্যা রেফারেন্স দেয়া হয়েছে’, বললেন নুর খান লিটন
মিরাজের বোন লিজার সাথে প্রথম কথা বলার সময় মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটনের রেফারেন্স দিয়েছিলেন কামরান রেজা।
কামরান রেজার সঙ্গে লিজা ইসলামের আরেকটি কল রেকর্ডে লিজাকে বলতে শোনা যায়, “আপনার সঙ্গে কি এই বিষয় নিয়ে নুর স্যারের, মানে নুর খান লিটনের কথা হয়েছে?”
জবাবে কামরান রেজা বলেন, “নুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার আগেই কথা হয়েছে।”
লিজা তখন বলেন, “সেদিন তো আপনি আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, এই বিষয়ে কথা হয়েছে।”
কামরান বলেন, “হ্যাঁ, কথা হয়েছে তো। কেন, হবে না কেন? নুর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, অবশ্যই বলেছি। আমাকে ব্রিফিং দিয়েছেন, তার সমস্যাগুলো বলেছেন। এখন বলেন, সমস্যা কী? নুর ভাই কি বলেছেন যে আমার সঙ্গে কথা হয়নি?”
লিজা বলেন, “আপনি আমাকে ফোন দিয়েই বলেছিলেন, তার কাছ থেকে আমার নম্বর নিয়েছেন।”
কামরান জবাব দেন, “না, কী নিয়েছিলাম সেটা বাদ দেন। আপনি পরিষ্কার করে বলেন, কী বলতে চান। আমি একটু সংসদে যাব, তাড়াহুড়া করছি। বলেন।”
এরপর কামরান রেজাকে বলতে শোনা যায়, “শোনেন, এই এখন-তখন এসব নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না। আমি ভাই, আমার যেটা মনে হয়, সেটাই লিখি। তাতে কে খুশি হলো, কে রাগ করল—দ্যাট ডাজেন্ট ম্যাটার।”
লিজা তখন বলেন, “না, সেটা আমার বোঝা হয়ে গেছে।” এরপর কামরান কলটি কেটে দেন।
তবে মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “কামরান রেজা চৌধুরীকে আমি চিনি না। হয়তো দেখা হলে চিনব। কিন্তু তার সঙ্গে আমার কথা হয়নি। তাকে মিরাজ শেখের বিষয়ে কাজ করার কথা আমি বলিনি। মিথ্যা কথা বলে আমার নাম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।”
‘তদন্ত চলাকালে কারো জবানবন্দি সাংবাদিকদের কাছে দেয়া অনৈতিক’
লিজা ইসলাম অভিযোগ করেছেন, পুলিশের উপস্থিতিতে কোস্টগার্ডকে দেয়া তার ও পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দির কপি তাদেরকে দেয়া না হলেও টাইমস অব বাংলাদেশ এর সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরীকে দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কামরান রেজা দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি জবানবন্দির রেকর্ড কোথায় পেয়েছি সেটা আপনাকে বলবো না। আমি তো আমার সোর্স এর তথ্য প্রকাশ করবো না।”
তিনি এই প্রতিবেদককে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি আমার মন্তব্য কোথাও ব্যবহার করবেন? নিউজে আমার মন্তব্য ব্যবহার কইরেন না। আমি এমনি আপনাকে বলছি।”
জবানবন্দির তথ্য সাংবাদিকদের কাছে কিভাবে গেলো জানতে চাইলে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “জবানবন্দি পুলিশ নেয়নি; এটি নিয়েছে কোস্টগার্ড। পুলিশের উপস্থিতিতে কোস্টগার্ডের অভ্যন্তরীণ উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি এই জবানবন্দি নিয়েছে। আমরা আসলে জানিও না, কী জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের আওতায় নয়।”
এ ব্যাপারে কোস্টগার্ডের মোংলার দিগরাজ বেইজ এর পশ্চিম জোন জোনাল কমান্ডারের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোস্টগার্ডের আরেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার নাম্বার দেন। তাকে ফোন করে জবানবন্দির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদর দপ্তরে যোগাযোগ করতে বলেন।
কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা কমান্ডার আবু সাদিক মোহাম্মদ শফিক উদ্দীন দ্য ডিসেন্টকে জানান, “এটা যে প্রতিবেদক করেছে, তাকে জিজ্ঞেস করেন। আমার জানামতে এটা কোস্টগার্ড কাউকে দেয়নি।”
মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “তদন্ত চলাকালে কারো জবানবন্দি সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বা বাইরে প্রকাশ করা অনৈতিক। এটি বাইরে গেল কীভাবে?”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জেষ্ঠ্য আইনজীবী ইমরান আব্দুল্লাহ সিদ্দীক দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় জবানবন্দির কোনোতথ্য সাংবাদিকদের সাথে শেয়ার করা উচিত না যার মাধ্যমে একটি বিশেষ সিদ্ধান্তের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে ওঠে। তদন্ত হওয়া উচিত কেবলমাত্র তথ্য এবং আইনের ভিত্তিতে। সাংবাদিকদের সাথে তথ্য শেয়ার করে তদন্তের কার্যক্রম কোনো বিশেষ দিকে প্রবাহিত করাটা সঠিক হবে না।”
