How Misinformation Published by the Media Sparked Controversy over a Sensitive Issue

15 May 2026

গত বুধবার (১৩ মে) ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের এক সংবাদ সম্মেলনে (ভিডিও) দাবি করেছেন, ফিটনেস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ৫৫ শতাংশ মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ান না। 

সংবাদ সম্মেলনে জাবের বলেন, মায়েরা তাদের ফিটনেস ধরে রাখবার জন্য তারা সন্তানদেরকে বুকের দুধ পান করান না। একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ৫৫% মা তার এই যে পাশ্চাত্য যে সংস্কৃতি, এই যে অপসংস্কৃতি—যে তার সন্তানকে দুধ খাওয়ালে তার ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে, এই কারণে ৫৫% মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ায় না।

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে যে একজন মায়ের বুকের দুধ পান করার মধ্য দিয়ে ছয় মাস পর্যন্ত একজন শিশুর ইমিউনিটি সিস্টেম গ্রো করে। তো যখন এই জায়গাটাতে শুধুমাত্র সরকারের দায় দিয়ে লাভ নাই, এখানে মূলত সর্বসম্মতিক্রমে আমরা একটা মহামারি ডেকে এনেছি।

জাবেরের এমন বক্তব্যের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের এই নেতার সমালোচনা করে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন।

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, “ফিটনেস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ৫৫ শতাংশ মা সন্তানকে দুধ পান করান না” বলে জাবের যে মন্তব্য করেছেন সেটি সঠিক নয়। অবশ্য দ্য ডিসেন্ট খুঁজে পেয়েছে, তার বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের একটি অংশের উৎস সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর।

মূলত বাংলাদেশের জনসংখ্যা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি পরিস্থিতির উপর চালানো জাতীয় জরিপ “বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেল্থ সার্ভে-২০২২” এ উঠে এসেছে  বাংলাদেশে ৫৩% শতাংশ শিশুকে জন্মের পর প্রথম ৫ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ পান করানো হয়। ২০১৭-১৮ সালে এই হার ৬৫% থাকলেও সর্বশেষ জরিপে এটি ৫৩% এ নেমে এসেছে।

এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং ৫৩% এ নেমে এসেছে

এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং ৫৩% এ নেমে এসেছে | বিডিএইচএস জরিপ

৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাদেরকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং বলা হয়। শিশুর যথাযথ বিকাশ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ পান করানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞামতে, শিশুর জন্মের প্রথম ছয় মাসে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুকে অন্য যেকোনো কিছু—এমনকি পানিও—খাওয়ানো হলে সেটিকে আর এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং হিসেবে ধরা হয় না।

বুকের দুধের পাশাপাশি ৫ মাস বয়সী বাচ্চাদের অন্য খাবারও খাওয়ান মায়েরা

বুকের দুধের পাশাপাশি ৫ মাস বয়সী বাচ্চাদের অন্য খাবারও খাওয়ান মায়েরা | বিডিএইচএস জরিপ

জরিপে মূলত দেখার চেষ্টা করা হয়েছে কত শতাংশ মা এটি মেনে চলেন। অর্থাৎ শিশুর জন্মের পর কত শতাংশ মা শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ান এবং পাশাপাশি আর কোন কিছু খাওয়ান না। ফলে ৫৩ শতাংশ মা শুধু বুকের দুধ খাওয়ান -এর অর্থ এই নয় যে বাকি ৪৭ শতাংশ মা বুকের দুধ খাওয়ান না। বরং সচেতনতার অভাব, অসুস্থ্যতা ও কৌটার খাবারের বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হওয়াসহ নানা কারণে মায়েরা জন্মের পর নবজাতককে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য খাবারও খাইয়ে থাকেন। প্রথম ৫ মাসে মায়ের বুকের দুধ একেবারেই পান করানো হয় না–এমন শিশুর সংখ্যা খুবই নগন্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে জরিপে। উক্ত জরিপেই উঠে এসেছে ১২-২৩ মাস বয়সী ৮৮ শতাংশ শিশুকে দুধ পান অব্যাহত রাখা হয়। 

গোটা বিষয়টি নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে ডয়চে ভেলের খবর ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতা জাবেরের বক্তব্যে। 

জাবেরের বক্তব্য  ও ডয়চে ভেলের খবরে বিভ্রান্তি

জাবেরের বক্তব্যে দু’টি বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রথমটি হলো, ৫৫ শতাংশ মা সন্তানকে দুধ পান করান না– এটি সঠিক নয়। বরং সঠিক তথ্য হচ্ছে, সরকারি জরিপ মতে, দেশের ৫৩ শতাংশ মা নবজাতককে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং করান (বাকি ৪৭ শতাংশের বড় অংশ দুধ পান করালেও এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং মেনে চলেন না)। 

দ্বিতীয়টি হলো, এই এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং না করানোর পেছনে জাবের মায়েদের ফিটনেস নষ্ট হওয়ার আশংকাকে যেভাবে উল্লেখ করেছেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

যদিও গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ফেসবুকে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, দুধ পান না করানো “নানাবিধ সমস্যার কারনে হতে পারে, তবে অনেকেই ফিটনেস ধরে রাখার জন্য এমনটা করেন।”

এই পোস্টেও জাবের ডয়চে ভেলের গবেষণার বরাত দিয়ে দাবি করেন ৫৫% মা শিশুদের দুধ পান করাচ্ছেন না। দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায় ডয়চে ভেলে এ বিষয়ে কোন গবেষণা পরিচালনা করেনি এবং এ ধরনের কোন গবেষণা প্রতিবেদনও প্রকাশ করেনি। 

তবে গত ১৮ এপ্রিল ‘‘হামে বাংলাদেশে এত মৃত্যু কেন?’’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে ডয়চে ভেলে। সেখানে  জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরীর বক্তব্য হিসেবে ডয়চে ভেলে লিখেছে, ‘‘আগে বুঝতে হবে, কেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল৷ গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশু যদি মায়ের বুকের দুধ খায়, তাহলে ৬ মাস পর্যন্ত তার যে ইমিউনিটি তৈরি হবে তাতে টিকার প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে ইমিউনিটি কমতে শুরু করে। সে হিসেবে, ৯ মাস নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। ফলে এই শিশুদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না। আবার মারা যাওয়া শিশুদের ৬৬ শতাংশ টিকার কোনো ডোজই নেয়নি। ১৭ শতাংশ একটি ডোজ নিয়েছে। আবার করোনার পর আমাদের মতো দেশগুলোতে মায়েদের পুষ্টির স্বল্পতা রয়েছে। তারা পর্যাপ্ত পুষ্টিযুক্ত খাবার পাচ্ছেন না। এতে শিশু মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।" 

ডয়চে ভেলের ভুল খবর

ডয়চে ভেলের ভুল খবর | ডয়চে ভেলে

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে ডা. লেলিনের বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর এই ভুলভাবে উপস্থাপিত তথ্যের রেফারেন্স দিয়েছেন জাবের।

প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা অডিওতে ডা. লেলিনকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘আমরা বিভিন্ন কারণে প্রোটিনের অভবটা বেশি দেখতে পাচ্ছি। এজন্য মায়েদের শরীরের পুষ্টি এবং জন্ম নেওয়া শিশুর পুষ্টি কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে এক সময় আমাদের দেশে মা জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এটি ৫৫ বা ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে অনেক শিশু জন্মের পর মায়ের দুধ না খাওয়ানোর কারণে তাদের শরীরেও প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকছে। এসব মিলিয়ে ছয় মাসের কম বয়সের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।’’

ডা. লেলিন তার বক্তব্যে ‘গবেষণা’ শব্দটি উল্লেখ না করলেও ডয়চে ভেলে ‘গবেষণা’ বলে উল্লেখ করেছে।

তাছাড়াও ডা. লেলিন বলেছেন শিশুকে জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৫ বা ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আর ডয়চে ভেলে তাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, “গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না।”

দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনটির বিষয়ে জানান, “কোনভাবে রিপোর্টার হয়তো আমার কথা বুঝতে পারেননি। আমরা যখন সায়েন্টিফিক বিষয়ে কথা বলি তখন আমরা অতো বিস্তারিত বলি না। আমরা টার্মিনোলজি ধরে কথা বলি। এজন্য স্বাস্থ্য বিটের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ থাকা দরকার।”

তিনি আরও বলেন, “এখানে মূলত এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং কমে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানোটা ইম্পর্ট্যান্ট। যেটা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য জরুরি। আপনি যদি বুকের দুধের সাথে পানি, সুজি, ফর্মুলা বা যেকোনো কিছু খাওয়ান তাহলেও সেটা আর এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং থাকলো না। এই সময়ে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। সাথে আর কিছু খাওয়ানো যাবে না। এখন এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হার কমে যাওয়ার মানে এই না যে সামগ্রিকভাবে দুধ পান করানোর হার কমে গেছে।”