কী বলা হয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনের শুরুতেই দাবি করা হয়েছে, “বাণিজ্যিক মোটরসাইকেল চালক ও জেলে মিরাজ শেখ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ ঘিরে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের দেওয়া পরস্পরবিরোধী তথ্য এবং মানবাধিকারকর্মীদের ভিত্তিহীন দাবির কারণে পুরো ঘটনাটিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।”
তবে মানবাধিকারকর্মীদের কোন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলা হচ্ছে, প্রতিবেদনে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি টাইমস অব বাংলাদেশ।
এ ছাড়া, টাইমস অব বাংলাদেশ ও কামরান রেজা চৌধুরী মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলাম ছাড়া তার পরিবারের আর কারও বক্তব্য নেননি। লিজা ইসলামের সঙ্গে কথা বললেও প্রতিবেদনে এবং তার সঙ্গে কথোপকথনে মিরাজ শেখের গুমের বর্ণনা কিংবা কোস্টগার্ডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে দেখা যায়নি।
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “পুলিশ এই নিখোঁজের বিষয়টিকে শুরু থেকেই রহস্যজনক বলে মনে করছে। মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, ঘটনার ১২ দিন পর ২৩ এপ্রিল মিরাজের স্ত্রী ও মা থানায় এসে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অপহরণের সন্দেহের কথা জানান।”
তিনি বলেন, “কিন্তু তারা এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শীকেও হাজির করতে পারেননি, যিনি মিরাজকে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। গুমের সপক্ষে কোনো ছবি বা ভিডিও দেখাতে না পারায় আমরা জোরপূর্বক গুমের মামলার বদলে নিখোঁজের একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করি।”
মোংলা থানার ওসির বরাতে টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুক্তা খাতুন থানায় দেওয়া বক্তব্যে নিজে উপস্থিত থেকে সাধারণ পোশাকের দুজনকে মিরাজকে তুলে নিতে দেখার কথা বলেননি।
তবে মুক্তা খাতুন ও লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন থানায় দেওয়া বক্তব্যে নিজে উপস্থিত থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যেতে দেখার কথা বলেছিলেন।
জিডির প্রসঙ্গে লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা চারবার থানায় যাই। আমাদের জিডি নেয়নি। পরে ২৩ এপ্রিল আমাদের জিডি নেওয়া হয়। পুলিশ তখন আমাদের বলে, ‘দেখেন, আমরা কী করব, ওদের অনেক পাওয়ার।’”
দ্য ডিসেন্ট জিডির নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করেছে। জিডিতে মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম বাদী হয়ে লিখেছেন, “আমার স্বামী নিজ বসতবাড়ি বাসার নিচে নিজের অজান্তে হারিয়ে যায়।”
চায়ের দোকানের সামনে থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করলেও জিডিতে কেন বাড়ির নিচ থেকে নিজের অজান্তে হারিয়ে যাওয়ার কথা লেখা হয়েছে—জানতে চাইলে মুক্তা খানম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “জিডির লেখা পুলিশ লিখে দিয়েছে। এটা নিয়ে আমরা থানায় প্রতিবাদ করেছি। তখন তারা বলেছে, কোস্টগার্ডের নাম লেখা যাবে না। এরপর বাধ্য হয়ে আমরা স্বাক্ষর করি।”
মোংলা সার্কেল অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেফাতুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “জিডি নিতে না চাওয়ার অভিযোগটি সত্য নয়। থানায় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। মিরাজের পরিবার ২২ এপ্রিল সন্ধ্যায় এসেছিলেন। কিন্তু তারা মামলা করবেন, নাকি জিডি করবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তখন পুলিশ তাঁদের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরদিন আসার পরামর্শ দেয়। জিডির ভাষার ব্যাপারে যদি বলি, অপহরণ বা গুম—এসব শব্দ জিডিতে লেখা যায় না। মামলা করতে হবে। আবার কোস্টগার্ড বা আন্তঃবাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া যাবে না। সে জন্য আদালত বা আইনজীবীর মাধ্যমে পরামর্শ নিতে বলা হয়েছিল তাঁদের। পরে তারা জিডি করেন।”
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, “যোগাযোগের পর লিজা দাবি করেন, ১০ এপ্রিল মাগরিবের আজানের পরপরই সন্ধ্যা সাতটার দিকে মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই দিন মাগরিবের আজান হয়েছিল সন্ধ্যা ছয়টা ৩০ মিনিটের আগেই।”
এ বিষয়ে লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছে, আমি বলেছি, আমার ভাবি দেখেছেন। তিনি বলেছেন, আনুমানিক সন্ধ্যা সাতটা। এরপর জিজ্ঞেস করা হয়েছে, মাগরিবের আগে নাকি পরে। তখন আমি বলেছি, পরে। আমি বলিনি যে মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছে।”
প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শী সেলিনা বেগমকে বলতে শোনা যায়, “আমি বাড়িতে ছিলাম। মিরাজকে নিয়ে যেতে আমি দেখিনি।”
এ ছাড়া, প্রতিবেদনে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী চায়ের দোকানদার আল আমিনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তার দোকানের সামনে থেকেই মিরাজ শেখকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে এক ভিডিও বার্তায় আল আমিন তার দোকানের সামনে থেকে কোস্টগার্ড মিরাজকে তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে, ২৮ আগস্ট, তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য দেন।
আল আমিন বলেন, “মিরাজ আর আমি একসঙ্গে বড় হয়েছি। আমার দোকান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। আমি কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছিলাম।”
তিনি দাবি করেন, যশোরে থাকা মিরাজের বোন লিজা এসে তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, কোস্টগার্ডকে দোষ দিলে মিরাজকে দ্রুত ফেরত পাওয়া যাবে। সে অনুযায়ীই তিনি ভিডিওতে কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে একজন মানবাধিকারকর্মী কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে কথা না বললে মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন আল আমিন।
তবে দ্য ডিসেন্টের হাতে আসা দুটি ভিডিও বক্তব্যে দেখা যায় আল আমিন ও সেলিনা বেগম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছিলেন, কীভাবে তাঁদের চোখের সামনে কোস্টগার্ড পরিচয় দেওয়া দুই ব্যক্তি মিরাজকে ধরে নৌকায় তুলে নদীতে থাকা কোস্টগার্ডের স্টেশনের দিকে নিয়ে যান।
কিন্তু টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তারা আগের বক্তব্যের বিপরীত কথা বলছেন।
চায়ের দোকানদার আল আমিন শেখের সাথে লিজা ইসলামের কথোপকথনের একটি বক্তব্য দ্য ডিসেন্ট বিশ্লেষণ করে। সেখানে লিজা ইসলামকে বলতে শোনা যায়, “মিরাজের গাড়ি কি আপনার কাছে রাখা? গাড়ি কি দেওয়া যাবে?”
জবাবে আল আমিন শেখকে বলতে শোনা যায়, “আমার ওই গাড়িতে হাত দেওয়ার কোনো কায়দা নেই।”
লিজা ইসলাম বলেন, “গাড়ি রেখে গেছে কে?”
জবাবে আল আমিন শেখ বলেন, “কোস্টগার্ড। আমারে বলছে, আপনি চলে যাওয়ার যান, কিন্তু গাড়ির যেন কিছু না হয়।”
ফোন রেকর্ডিংটি শুনুন এখানে।
এর আগে লিজা ইসলামের সংগ্রহ করা একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে সেলিনা বেগমকে ভিন্ন বক্তব্য দিতে শোনা যায়। স্থানীয় এই গৃহবধূ ওই দিন সন্ধ্যায় নদীর পাড়ের দোকানগুলোতে বাজার করতে এসেছিলেন।
তিনি কী দেখেছিলেন, তার বর্ণনা দিয়ে সেলিনা বেগম বলেন, “আমি আসছিলাম দোকানে বাজার নিতে। সে সময় দেখি যে, মিরাজরে ধরছে। পাশে একজন মহিলা ছিল, নাম ঝুমুর। তার পাশ থেকে ধরছে। দুইজন সিভিল পোশাকে। একটা নৌকা কইরা বাইয়া আইছে। ওরে আইয়া জিগাইছে, ‘আপনের নাম কি মিরাজ?’ কইছে, ‘হয়।’ হ্যাঁ কওয়ার লগে লগে দুই ঘাড় ধরছে, হাতের দুই ডানা ধইরা টানতে টানতে কয়, ‘এইদিকে আসেন।’ আর মিরাজ বলতে আছে, ‘কী কারণে, বলেন।’ কয়, ‘এইদিকে আসো।’ মিরাজ কয়, ‘ওইদিকে কেন যাব?’”