বিডিএইচএসের জরিপেও দেখানো হয়েছে, জন্মের প্রথম ৫ মাসে ৫৩% শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করানোর মানে এই নয় যে, বাকি শিশুদের এই সময়ে বুকের দুধ পান করানো হয় না। বরং বুকের দুধের পাশাপাশি তাদের অন্য খাবারও খাওয়ানো হয়। ফলে সেটিকে আর এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

জরিপমতে, বাংলাদেশে ৫ মাস বয়সী ২২% শিশুকে সমন্বিত দুধ পান করানো হয়, ১৮% কে বুকের দুধের সাথে ফরমুলা অথবা প্রাণীর দুধ খাওয়ানো হয়, ১১% কে বুকের দুধের পাশাপাশি পানি খাওয়ানো হয়, ১০% শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি কঠিন, অর্ধকঠিন ও নরম খাবার খাওয়ানো হয়।

এছাড়া বিডিএইচএসের জরিপে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে ১২-২৩ মাস বয়সী ৮৮% শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানো অব্যাহত রাখা হলেও ২২% শিশুকে বোতলে করে খাওয়ানো হয়।

অঞ্চলভেদে মাতৃদুগ্ধ পানে পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার ৬৫ শতাংশ হলেও খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটে এ হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে।

শিক্ষা ও আর্থসামাজিক অবস্থার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা গেছে। মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত মায়েদের সন্তান এবং উচ্চ আয়ের পরিবারের শিশুদের বোতলে দুধ খাওয়ানোর হার বেশি। মাধ্যমিক শিক্ষিত মায়েদের সন্তানের মধ্যে এ হার ২৫ শতাংশ এবং উচ্চ আয়ের পরিবারে ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে শিক্ষাহীন মা ও নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ১৬ ও ১৪ শতাংশ।

অন্য সংবাদমাধ্যমের শিরোনামেও বিভ্রান্তি

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে ২০২৫ সালের ১ আগস্ট ‘‘মায়ের বুকের দুধ পায় না ৪৫ শতাংশ শিশু’’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে কালবেলা। বিডিএইচএস এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭-১৮ সালে ৬৫ শতাংশ শিশু মায়ের বুকের দুধ পেলেও, বর্তমানে এ হার কমে হয়েছে ৫৫ শতাংশ। আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের ৪৫ শতাংশ মা তাদের সন্তানদের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত রাখেন।

বিডিএইচএস এর জরিপে এমন কোন দাবি করা হয়নি। মূলত জরিপে দেখানো হয়েছে কত শতাংশ শিশুকে জন্মের প্রথম ৫ মাসে শুধুমাত্র বুকের দুধ (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং) পান করানো হয়।

২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরামের (বিএনএফ) কর্তৃক বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্য একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক সমকাল। ‘মায়ের দুধ পাচ্ছে ৫৫ শতাংশ শিশু’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। শিরোনামে মনে হতে পারে ৫৫ শতাংশ শিশু বুকের দুধ পাচ্ছে এবং বাকীরা বঞ্চিত থাকছে৷ 

অথচ এই প্রতিবেদনের ইন্ট্রোতেই বলা হয়, দেশে জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়সের শিশুদের শুধু বুকের দুধ পানের হার এখন ৫৫ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালে এ হার ছিল ৬৫ শতাংশ।

অর্থাৎ এখানে মূলত এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হারের কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনের ভেতরে শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরামের (বিএনএফ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মো. মজিবুর রহমান এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেননি ৫৫% মা দুধ পান করাচ্ছেন এবং বাকীরা বিরত থাকছেন। 

২০২৩ সালে বিডিএইচএস এর জরিপের বরাত দিয়ে দৈনিক প্রথম আলো “শিশুর মায়ের দুধ পানের হার কমেছে ১০%” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনের ভেতরেও মূলত জন্মের প্রথম ছয় মাসে শুধুমাত্র বুকের দুধ পান করানো তথা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হারের অবনতির কথা বলা হয়েছে। যদিও শিরোনামে মনে হতে পারে সামগ্রিকভাবে মাতৃদুগ্ধ পান ১০% কমেছে।

এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হার কমার কী কারণ

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের ২০২২ সালে প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে দেখানো হয় ফর্মুলা দুধের আগ্রাসী বিপনন ও বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে অনেক মা বুকের দুধের পাশাপাশি ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর দিকে ঝুঁকে পড়েন।