সেলিনা আরও বলেন, “সে সময় আমার স্বামী আমার সঙ্গে ছিল। আমার স্বামীরে বলছে, ‘ও বেয়াই, এরা আমারে কোথায় ডাকে?’ হেই সময় হেরা (যারা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল) বলছে, ‘তোর বেয়াইর গোষ্ঠী…’ কয়া একটা খারাপ কথা বলছে। পরে ওরে (মিরাজ) টানতে টানতে তেঁতুলগাছতলায় নিয়া গেছে। কর্নারে একটা তেঁতুলগাছ আছে। গাছতলায় নিয়া একটা বাড়ি (প্রহার) দিছে। একটা পিডান মারছে দুইজনের একজন। মারার পর ওখান থেকে আবার ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে ওরে পন্টুনে ওই সিঁড়িটার মাথায় নিছে। মাথায় নেওয়ার পরে ওই জায়গাতে ধাক্কা দিয়া ফালায় দিছে। একটা বোট, জাহাজের বোট, সাদা রঙের, উপরে রং করা—সেই বোটের ভিতরে ঢুকাইছে।”
“বোটের ওপর ফালাইয়া ওখানে একজন পিটাচ্ছে, আর ও চিৎকার করতেছে। আরেকজন মুখ চেপে ধরছে। পরে দ্রুতভাবে নিয়া গেছে পন্টুনে। পন্টুনে নেওয়ার পরে পন্টুনের ভিতরে নিয়া গেছে এবং পরে দেখছি, কালো কম্বল দিয়া ঢাইকা দিছে। পরে কোনো শব্দ নাই, কিছু নাই। কী যে করছে, মারছে নাকি—বলতে পারি না।”
“কিছুক্ষণ পরে মিরাজের বউ আইছে, মিরাজের শাশুড়ি আইছে, শ্বশুর আইছে। পরে আমরা সবাই ওই সিঁড়িটার মাথার উপরে গেছি। তারা বারবার মানা করছে, ‘ওর উপরে আইসেন না।’ তারপরও আমরা গেছি। যাইয়া আমরা তিন-চারজন ওইখানে দাঁড়াই রইছি। কিন্তু ভয়ে আমরা পন্টুনের গায়ে যাইতে পারি নাই।”
“পরে দেখি, কিছুক্ষণ পর কেবিন ক্রুজার আইছে, স্পিডবোট বলে। কোস্টগার্ড লেখা, কোস্টগার্ডের পোশাক পইরা আইছে। আসার পরে তিন-চারজন ওই বোটে উঠছে। উইঠা কী বলছে, বলতে পারি না। মনে হয় ২০-২৫ মিনিট ওই জায়গায় অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার পরে মিরাজসহ পন্টুনের আরও তিন-চারজন ওই বোটে উঠছে। ওঠার পরে প্রায় আট-নয়জন লোক ওই স্পিডবোটে ওর মাথা নোয়াইয়া ঠেলে ভিতরে ঢুকাইয়া পরে বোট চালাইয়া মোংলার দিকে চলে গেছে। এইটুক পর্যন্ত আমরা দেখছি।”
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জয়মনিরঘোল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাজমুল হাওলাদার, যিনি স্থানীয়ভাবে নাজমুল মেম্বার নামে পরিচিত, স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—তিনি মিরাজের গুম হওয়ার ঘটনা দেখেননি। কোস্টগার্ড সদস্যদের মিরাজকে তুলে নিতে দেখেছেন—এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর কথাও তিনি শোনেননি।
তবে দ্য ডিসেন্টের হাতে আসা আগের একটি ফোনকলের রেকর্ডে নাজমুল হাওলাদারকে বলতে শোনা যায়, “কোনো সমস্যা থাকলে আমারে বলবেন। ধইরা নিয়ে গেছে কোস্টগার্ডে। এটা তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। ও ওদের লগেই আছে। ও যতই অস্বীকার করুক। নিশ্চিত থাকো, ও (মিরাজ শেখ) ওদের (কোস্টগার্ডের) সঙ্গে আছে।”
কোস্টগার্ডের সহায়তায় করা আগের দুই প্রতিবেদনের সঙ্গে মিল
গত ২৬ আগস্ট এখন টিভি ও নাগরিক প্রতিদিন মিরাজ শেখের গুমের অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে সময় দ্য ডিসেন্ট এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখায়, সংবাদমাধ্যম দুটির কথিত অনুসন্ধান কোস্টগার্ডের ব্যবস্থাপনায় এবং তাদের নৌযান ব্যবহার করে পরিচালিত হয়েছিল।