প্লস ওয়ান জার্নালে Reasons for formula feeding among rural Bangladeshi mothers: A qualitative exploration শিরোনামে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মায়েদের শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি  কৌটার দুধ বা 'ইনফ্যান্ট ফর্মুলা' খাওয়ানোর পেছনে মূলত সচেতনতার অভাব, পারিবারিক চাপ এবং বাণিজ্যিক প্রচারণা দায়ী। অনেক মা-ই ভুলবশত মনে করেন যে তাঁর পর্যাপ্ত বুকের দুধ তৈরি হচ্ছে না, যার ফলে শিশুর পেট ভরানোর জন্য তারা ফর্মুলা দুধের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

প্রবন্ধে কৌটার দুধ খাওয়ানোকে উচ্চ সামাজিক মর্যাদার প্রতীক ভাবার মানসিকতা এবং টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের বিভ্রান্তিকর প্রভাবকে কৌটার দুধ খাওয়ানোর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি না জানা এবং অনেক সময় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকর্মীদের পক্ষ থেকে পরোক্ষভাবে ফর্মুলা দুধের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত না করার ফলেও মায়েরা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং  করানো থেকে বিরত থাকছেন।

কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের ওয়েবসাইটে Barriers of Exclusive Breast Feeding Practice for the First Six Months of Life শিরোনামে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রান্ত ধারণা ও অজ্ঞতার কারণে অনেকে বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে বিরত থাকেন। ৫৯.৪৪% মা মনে করেন, বুকের দুধ খেলে শিশুর ওজন ধীরে বাড়ে।

এছাড়া ৬০.৫৫% মায়ের ধারণা, কৌটার দুধ (ফর্মুলা মিল্ক) ও বুকের দুধের উপকারিতা প্রায় একই। ৩২.২২% মা বিশ্বাস করেন যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে তাদের নিজেদের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। বিশেষ করে যারা প্রথমবার মা হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতার অভাব এ ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। তাছাড়াও শারীরিক ও অন্যান্য কারণ অনেক সময় মায়েরা মনে করেন শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে না। এর পাশাপাশি, সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডেলিভারি হওয়া এবং কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রেও বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কম দেখা গেছে।

গবেষণাটি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের (Department of Pediatrics) পরিচালনা করা হয়েছিল। এই গবেষণায় মোট ১৮০ জোড়া মা-শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এদের বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলের (৭৪%) ছিলেন এবং মাত্র ২৬% এসেছেন শহর বা আধা-শহর এলাকা থেকে। পেশাগত দিক থেকে মাত্র ২৬ জন (১৪.৪৫%) মা কর্মজীবী ছিলেন, আর বাকিরা (৮৮.৫৫%) কর্মজীবী ছিলেন না।

জাবেরের মন্তব্যে ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া

জাবেরের এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিায়া জানিয়েছেন অনেকেই।

রাজনৈতিক প্লাটফর্ম অল্টারনেটিভস এর সংগঠক ডা তাজনূভা জাবীন এক পোস্টে লিখেছেন, ‘‘আমাদের উচিত এবং দায়িত্ব এধরনের অসত্য, বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিপরীতে কথা বলা। এই ধারণা অনুযায়ী তো বিগত বছরগুলোতেও হামের প্রাদুর্ভাব হওয়ার কথা ছিল। হয় নাই!!! সত্য হলো, বাংলাদেশ গ্লোবালি অন্যতম দেশ যারা বাচ্চাদের এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং বা পূর্ণ বুকের দুধ পান করান। (Exclusive Breastfeeding) বলতে বোঝায়, শিশুকে জন্মের পর থেকে প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো। এই সময়ে বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোনো তরল বা কঠিন খাবার, এমনকি পানিও না খাওয়ানো। সেটার হারই ৬৩ শতাংশ।’’

তিনি আরও লিখেন, ‘‘অজ্ঞতা পরিহার করি। ফিটনেস এর জন্য বুকের দুধ খাওয়ায় না, এই বয়ান বক্তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতার পাশাপাশি নারীদের প্রতি, মায়েদের প্রতি অসম্মান, অবজ্ঞা প্রকাশ করে, যা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। বাচ্চার সুস্থতার জন্য, ভালোর জন্য মায়েরা বুকের দুধ না শুধু হিমালয় উঠে কিছু খাওয়াতে হলে সেটা এনে খাওয়াবে।’’