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পর নাগরিক প্রতিদিন তাদের প্রতিবেদনটি খতিয়ে দেখার ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে নাগরিক প্রতিদিন তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনের সঙ্গে নাগরিক প্রতিদিন ও এখন টিভির প্রতিবেদনের শব্দগত মিল না থাকলেও বয়ান, থিম, তথ্য নির্বাচন এবং সাক্ষাৎকারদাতাদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
তিনটি প্রতিবেদনেই মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ড তুলে নিয়েছে—পরিবারের এই অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার স্বেচ্ছায় আত্মগোপনের সম্ভাবনা সামনে আনা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যকে ‘পরস্পরবিরোধী’ বা ‘ভিত্তিহীন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি কথিত গুমের পরও মিরাজের ফোন সচল থাকা, ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধান ছোট সুমনের সঙ্গে তার ফোনালাপ, অপহৃত ছয় জেলের মুক্তিপণের ছয় লাখ টাকা মিরাজের কাছে থাকা, সেই অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে তার আত্মগোপনের সম্ভাবনা, অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ, অতীতে কারাভোগ এবং ফারুক নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক বিরোধের দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারদাতাদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের মিল রয়েছে। তিনটি সংবাদমাধ্যমই ছোট সুমন, দোকানদার আল আমিন, স্থানীয় নারী সেলিনা বেগম এবং ইউপি সদস্য নাজমুল হাওলাদারের বক্তব্য ব্যবহার করেছে।
বিশেষ করে, আল আমিনের আগের বক্তব্য অস্বীকার করে মিরাজের পরিবারের শেখানো কথায় কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ দেওয়ার দাবি, সেলিনার ঘটনা প্রত্যক্ষ না করার বক্তব্য ও পরিবারের বিরুদ্ধে চাপ দেওয়ার অভিযোগ এবং কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর কথা জানেন না বলে নাজমুলের দেওয়া বক্তব্য—তিনটি প্রতিবেদনেই একই মূল বয়ানকে সমর্থন করেছে।
একই সঙ্গে তিনটি প্রতিবেদনেই প্রত্যক্ষদর্শীদের আগের বক্তব্য বা পরিবারের অভিযোগের পরিবর্তে তাঁদের পরবর্তী অস্বীকৃতি, মিরাজের কথিত অপরাধ-সংশ্লিষ্টতা এবং কোস্টগার্ডের দায় অস্বীকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চাপ দিয়ে বক্তব্য পরিবর্তনের অভিযোগ কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “কোস্টগার্ডের সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে, যাতে মিরাজের পক্ষে কেউ কথা না বলে। যারা কথা বলেছে, তাদেরও ভয় দেখিয়ে বক্তব্য পরিবর্তন করানো হয়েছে।”
লিজা বলেন, “দোকানদার আল আমিন বলছেন, আমাদের শেখানো কথা তিনি বলেছেন। সেলিনা বলেছেন, আমাদের হুমকিতে তিনি আগের কথাগুলো বলেছিলেন। আচ্ছা বলুন তো, আমাদের শেখানো কথায় একটা বাহিনীর নামে কেউ মিথ্যা বলবে? এমনটা কি কখনো হতে পারে? এখানে কে শক্তিশালী—কোস্টগার্ড, নাকি আমরা? কাদের ভয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা বক্তব্য বদলাচ্ছেন, এটা বোঝা কি খুব কঠিন?”
তিনি আরও বলেন, “অনেক সংবাদমাধ্যমের কাছে এবং আমার কাছে এসব ব্যক্তির আগের বক্তব্যের রেকর্ড আছে। কিন্তু তারা এখন ভয়ে কথা বদলাচ্ছেন।”
এর আগেও স্থানীয় তিন বাসিন্দা ও একজন সাংবাদিক দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছিলেন, মিরাজের বিষয়ে কথা না বলার জন্য কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে তাঁদের চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দৈনিক আজকের বাংলার মোংলা প্রতিনিধি শেখ তাইজুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার পর এ নিয়ে লেখালেখি করায় আমাদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে।”
দ্য ডিসেন্টকে আরও তিন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে কোনো কথা না বলার জন্য তারাও বিভিন্নভাবে হুমকি পাচ্ছেন।
লিজা ইসলাম বলেন, “আমার ভাবি ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কাজ থেকে ফেরার পথে অনেকে তাঁকে অনুসরণ করত। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিত। শেষে আমার ভাবি চাকরি ছেড়ে দেন। আমাদের বাড়িতে গভীর রাতে এসে বারবার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা ভয়ে বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে আছি। আমি ফোন বন্ধ রেখেছি। আপনি আমাকে সিমে কল দিলে পাবেন না। সিম বন্ধ রেখে হোয়াটসঅ্যাপ চালাচ্ছি।”
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা অভিযোগ করেন, “মিরাজকে তুলে নিয়ে যেতে দেখা প্রত্যক্ষদর্শীরা রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারেন না। তাঁদের জঙ্গলে ও কবরস্থানে রাত কাটাতে হচ্ছে।”
কী হয়েছিল মিরাজ শেখের সঙ্গে?
বাগেরহাটের মোংলার জয়মণি ঠোটা গ্রামের বাসিন্দা মিরাজ শেখ (৩০) সুন্দরবনে মাছ ও মধু সংগ্রহের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি বাড়ির পাশের আল আমিনের চায়ের দোকানে যান। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল আলমের সঙ্গে কথা বলার সময় নদীর মাঝখানে থাকা কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশন থেকে একটি ছোট নৌকা তীরে আসে। নৌকায় মাঝি মিজান শেখ ছাড়াও সিভিল পোশাকের দুই ব্যক্তি ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই ব্যক্তি মিরাজের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে ধরে জেটির দিকে নিয়ে যান। মিরাজ কারণ জানতে চাইলে তাঁকে মারধর করা হয়। প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মিটার দূরের জেটিতে নিয়ে মান্নান মাঝির নৌকায় তুলে তাঁকে হাড়বাড়িয়া স্টেশনের পন্টুনে নেওয়া হয়। পরে কোস্টগার্ডের পোশাক পরা কয়েকজন সদস্য একটি স্পিডবোটে করে মিরাজকে মোংলার দিকে নিয়ে যান।
দ্য ডিসেন্ট মিরাজের স্ত্রীসহ সাতজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে এবং তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভিডিও সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সোহেল আলম বলেন, নৌকাটি কোস্টগার্ডের পন্টুন থেকে এসেছিল এবং সেখান থেকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ নেই। গৃহবধূ মোছাম্মত সেলিনা জানান, পন্টুনে নেওয়ার পর মিরাজকে কালো কাপড় দিয়ে আড়াল করা হয়। পরে তাঁকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তোলা হয়।
চায়ের দোকানদার আল আমিন জানান, মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার ১০–১১ দিন পর রাত চারটার দিকে কোস্টগার্ড পরিচয় দেওয়া কয়েকজন মিরাজের মোটরসাইকেল নিয়ে যান। তাঁদের একজন নিজের নাম রবিন বলেছিলেন। তবে পরে কোস্টগার্ড মোটরসাইকেল নেওয়ার কথা অস্বীকার করে।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামীকে নৌকায় তুলে নিয়ে যেতে দেখেন। এরপর থেকে মিরাজের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কোস্টগার্ড অবশ্য মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ছোট সুমন বাহিনীর এক সদস্যের জবানবন্দিতে মিরাজের নাম পাওয়া গিয়েছিল। ২২ এপ্রিল তাঁকে খোঁজা হলেও পাওয়া যায়নি। পরিবার ২৩ এপ্রিল জিডি করায় বিষয়টি সন্দেহজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিরাজের পরিবার বলছে, চারবার থানায় যাওয়ার পর জিডি নেওয়া হয় এবং পুলিশের লিখে দেওয়া জিডিতে চায়ের দোকান থেকে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে বাড়ির নিচ থেকে হারিয়ে যাওয়ার কথা লেখা হয়। পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, মিরাজের সন্ধানে তদন্ত চলছে, তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।
মিরাজের সন্ধান দাবিতে জুনে পরিবার ও গ্রামবাসীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোস্টগার্ডের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পন্টুন ও স্পিডবোট ভাঙচুরের ঘটনায় মিরাজের মা, স্ত্রী ও বোনসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ২৭ দিন কারাগারে ছিলেন।