সাদিয়া মরিয়ম ফারিহা নামে এক ফেসবুক ব্যাবহারকারী জাবেরের বক্তব্যের ভিডিওর কমেন্টে লিখেছেন, “মাইক্রোবায়োলজি পড়ে এবং আজ অবধি এইটুকু শিক্ষা অর্জন করে এইটা জানি যে মায়ের বুকের প্রথম দুধ (শাল দুধ) ইংরেজি তে Colostrum বলে। এইটা একটা বাচ্চাকে ইমিউনিটি দেয় যেটাকে বলে Passive Immunity অর্থাৎ শিশু মা থেকে পায় কিন্তু তা কোন নির্দিষ্ট রোগের জন্য না। কালকে পড়লাম ট্রাক চালকের বউ একা সংগ্রাম করে ৫০০ টাকা নিয়ে সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছে যেখানে একজন পিতা দায়িত্ব নিচ্ছে না। কোথায় দেখসেন যে মা ফিটনেস এর জন্য বাচ্চা কে দুধ খাওয়ায় না?? বুকের দুধ সন্তান এর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে কিন্তু সামগ্রিক ভাবে যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পায় সেটা শাল দুধ থেকেই আসে!! এতো বদমাইশ আর ফালতু কেন আপনারা?? শিক্ষা নূন্যতম নিশ্চয়ই আছে না জানলে পড়েন। সাথে এন্ডেমিক, এপিডেমিক, স্পোরাডিক, আউটব্রেক এসব নিয়ে ও একটু পড়াশোনা কইরেন। নারী বিদ্বেষ মনোভাব লুকানো সহজ নাকি?”

ইফরাত ইশানা নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এখানে প্রিয় ছাত্রনেতা কিছু ডিসইনফরমেশন দিয়েছেন বলে মনে করি। প্রথমত বাংলাদেশে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং এর হার প্রায় ৬৫% যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে যারা আছেন তারা টোটালি ব্রেস্টফিডিং করায় না, ব্যাপারটা এমন না। পশ্চিমা বিশ্বে যেমন আমেরিকাতেই এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং এর হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। তাই পশ্চিমা ইনফ্লুয়েন্সে বাচ্চারা মায়ের দুধ পায় না এটাও একটা মিথ।”

আফরিন মৌ লিখেছেন, “বাংলাদেশে কয়টা পরিবার ফর্মুলা দুধ কিনে খাওয়ানোর মত সামর্থ্য রাখে? ৫৫% বড়লোক আছে এদেশে মোট জনসংখ্যার? এক প্যাকেট ফর্মুলা দুধের দাম জানা আছে? আর এক প্যাকেটে কতদিন যায়, জানেন? হুদাই ছাগলের মত ব্যা ব্যা করে নিজের বোকা মানসিকতার পরিচয় না দিলে হয় না? দোষ করলে সেটা ওউন করার মত সাহস রাখা উচিৎ। নত মস্তকে ভুল স্বীকার না করে আর একজনের গায়ে দোষ চাপায় কাপুরুষরা।”

যা জানালেন জাবের

জাবেরর বক্তব্যটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ফেসবুকে ‘ব্যাখ্যাপূর্বক ক্ষমা চেয়ে’ একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গতকালকের সংবাদ সম্মেলনে আমরা বেশ কয়েকটা পয়েন্ট উল্লেখ করেছিলাম, তার মধ্যে একটা পয়েন্ট ছিলো - একটি শিশু যদি মায়ের বুকের দুধ খায়, তাহলে ৬ মাস পর্যন্ত তার যে ইমিউনিটি তৈরি হবে তাতে টিকার প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে ইমিউনিটি কমতে শুরু করে।ডয়চে ভেলের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৫% মা শিশুদের বুকের দুধ পান করাচ্ছেন না, ফলে এই শিশুদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না।

এইটা নানাবিধ সমস্যার কারনে হতে পারে, তবে অনেকেই ফিটনেস ধরে রাখার জন্য এমনটা করেন।  এইটা আমাদের এক ধরনের মূল্যবোধের অবক্ষয়ও বটে। এটা এখন অবদি ভাইরাল কোন ইস্যু না।  দু-একজন মেসেঞ্জারে কিংবা ট্যাগ করে জানতে চেয়েছেন।  ইনকিলাবের শান্তা এবং নাজিফা গতকালই বলেছেন, ভাই এটা নিয়ে ভুল মেসেজ যেতে পারে। তাদের জন্যই মূলত এই পোস্ট। 

বক্তব্যে "অনেকেই" শব্দটা মিসিং হওয়ার কারণে দু'একজনের কাছে হলেও একটা ভুল মেসেজ যেতে পারে।  ৫৫% এর মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা নানাবিধ সমস্যায় সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না। তাই অগ্রীম ব্যাখ্যাপূর্বক ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এবং পরবর্তী সময়ে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরও অধিকতর সতর্ক থাকার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।’’